ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

সোমবার, ৪ আগস্ট ২০২৫
প্রচ্ছদ » রংপুর » চিকিসক সংকটে মুখ থুবড়ে পাড়েছে স্বাস্থ্য সেবা,বিনা মূল্যের ঔষধ পাচ্ছে না রোগিরা

চিকিসক সংকটে মুখ থুবড়ে পাড়েছে স্বাস্থ্য সেবা,বিনা মূল্যের ঔষধ পাচ্ছে না রোগিরা


মোন্নাফ আলী,উলিপুর (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: সোমবার, ৪ আগস্ট ২০২৫


চিকিসক সংকটে মুখ থুবড়ে পাড়েছে স্বাস্থ্য সেবা,বিনা মূল্যের ঔষধ পাচ্ছে না রোগিরা

কুড়িগ্রাম: চর মেকুরের আলগার মেছাঃ মজিকা বেগম(৫৫) তিনি বুকে ও কোমড়ের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন চিকিৎসার জন্য। গত বৃহস্পতিবার ও এসে ঘুরে গেছেন। তিনি বলেন, আজকা লাইনে দাড়ায় টেহা দিয়া টিকিট নিয়া ডাক্তারের জন্যে কতক্ষন বইসা থাহি ডাক্তার আহে না। পরে একজনে কইল ডাক্তার বসবো না। সরকারী হাসপাতালে ডাক্তার নাই। আমাগো গরীব মানুষের চিকিৎসার কি হইবো। চিকিৎসার জন্য আইসা ঘুইরা যাওন লাগে। গরীব মানুষ বাইরা ডাক্তার দেখানোর টেহা নাই। অহন আমাগো বিনা চিকিৎসায় মরন লাগবো।
জোনাই ডাঙ্গা গ্রামের চা দোকানী জমির উদ্দিন(৮০) তার বৃদ্ধ স্ত্রী জোবেদা বেগম(৬৭) ও নাতনী বিউটিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন চিকিৎসার জন্য ডাক্তার ঔষধ লিখে দেন। তিনি বলেন, টিকিট নিয়া কাউন্টারে গেলে বলে ঔষধ নাই বাইরে থেকে কিনে নেন। এগল্যা কেমন ডাক্তার বাহে গাও খান নারিও দ্যাখে না। ভাল করি শোনেও না। খালি একই বড়ি সবাইকে দেয়। পরে শোনোং এমরা এমবিবিএস ডাক্তার নোয়ায়,এমরা বলে কিসের(উপসহকারী মেডিকেল অফিসার) স্যাকমো। গরীব মানুষ টাকা দিয়া বড় ডাক্তার দেখপার পাই না।

হাসপাতালত আসনো বড় ডাক্তার (এমবিবিএস) দেখামো বড় ডাক্তার বলে বইসে না। কেমন সরকারী হাসপাতাল, ডাক্তারও নাই,ঔষধ ও নাই। ফকিরের হাট গ্রামে রয়েল মিয়া (২৫)বুকে ব্যথা নিয়ে পুরুষ ওয়ার্ডে ১০ নম্বর বেডে ২দিন হয় ভর্ত্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, এখানে কোন চিকিৎসা নাই । সব ঔষধ বাইরের থেকে কিনে আনতে হয়। গরীব মানুষ ঔষধ কিনতে পারি নাই। এখানে থাকি কোন লাভ নাই বলে জানান।
২১ জুলাই সোমবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্ের গিয়ে দেখা গেল আউট ডোর প্রচুর রোগির ভিড়। ডাক্তারদের বসার জন্য ১০৩, ১০৭, ১০৯ ও ১০৬ নম্বর কক্ষ রয়েছে। কিন্ত কোন কক্ষে ডাক্তার নাই। তবে অন্য দুটি কক্ষে উপসহকারী মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) আনোয়ারুল ইসলাম ও স্যাকমো মামুন ইসলাম রোগি দেখছেন।

স্যাকমো মামুন ইসলাম বলেন,মেডিকেল অফিসার না থাকায় আমাদের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে প্রেষনে এনে আউট ডোর রোগি দেখার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা কোন জটিল রোগির চিকিৎসা ও পরীক্ষা নিরিক্ষা দিতে পারি না। তাই জটিল রোগি এলে তাদের কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে প্রেরন করি। ফলে জটিল রোগাক্রান্ত রোগিরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তাছাড়া ১০ জনের কাজ ২জনকে দিয়ে করালে ভাল সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। আগত রোগি ফজল শেখ, সেফালী বেগমসহ সকলের অভিযোগ, ডাক্তার ও ঔষধ পাওয়ার যায় না। ফলে আমরা হাসপাতালে বিনা পয়সায় চিকিৎসা ও ঔষধ পাচ্ছি না। উল্লেখ্য, দীর্ঘ এক বছর ধরে ১৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে ঔষধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরমঞ্জাম সরবরাহ না থাকায় ইউনিয়ন ক্লিনিক গুলোতে চিকিৎসা সেবা বন্ধ রয়েছে। ফলে উপজেলা হাসপাতালে রোগির চাপ কয়েক গুন বেড়ে গেছে। কিন্ত হাসপাতালেও ঔষধ ওডাক্তার সংকটের কারনে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না।
গর্ভবত্তী মা আমেনা বেগম, নজির হোসেন এসেছেন করোনা পরীক্ষার জন্য কিন্ত হাসপাতালে করোনার পরীক্ষার জন্য কোন ব্যবস্থা না থাকায় তারা ফিরে যাচ্ছেন বলে জানালেন।
হাসপাতালের ফার্মাসিষ্ট অদিতী সাহা বলেন, আগে ৩৭ পদের ঔষধ সরবরাহ ছিল । এখন মাত্র ১১ পদের ঔষধ সরবরাহ করছে। ফলে রোগিদের চাহিদা মত ঔষধ দেওয়া যাচ্ছে না। তাই রোগিদের সাথে কেছাল করতে হয়।
হাসপাতাল সংশিষ্টদের ভাষ্য পৌরসভাসহ ১৪ টি ইউনিয়নের সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে ২৭ জন চিকিৎসক সহ দ্বিতীয়, ৩য়, ৪র্থ ও মাঠ পর্য্যায়ে কর্মচারীর পদ রয়েছে ২৭৭টি। বর্তমানে ২৭ জন চিকিৎসকের স্থলে আছেন মাত্র একজন।

দ্বিতীয়,৩য়, ৪র্থ ও মাঠ পর্যায়ে কর্মচারীর পদ রয়েছে ২৫০টি। কর্মরত আছেন ১৭০ জন। শুন্য পদ ১০৭ জন। একজন চিকিৎসক দিয়ে এতো রোগি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাছাড়া ঔষধ সরবরাহ একেবারে কমে যাওয়ায় রোগিদের চাহিদামত ঔষধ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তার উপর জনবল সংকটের কারনে স্বাস্থ্য সেবা ব্যহত হচ্ছে। বিশেষ করে গাইনী ডেন্ডাল,সার্জারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অজ্ঞান করা ডাক্তার না থাকায় ডেলিভারীসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা সেবা বন্ধ রয়েছে। মেশিন খারাপ থাকায় আলট্রাাগ্রাফি, ইসিজি বন্ধ রয়েছে। তবে সম্প্রতি মেশিন ভাল করে এক্সেরে করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ডারার পাড় গ্রামের জোবেদা বেগম তার ১২ বছরের ছেলে সাইদুলকে নিয়ে এসেছেন ডাক্তার দেখাতে। কিন্ত বড় ডাক্তার না পেয়ে স্যাকমোকে দেখান। তিনি একটা  করতে দিয়েছেন। ১৫০ টাকা দিয়ে এক্সেরে করার জন্য অপেক্ষা করছেন।

তিনি বলেন, হাসপাতালে এসে কি লাভ বড় ডাক্তাররা রোগি দেখেন না। আমরা গরীব মানুষ ৫০০ টাকা ফি দিয়া ডাক্তার দেখবার পারি না বলে হাসপাতালোত আসি। এখানে কোন চিকিৎসা নাই। জোবেদার মত চিকিৎসা নিতে এসেছেন, হাতিয়া গ্রামের ফুলমনি বেওয়া, সুখদেব কুন্ড হাসিনা বেগম, তারামনি ও আছিয়া বেগম সবার একই অভিযোগ হাসপাতালের ডাক্তার রোগি দেখে না।
জানা যায়, দীর্ঘ দিন ধরে হাসপাতাটিতে ডাক্তারের সংকট চলছিল।গত এক বছর আগেও ১১ জন ডাক্তার ছিল। এর পর একে একে সবাই বদলী নিয়ে চলে যান । বর্তমানে মেডিকেল অফিসার একজন সহ আবাসিক মেডিকেল অফিসার ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রয়েছেন। একজন ডাক্তার দিয়ে সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা যাচ্ছে না। ফলে ভেঙ্গে পড়েছে স্বাস্থ্য সেবা। হত দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা নিতে এসে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে।
মেডিকেল অফিসার ডা. বিসাধ চন্দ্র বলেন, অফিসের কাজ করছি। তাই কক্ষে বসা হয়নি। অভিযোগ আছে আপনী কোন দিন আপনার কক্ষে বসে রোগি দেখেন না। তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, ডাক্তার ও জনবল সংকটের কারনে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। গাইনী ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যহত হচ্ছে। হাসপাতাল চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। করোনা চিকিৎসার ব্যবস্থা দ্রুত করা বলে জানান। ডাক্তার আনার জন্য চেষ্টা করছি। জেলা সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক সবাই চেষ্টা করছেন । ডাক্তার আসলেই সংকট কেটে যাবে।

এন/ এস

বাংলাদেশ সময়: ১৮:৫৩:২৮   ২৪৭ বার পঠিত  |