ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫
প্রচ্ছদ » চট্রগ্রাম » ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাইন ব্রিজ প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়ম,৫৬ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন ঠিকাদার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাইন ব্রিজ প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়ম,৫৬ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন ঠিকাদার


খ.ম.জায়েদ হোসেন,নাসির নগর,(ব্রাহ্মণ বাড়ীয়া)
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫


ব্রাহ্মণবাড়িয়া নাইন ব্রিজ প্রকল্পের ব্যাপক অনিয়ম,৫৬ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন ঠিকাদার


ব্রাহ্মণবাড়িয়া:
 নাসিরনগর উপজেলার নাসিরনগর- টু-অরুয়াইল ও কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রামের সাথে সংযুক্ত নাইন ব্রিজ প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ১০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের ৫৬ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২১ সালে প্রকল্পটি তৈরি করে এলজিইডি তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কে টেন্ডার দিলে ৯টি ব্রিজ ২০২৩ ও ২৪ সালে সমাপ্তির ঘোষণা থাকলেও এখনো এই প্রকল্পে দুইটি ব্রিজ ছাড়া দৃশ্যমান আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি।

নাসিরনগর উপজেলা বাসী জানান, নাইন ব্রিজ প্রকল্পর মধ্যে দুইটি ব্রিজের দৃশ্যমান দেখলেও বাকি সাতটি ব্রিজের কাজের ধীরগতি,উদাসীনতা, গাফিলতির কারণে আটকে আছে।
নাসিরপুর ও ভলাকুটের সাধারণ মানুষ এই ব্রিজ নির্মাণের কাজ নিয়ে বলেন, ২০২১ সালে প্রকল্পের অনুমোদন হলে ২০২৩ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারদের উদাসীনতা, সময়ের কারচুপি আর এলজিইডির অসাধু লোকদের অসাধু ইচ্ছে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প ধীরগতিতে চলছে।

যেমন গ্রীষ্মকালে ব্রিজের কাজ চলে দিনের থেকে রাতেই বেশি, রাতে ঢালাই কাজ চলে নিম্নমানের পাথর, সিমেন্ট কম দিলে কেউ দেখেনা। মরিচা ঝং ধরা রড ব্যবহার হচ্ছে এই ব্রিজে, যত্রতত্র স্থানে সিমেন্ট পরে থাকে ফলে এগুলোতে বাতাস লেগে জমাট বেদে যায় এবং আর সেই সিমেন্ট গুলি আবার ঢালাই কাজে ব্যবহার হয়। অভিযোগ দিলে তারা শুনেও না শোনার ভান করে।

নাসিরনগর উপজেলার এলজিইডি উপজেলা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মৃধার দেয়া তথ্য অনুযায়ী নয়টি ব্রিজের মোট ব্যায় ধরা হয় ১০৪ কোটি ৯১ লক্ষ ৮১ হাজার ৪৩৮ টাকা।

এল জি ডির তথ্যসুত্রে জানা যায়, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হাসান এন্টারপ্রাইজ নয় ব্রিজ প্রকল্পে ৬ ব্রিজের অনুমোদন পায়।
কিন্তু সরজমিনে গেলে দেখা যায়, ব্রিজের কাজ হাসান এন্টারপ্রাইজ করছে এবং ৫৬ কোটি ১০ লক্ষ ২৫ হাজার ৮১৭ টাকাতুলে নিয়ে নিয়েছেন।

নাসিরনগর উপজেলার নাসিরপুর, ভলাকুট, খাগালিয়া ও চাতলপাড় এলাকায় চলমান সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ নিম্নমানের পাথর সিমেন্ট এবং রড দিয়ে কাজ করছে। বহুদিন আগে কাজ শুরু হলেও আজও এসব সেতু নির্মাণ শেষ হয়নি। নিম্নমানের কাজের কারণে জনগণের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

এই প্রকল্পগুলোর জন্য সরকারি বরাদ্দ হয় প্রায় ১০৪ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কাজ এগিয়েছে অল্প অংশ। অভিযোগ রয়েছে, কাজের অর্ধেকও শেষ না করেই কন্ট্রাক্টররা বিল উত্তোলন করেছেন। এতে প্রকল্পের টাকা ব্যয় হলেও কাজের বাস্তব চিত্র অল্প।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন ,যেখানে প্রতি ঢালাই এ কমপক্ষে ১২০ বস্তা সিমেন্ট লাগার কথা, সেখানে কন্ট্রাক্টরের নির্দেশে মাত্র ৭০ বস্তা ব্যবহার করা হয়েছে, এভাবে খরচ কমিয়ে লাভ বাড়ানো হচ্ছে ঠিকাদারের।

অসমাপ্ত সেতু ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তার কারণে এলাকায় যানবাহন চলাচল একপ্রকার অচল হয়ে পড়েছে। কৃষকরা ফসল বাজারে নিতে পারছেন না, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন, অসুস্থ রোগীরা হাসপাতালে যেতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সর্বসাধারণ,যা বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কাজ শেষ না করেই বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। আমাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে যদি এভাবে দুর্নীতি হয়, তাহলে উন্নয়ন কীভাবে হবে? এভাবে চলতে থাকলে জনগণের ভোগান্তি কমবে না।” তিনি আরো বলেন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আজকে এই অবস্থা।

এলাকাবাসী আরো জানান, এই সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প স্থানীয়ভাবে “সাবেক এমপি সংগ্রামের ইচ্ছা পূরণ প্রকল্প নামে পরিচিত।
অভিযোগ আছে, সাবেক এমপিকে ম্যানেজ করে এই কন্ট্রাক্টর একাধিক প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। কাজের মান নেই, সময়মতো শেষ হয় না। অথচ বিল ঠিকই তুলে নিয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। স্থানীয় লোকজন দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।
অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারী উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ কৃত কোটি কোটি টাকা সঠিক ব্যবহার না হলে, সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে বলে তারা দাবি করেন।

হাসান এন্টারপ্রাইজ দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহিম বলেন,আমাদের সব কাজ নিয়ম মেনে চলছে। তবে আমি কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কোনো বক্তব্য দেওয়ার এখতিয়ার রাখি না।

এলজিইডি’র দায়িত্বপ্রাপ্ত নাইন ব্রিজ প্রকল্পের কনসালট্যান্ট মোঃ আব্দুল মোতালেব বলেন, ৫০% থেকে ৭০% কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে।
ব্রিজগুলোর কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী সুন্দর ভাবে কাজ চলছে বর্ষার কারণে কিছুটা অসংগতি থাকলেও পর্যায়ক্রমে প্রকল্পের কাজ ঠিক হয়ে যাবে।
বর্ষা মৌসুমের কারণে সামান্য কিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলেও ধাপে ধাপে সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রতিদিনের কাজের বিস্তারিত রিপোর্ট জেলা অফিসে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জেলা অফিস থেকেই জানতে পারবেন।

সারজমিনে গেলে হাসান এন্টারপ্রাইজের সাইট ম্যানেজার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের কোম্পানির অধীনে নয়টি ব্রিজের কাজ চলমান নাসিরপুর, ভলাকুট, খাখালিয়া, দুর্গাপুর, চাতলপাড় চকবাজার, ইছাপুর, গুজিয়া খাইল ও কান্দারখাল ব্রিজের কাজ রয়েছে এবং ২ টি ব্রিজ ছাড়া বাকি ৭টি ব্রিজ ৫০% কাজ হয়েছে।

হাসান এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার খায়রুল হাসান বলেন, প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে আমাদের কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রথমত, ব্রিজ নির্মাণের জন্য যেটি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর পড়েছে। ফলে এলাকার কিছু মানুষ আমাদের কাজে বাধা দিয়েছেন। জমি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করতে কিছুটা সময় লেগেছে।

পরে নাসিরনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সরজমিনে এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি স্থানীয় জমির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আশ্বস্থ করেন এবং আমাদের দিক থেকেও কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। তাই কিছুদিন প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যায়।

হাসান এন্টারপ্রাইজ ঠিকাদার খাইরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, ‘আমাকে টেন্ডার প্রদান করা হয়েছে আমার যোগ্যতা ও সঠিক কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে। প্রথম পর্যায়ে মোস্তফা এন্টারপ্রাইজকে ১টি কাজ দেওয়া হয়, আমাকে ছয়টি এবং মোমেন এন্টারপ্রাইজকে একটি কাজ দেওয়া হয়। পরে যখন আবার টেন্ডার আহ্বান করা হয়, তখন বাকি ব্রিজগুলোর কাজ আমি পাই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী এনামুল হক বলেন,বর্ষার কারণে কিছুটা মালামাল আনয়নে সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা আশা করছি, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এক ব্যক্তি কিভাবে নয়টি ব্রিজের টেন্ডার পেতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,এর উত্তর আমার কাছে নেই। আমার আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন।
নির্মাণ কাজের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। এলজিইডি’র পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি সব সময় কাজ পর্যবেক্ষণ করছেন। আমি শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। এলাকার কিছু মানুষের যেসব অভিযোগ বা মন্তব্য এসেছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

বর্ষার কারণে মাল আনা নেওয়া করতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে তবে সঠিক সময়ে কাজ শেষ হয়ে যাবে, তিনি আরো বলেন অনিয়মের কোন অভিযোগ যদি আমাদের কাছে আসেন অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নাইন ব্রিজের কাজ অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে সমাপ্তি করার জন্যে সরকার তথা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করেন ভুক্তভোগী উপজেলাবাসী।

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ১৭:৪৬:৪১   ৩৩৩ বার পঠিত  |