![]()
পটুয়াখালী: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২৩৭ আসনে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। তা নিয়ে যত আলোচনা, তার চেয়ে বেশি গুঞ্জন- ‘হোল্ড’ করা ৬৩ আসন ঘিরে। দলটির তৃণমূলে প্রশ্ন উঠেছে হোল্ড করা আসনগুলো জোটের শরিকদের জন্য ছাড়া হয়েছে কি-না। এ নিয়ে কোথাও কোথাও বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষও দেখা গেছে।
পটুয়াখালী-৩ আসন ঘিরেই ঠিক এমন আলোচনা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। মূলত পটুয়াখালী-৩ আসনটি পটুয়াখালী জেলার দশমিনা উপজেলা, গলাচিপা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনেই গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের বাড়ি। তাই জোট থেকে হোক কিংবা দল থেকে হোক এই আসন থেকেই নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন নুর। অন্যদিকে আসনটি ফাঁকা রেখেছে বিএনপি। তাই দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন উঠেছে শেষ মুহূর্তে বিএনপি-গণঅধিকার পরিষদ জোট হলে নুর হতে পারেন জোটের প্রার্থী।
এই পরিস্থিতিতে পটুয়াখালী-৩ আসনে দলীয় প্রার্থীর দাবিতে সরব হয়ে উঠেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদ থেকে বলা হচ্ছে, কোনো দলের সঙ্গে জোটের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
স্থানীয় ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৪৬ বছর ধরে পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি কখনোই জয়ের মুখ দেখতে পায়নি। ১৯৮৬ সালের পর ওই আসনে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী। ১৯৯১ সালের পর থেকে সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থী এই আসন থেকে জয়ী হয়েছেন (তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শহীদ আলহাজ্ব শাহজাহান খান মাত্র ১৩ দিনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন)। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। গত ৫ আগস্টের পর থেকে একেবারেই ছন্নছাড়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এই পরিস্থিতিতে ওই আসন থেকে দলীয় প্রার্থী দিয়ে আসনটি ‘উদ্ধারের’ আশা করেছিলেন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। ওই সময় সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নেতাকর্মীদের মুখে মুখে শোনা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনের নাম। তবে শেষ পর্যন্ত পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে কাউকে মনোনয়ন না দেওয়ায় হতাশার কথা জানিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন বলেন, ‘গত ৪৬ বছর এখানে আমরা সংসদ সদস্য পাইনি। জাতীয় স্থায়ী কমিটি ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রতি আমাদের পুরোপুরি আস্থা আছে। যদিও এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। আশাকরি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বাইরে কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা একটি ঐতিহাসিক বিজয়ের মুহূর্তে রয়েছি। সেই বিজয়কে কাজে লাগিয়ে আমরা এই গলাচিপা-দশমিনাকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’
গলাচিপা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘কেন্দ্র কীভাবে নমিনেশন দেয় তা আমরা জানিনা। কিন্তু আমরা দফায় দফায় বৈঠক করছি। সেখানে তৃণমূলের সবাইকে নিয়ে একমত হয়েছি। আমরা বিএনপির দলীয় প্রার্থীর বাহিরে বিকল্প কোনো কিছু ভাবছি না এবং মেনেও নেব না।
দশমিনা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ-আলম শানু বলেন, ‘আমরা (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে বিএনপির সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে আছি। যেহেতু আমাদের আসন সহ ৬৩টি আসনে হোল্ড রাখা হয়েছে। আমাদের দাবি বিএনপির দলীয় প্রার্থী হাসান মামুনকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাই। দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর পর্যন্ত নির্যাতিত হয়েছি এবং জেল জুলুমের শিকার হয়েছি। বিগত তিনটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে ধানের শীষে ভোট দিতে পারি নাই।
অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, কারো সঙ্গে জোট বাধার আশায় বসে নেই দলটি। ৩০০ আসনে (খালেদা জিয়ার আসন ছাড়া) ইতোমধ্যে প্রার্থীদের সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি আসনের সাংগঠনিকভাবে কার্যক্রম অনেকেই গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাই জোটবদ্ধ হওয়ার সম্ভব নাও হতে পারে। যদিও এসব বিষয় নিয়ে এখনও আলাপ-আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
এদিকে জোটের বিষয়ে জানতে চাইলে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, এই গণঅভ্যুত্থানের আগে থেকেই আমাদের মধ্যে বিএনপিসহ বেশকিছু দলের সঙ্গে বোঝাপাড়া ছিল এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা জাতীয়, ঐক্যমতের মধ্যে দিয়ে কাজ করবো। গণঅভ্যুত্থানের পরও সেই আশা শেষ হয়ে যায়নি। আগামীতে স্থিতিশীল রাষ্ট্র এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র সংস্কারের যে একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে; এটা বাস্তবায়নের জন্য গণঅভ্যুত্থানের শরিকদের মধ্যে একটা ঐক্য এবং সংহতি দরকার।
বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান থেকে শুরু করে সিনিয়ররাও গণঅধিকার পরিষদকে নিয়ে সরকার গঠন-নির্বাচন করতে চায়। এখন আমাদের একটা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে; ইতোমধ্যেই আমাদের ৩০০ আসনের প্রার্থীদের সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে যে সব জায়গা গুলোতে নেতারা কাজ করেছেন, তারা একটা অবস্থান তৈরি করেছে। সে আসন গুলোতে সমঝোতা না হলে জোটবদ্ধ হওয়া সম্ভব হবে না। এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
যদিও গত ৫ আগস্টের পর থেকে পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে এই আসনেই গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হকের বাড়ি হওয়ার কারণে আসনটির অন্যতম দাবিদার দলটি। তাই আসনে দলের শীর্ষ নেতাকে জেতাকে অনেকটাই চাঙ্গাভাব দেখা গেছে গণঅধিকার পরিষদের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থীরাও জানিয়েছেন ভোটের মাঠে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস। আলোচনায় থাকা বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদ জোটের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিলেও নিজেদের প্রার্থী নিয়ে ভোটের মাঠে সরব জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ ইসলামী শাসনতন্ত্রের দুই প্রার্থী।
ইতোমধ্যে নির্বাচনী পোলিং এজেন্ট হিসেবে দেড় হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণের কথা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যাপক শাহ-আলম। তিনি বলেন, ‘এরইমধ্যে আমাদের ভোট কেন্দ্রের পোলিং এজেন্ট হিসেবে ১ হাজার ৫০০ নেতা কর্মীকে প্রস্তুত করা হয়েছে। ওয়ার্ড এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন চলমান আছে। বর্তমানে আমরা বিভিন্ন জায়গায় উঠান বৈঠক করছি। নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের ভালো একটা অবস্থান করেছি।’
বাংলাদেশ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন মনোনীত হাত পাখা প্রতীকের প্রার্থী মুফতি আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে আমাদের গলাচিপা-দশমিনায় সাংগঠনিক কমিটি পুরোপুরি হয়ে গেছে। বর্তমানে নির্বাচনী সেন্টারের কমিটির কাজগুলো চলছে। সে জায়গা থেকে বলা যায় যে, আমরা একটা ভালো অবস্থানে আছি। আশা করছি এই আমরা বিজয়ী হতে পারবো।
আর/ এন
বাংলাদেশ সময়: ১৭:৫৪:১৪ ৭০ বার পঠিত | ● গলাচিপা ● দশমিনা ● বিএনপি . পটুয়াখালী