![]()
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে জ্বালানি খাতে দেশের সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অফশোর ও অনশোরে গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো, জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
এ লক্ষ্যে জ্বালানির আমদানি শুল্ক হার কমানো, এ খাতের উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধাপ্রদানসহ সব ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা একান্ত অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবিলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন ডিসিসিআই সভাপতি।
বৈঠকটি আয়োজনে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিকে (ডিসিসিআই) সহায়তা করে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)।
বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, আমাদের জ্বালানি প্রাপ্তির স্বল্পতা অনেক দিন ধরেই রয়েছে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এটিকে আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
আগামী জুন পর্যন্ত কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য দেশে ৬ লাখ টনের সার মজুদ রাখা প্রয়োজন। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতি থাকবে প্রায় ৪ লাখ টন।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস অনুসন্ধানে সরকারের সক্ষমতা যেমন কম, সেই সঙ্গে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও শিথিলতা রয়েছে। সচিব জানান, বিদ্যুৎচালিত যানবাহন বিষয়ক একটি নীতিমালা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তাছাড়া দেশের রাজস্ব নীতিমালা অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তা সহায়ক নয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন রুগ্ন শিল্প-কারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান শিল্প সচিব।
বৈঠকে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এবং ২৫ শতাংশের বেশি এলএনজি বাণিজ্য প্রতিদিন হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করে, যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ডলার সংকটের কারণে আমাদের জ্বালানি খাত বর্তমানে একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তাসকীন আহমেদ।
বিশেষ করে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুত ক্রমশ কমে যাচ্ছে, যা দ্রুত আমদানির মাধ্যমে সমাধান করা না হলে পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার খরচ হয় এবং যদি তেলের দাম ১২০ ডলারের উপরে ওঠে, তবে অতিরিক্ত জ্বালানি খাতে খরচ বাড়বে বছরে ৪০০-৫০০ কোটি ডলার। এতে সরকারের লোকসান বাড়বে।
ডিসিসিআই সভাপতি জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট উৎপাদন ব্যয় ২৫-৩০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি কন্টেইনার অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪,০০০ ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে এবং সর্বোপরি জীবনযাত্রায় ব্যয়ের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। এই সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি সরবরাহ, সংগ্রহ ও স্বল্পমেয়াদী কৌশল গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাসকীন আহমেদ।
এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের জ্বালানি সংকট প্রতিটি মানুষের জীবন-জীবিকায় প্রভাব ফেলছে। এ সংকট মোকাবিলায় এ খাতের গ্রহণযোগ্য তথ্য নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে যথাযথ কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। জ্বালানির সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সৌর বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদ্যমান শুল্কহার প্রত্যাহারের ওপর জোর দেন তিনি। সেই সঙ্গে নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো এবং জ্বালানি আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এফবিসিসিআইর প্রশাসক।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (বিদ্যুৎ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহিদ সারওয়ার (অব:) বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর পন্থা হতে পারে। তবে শিল্পসহ অন্যান্য খাতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অফশোর ও অনশোরে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর বিকল্প নেই।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের সংস্কারের মাধ্যমে ভর্তুকি হ্রাসের ওপর জোর দেওয়া আবশ্যক। তিনি জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার উৎসাহিত করতে বিশেষ করে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি আমদানিতে শুল্ক কমাতে এনবিআরকে প্রস্তাব দেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই, তবে এক্ষেত্রে ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি এ খাতের এসএমই উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। সৌর বিদ্যুৎ খাতের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ২৭-৩০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে, যা এ খাতের অগ্রগতিতে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা বলে উল্লেখ করেন বিএসআরইএর ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি জাহিদুল আলম।
সৌর বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত ব্যাটারি আমদানিতে কমপক্ষে ১ বছরের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধাপ্রদানের প্রস্তাব করেন বাপীর ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি ও ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম. মোসাদ্দেক হোসেন।
ইডকলের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, এ সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের পাশাপাশি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
বিজিএমইএর সহসভাপতি বিদ্যা অমৃত খান বলেন, ইউরোপের দেশগুলোতে সৌর বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহারের কারণে বিদ্যমান জ্বালানি সংকটে দেশগুলোর ভোগান্তি তুলনামূলকভাবে কম, তবে আমাদের দেশে এ পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি বিদ্যুৎ খাতের সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে এলডিসি পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না বলে মতপ্রকাশ করেন। সামগ্রিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বেশি হারে গুরুত্ব দেওয়া এবং এর উৎপাদন বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জি. মো. সিরাজুল মাওলা বলেন, এলপিজির সরবরাহের অভাবে দেশে ইতোমধ্যে অনেক স্টেশন বন্ধ হয়েছে। এ খাতের দীর্ঘমেয়াদে একটি মাস্টারপ্ল্যান থাকা ও আমদানি উৎসের বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। সৌর বিদ্যুৎ খাতে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের কোনো বিকল্প নেই বলে অভিমত দেন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (কমার্শিয়াল অপারেশন) মোহাম্মদ নুরুল আবসার বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিডিবির ভর্তুকির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৩ হাজার কোটি টাকা। এর প্রধান কারণ হলো জ্বালানি উৎপাদন খরচ অনেক বেশি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম আরো বৃদ্ধি পেলে ভর্তুকি বাড়বে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর অধিক হারে গুরুত্বারোপের আহ্বান জানান।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. এম. শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা বিপর্যস্ত। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ যথাযথ নয়। বিগত সরকারের আমলে এ খাতের কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে আজকের এ বিপর্যয় তৈরি হয়েছে এবং বর্তমান সরকারকে এর সংস্কারে আরো উদ্যোগী হতে হবে। জ্বালানি বিষয়ক রেগুলেটরি কমিশনকে সক্ষমতা বাড়ানোর এবং ঘাটতি কমাতে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বৈশ্বিক পর্যায়ে সাধারণ বছরে ৩-৪ বার জ্বালানির মূল্য হ্রাস পায়, আমাদের জ্বালানি সংরক্ষণে সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমরা স্বল্পমূল্যের সময়ে অধিক হারে জ্বালানি ক্রয় করে ভর্তুকি কমাতে পারি। সেই সঙ্গে সর্বোপরি এ খাতে একটি সত্যিকারের ইকোসিস্টেম নিশ্চিতের ওপর তিনি জোর দেন।
বৈঠকে নির্ধারিত আলোচনায় আরও অংশ নেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক। ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সময়: ১:০১:৫৫ ২৩৩ বার পঠিত | ● জ্বালানি ● মোকাবিলা ● সংকট
----