ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

রবিবার, ১০ মে ২০২৬
প্রচ্ছদ » শিরোনাম » সিএনজি চালক থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর-এক সংগ্রামী মানুষের গল্প

সিএনজি চালক থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর-এক সংগ্রামী মানুষের গল্প


রায়হান উদ্দিন সুমন, হবিগঞ্জ ( সিলেট )
প্রকাশ: রবিবার, ১০ মে ২০২৬


সিএনজি চালক থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর-এক সংগ্রামী মানুষের গল্প
হবিগঞ্জ: বানিয়াচং-হবিগঞ্জ রাস্তায় প্রতিদিন অসংখ্য সিএনজি চলাচল করে। সেই সিএনজি চালকদের ভিড়ের মাঝেই একজন ভিন্নধর্মী মানুষ হলেন জিতু মিয়া । জীবিকার তাগিদে তিনি যেমন সিএনজি চালান, তেমনি নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে গড়ে তুলেছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে এক নতুন পরিচয়।
জিতুু মিয়ার দিন শুরু হয় খুব ভোরে। সকালে সিএনজি নিয়ে বের হয়ে তিনি যাত্রী পরিবহন করেন, পরিবারের খরচ জোগান। কিন্তু দিনের ব্যস্ততার ফাঁকেই তিনি খুঁজে নেন নিজের স্বপ্নের সময়। মোবাইল ফোনটাই তার প্রধান হাতিয়ার। যাত্রী না থাকলে কিংবা একটু অবসর পেলেই তিনি ভিডিও ধারণ করেন-কখনো গ্র্রামের ব্যস্ত জীবন, কখনো মানুষের ছোট ছোট গল্প, আবার কখনো নিজের অভিজ্ঞতা।
শুরুটা সহজ ছিল না। আশেপাশের অনেকেই তার এই উদ্যোগকে গুরুত্ব দেননি, কেউ কেউ উপহাসও করেছেন। কিন্তু জিতুু মিয়া থেমে যাননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ভিডিও আপলোড করতে থাকেন। ধীরে ধীরে তার ভিডিওগুলো মানুষের নজরে আসতে শুরু করে। তার সরল ভাষা, বাস্তব জীবনের গল্প এবং আন্তরিক উপস্থাপনা দর্শকদের মন জয় করে নেয়।
বর্তমানে ফেসবুকে তার ফলোয়ার সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। অনেকেই তার ভিডিও থেকে অনুপ্রেরণা পান। একজন সাধারণ সিএনজি চালক হয়েও তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো মানুষ নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।

জিতু মিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন, আমি ছোট মানুষ, কিন্তু আমার স্বপ্ন ছোট না। আমি চাই আমার গল্প দেখে অন্যরাও সাহস পাক। তার এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং সমাজের জন্যও একটি বার্তা। পেশা নয়, মানুষের ইচ্ছা আর প্রচেষ্টাই তাকে আলাদা করে তোলে। এই সিএনজি চালক আজ শুধু একজন চালক নন, তিনি একজন স্বপ্নবাজ কনটেন্ট ক্রিয়েটর, যিনি প্রতিদিন নিজের গল্প লিখে চলেছেন।
জিতু মিয়ার এই ভিন্নধর্মী যাত্রা নিয়ে আশেপাশের সাধারণ মানুষদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী একজন নিয়মিত যাত্রী সৈয়দ সঈদ উদ্দিন ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক ইমতিয়াজ আহমেদ লিলুু বলেন, আমি প্রায়ই তার সিএনজিতে উঠি। আগে জানতাম না তিনি ভিডিও বানান। পরে ফেসবুকে তার ভিডিও দেখে অবাক হয়েছি। একজন চালক হয়েও এত সুন্দরভাবে কথা বলেন! এভাবে কনটেন্ট বানান। বিষয়টা সত্যিই অনুুপ্রেরণামূলক।
স্থানীয় এক টং দোকানদার জসিম মিয়া জানান,শুরুতে আমরা বিষয়টা তেমন গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু এখন দেখি, অনেকেই তাকে চেনে। তার জন্য আমাদের এলাকাটাও একটু পরিচিতি পাচ্ছে। একজন তরুণ ফেসবুুক ফলোয়ার বলেন, আমি তার ভিডিও নিয়মিত দেখি। তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষের গল্প তুলে ধরেন, সেটা খুবই বাস্তব লাগে। এতে আমরা অনুপ্রাণিত হই। শিক্ষক দিদার হোসেন বলেন-সব কাজের পাশাপাশি নিজের স্বপ্ন ধরে রাখা সহজ না। উনি সেটা করে দেখাচ্ছেন। এটা সত্যিই প্রশংসনীয়।
প্রবীণ ব্যক্তি সিদ্দিক মিয়া বলেন, আমাদের সময়ে এসব সুযোগ ছিল না। এখনকার তরুণরা যদি তার মতো পরিশ্রম করে, তাহলে তারা অনেক দূর যেতে পারবে। এইসব সাধারণ মানুষের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, জিতু মিয়ার এই উদ্যোগ শুধু তার নিজের জীবনই বদলাচ্ছে না, বরং আশেপাশের মানুষদের মধ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জিতু মিয়া এর আগেও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সবসময় সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। শীতবস্ত্র বিতরণ, অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসামগ্রী প্রদান, বন্যা বা প্র্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণসহ নানা মানবিক উদ্যোগে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া, তিনি তরুণদের সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করেছেন। তার এই ধারাবাহিক সামাজিক অবদান স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছে এবং তাকে একজন মানবিক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে প্রতষ্ঠিত করেছে।
জিতু মিয়া তার সামাজিক কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ ও এলাকার প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাই তিনি স্থানীয় ধনী ব্যক্তি ও বিদেশে অবস্থানর প্রবাসীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে তাদেরকে মানবিক কাজে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেছেন।
তার উদ্যোগে প্রবাসীদের আর্থিক সহায়তা ও বিত্তবানদের সহযোগিতায় বিভিন্ন সময় শীতবস্ত্র বিতরণ, খাদ্য সহায়তা, ইফতার বিতরণ, শিক্ষাসামগ্রী প্রদানসহ নানা কার্যক্রম সফলভা বিগত দিনে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলে সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা উপকৃত হয়েছেন এবং এলাকায় একটি সহযোগিতামূলক ও মানবিক পরিবেশ গড়ে উঠেছে।

সিএনজি চালক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর বানিয়াচং উপজেলা সদরের ৩নং দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্গত দোয়াখানী মহল্লার মৃত ছোরাব আলীর পুুত্র।

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ১৯:৫২:৫৭   ২০১ বার পঠিত  |