![]()
ফরিদপুর: সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে অনিয়ম, অপচয় কিংবা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ প্রায়ই আলোচনায় আসে। তবে সেই প্রচলিত চিত্রের বাইরে গিয়ে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় দেখা গেছে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
উপজেলার তিনটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর অব্যয়িত ৭৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৫ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছে সালথা উপজেলা
প্রশাসন। আর এ উদ্যোগের নেতৃত্বে ছিলেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন।
সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার এ ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে এসেছে প্রশাসনের এই ইতিবাচক পদক্ষেপ।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সালথা উপজেলার আটঘর, রামকান্তপুর ও সোনাপুর ইউনিয়নের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখননের জন্য মোট ১ কোটি ৬৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪০৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় ৪ দশমিক ৫৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা, কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পরে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল
ইসলাম কাজের অগ্রগতি ও মান পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো সময়জুড়ে নিয়মিত তদারকি করা হয়। কাজের গুণগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি ব্যয়ের প্রতিটি খাত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ফলে নির্ধারিত মান বজায় রেখেই তুলনামূলক কম ব্যয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
প্রায় তিন মাসব্যাপী খননকাজ শেষে শ্রমিকদের মজুরি, যন্ত্রপাতি ব্যবহার, পরিবহন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ সব বিল পরিশোধ করা হয়। এরপরও ৭৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৫ টাকা অব্যয়িত থাকে। সরকারি বিধি অনুযায়ী সেই অর্থ কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) একাধিক সদস্য জানান, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ও সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা নিয়মিত কাজের স্থান পরিদর্শন করেছেন এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
তাদের মতে, “প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাজের মানও বজায় রাখা হয়েছে। অন্য অনেক স্থানের তুলনায় সালথার খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ] অধিক মানসম্মত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছিল। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচসংকট ছিল নিত্যদিনের সমস্যা। খাল পুনঃখননের ফলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, কৃষিকাজে সুবিধা বাড়বে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
এলাকাবাসী বলেন, খালগুলো সচল থাকলে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মাছের প্রাকৃতিক আবাসনও পুনরুদ্ধার হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ইউএনও দবির উদ্দিন বলেন, “সরকারি অর্থ জনগণের আমানত। এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। আমরা চেষ্টা করেছি প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার পর যে অর্থ অবশিষ্ট ছিল, তা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। জনগণের কল্যাণে বরাদ্দকৃত প্রতিটি টাকার
যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রশাসনের দায়িত্ব।”
সালথা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন বলেন, সরকারি প্রকল্পে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেওয়ার সংস্কৃতি শক্তিশালী
হলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয় রোধে এটি অন্য প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর জন্যও একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
সালথার খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার ঘটনা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি দায়িত্বশীলতা, সততা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি বাস্তব উদাহরণ। এমন উদ্যোগ সরকারি প্রশাসনে সুশাসনের চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই মনে করেন তিনি।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ২১:০২:৫৮ ১২ বার পঠিত | ● খাল পুনঃখনন ● সালথা