![]()
‘ওয়ান নাইট অনলি’ ছবির গল্পটাই এমন, যা শুনলেই নানা প্রশ্ন মাথায় আসতে পারে। বছরে মাত্র একটি রাত—সেই রাতে বিয়ের আগে যৌন সম্পর্ক বৈধ। বাকি সময় তা নিষিদ্ধ। শুনতে অনেকটা ‘দ্য পার্জ’–এর মতো, তবে সেখানে হত্যার বদলে এক রাতের জন্য বৈধ হয়ে যায় যৌন সম্পর্ক।
এমন অদ্ভুত, উসকানিমূলক ও একই সঙ্গে রোমান্টিক একটি ধারণা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন রোমান্টিক কমেডি ‘ওয়ান নাইট অনলি’। ছবির পরিচালক উইল গ্লাক। ‘ইজি এ’–এর মতো কিশোরপ্রিয় সিনেমা দিয়ে পরিচিত এই নির্মাতা এর আগে ‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ দিয়েও প্রমাণ করেছেন, প্রচলিত রোমান্টিক কমেডিকে নতুনভাবে দর্শকের সামনে হাজির করার ক্ষমতা তাঁর আছে। গত শুক্রবার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি নিয়ে চলছে তর্কবিতর্ক।
![]()
তবে ‘ওয়ান নাইট অনলি’ তৈরি করতে গিয়ে একটি বিষয়ে তিনি নিজেই বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন। ছবিতে অনেক নগ্ন দৃশ্য শুট করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলোর বড় অংশ বাদ দিয়েছেন। কারণ, দর্শকের প্রতিক্রিয়া তাঁকে বুঝিয়েছে—সিনেমার পর্দায় অতিরিক্ত যৌনতা বা নগ্নতা অনেক সময় গল্পের বদলে দর্শকের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়।
বছরে এক রাত, যখন যৌনতা বৈধ
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যালি। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন মনিকা বারবারো। অ্যালি একজন উঠতি গায়িকা। তবে নিজের সংগীত প্রতিভা দিয়ে বড় মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার বদলে আপাতত তাঁকে দেখা যায় ওষুধের বিজ্ঞাপনের বিব্রতকর জিঙ্গেলে নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করতে।
অন্যদিকে ক্যালাম টার্নারের চরিত্র ওয়েন একটি পিৎজার দোকানের মালিক। দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও বেশ স্থিতিশীল। কিন্তু এই বিশেষ রাতে তাঁর প্রেমিকা সিদ্ধান্ত নেন, তিনি অন্য মানুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়াবেন।
নিউইয়র্ক শহরে শুরু হয় ১২ ঘণ্টার এক অদ্ভুত রাত। নানা ঘটনা, বিশৃঙ্খলা আর হাস্যকর পরিস্থিতির মধ্যে অ্যালি ও ওয়েন—দুই অপরিচিত মানুষ—বারবার একে অপরের মুখোমুখি হতে থাকে।
ছবির মূল কৌতুক ও রোমান্স তৈরি হয় এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিকে ঘিরেই।
তবে পরিচালক উইল গ্লাক জানেন, এই গল্প শুনে দর্শকের মাথায় অনেক প্রশ্ন আসবে। কেন এমন আইন করা হলো? কেউ আইন ভাঙলে কী হবে? সরকার কীভাবে বুঝবে কে যৌন সম্পর্কে জড়াচ্ছে? এই আইনটির প্রয়োজনই–বা কেন?
গ্লাকের উত্তর—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ছবির মূল আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
‘এই সিনেমা আসলে নিয়ম নিয়ে নয়’
পরিচালক মনে করেন, ছবির বিকল্প বাস্তবতাটি গল্পের পটভূমিমাত্র। আসল গল্প হলো এই অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে মানুষ কীভাবে জীবন ও সম্পর্ক সামলায়।
তাঁর ভাষায়, সিনেমাটিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ, অভিনেতারা যখন টক শোতে যান, তখন অনুষ্ঠানের বড় অংশজুড়ে তাঁদের ছবির নিয়মকানুন ব্যাখ্যা করতে হয়। অথচ ছবিটি আসলে সেই নিয়ম নিয়ে নয়। দর্শককে সিনেমাটি দেখার সুযোগ দিতে হবে—এটাই তাঁর মতে সবচেয়ে ভালো উপায়।
এই ভাবনাই গ্লাককে গল্প বলার ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে সাহায্য করেছে। তিনি চেয়েছেন, ‘ওয়ান নাইট অনলি’র অদ্ভুত পৃথিবীটি যেন দর্শকের কাছে অনুভূত হয়, কিন্তু সেটিই যেন ছবির মূল বিষয় হয়ে না দাঁড়ায়।
কেন বাদ গেল এত নগ্ন দৃশ্য?
ছবির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো যৌনতা ও নগ্নতার ব্যবহার। পরিচালক নিজেই স্বীকার করেছেন, শুটিংয়ের সময় ছবিতে অনেক বেশি নগ্ন দৃশ্য ছিল। কিন্তু সম্পাদনার সময় তিনি বুঝতে পারেন—সব দৃশ্য রাখার প্রয়োজন নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে দর্শকের আচরণ নিয়ে পরিচালকের নিজের পর্যবেক্ষণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, বিষয়টি শুধু জেন-জি বা জেন-আলফা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের সামগ্রিক আচরণেই পরিবর্তন এসেছে।
একসময় সিনেমা হলে নগ্নতা বা যৌন দৃশ্য দেখা ছিল তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক বিষয়। এখন মানুষের হাতে ব্যক্তিগত ফোনে ঘরে বসে এসব দেখার সুযোগ আছে। ফলে যৌনতা ও নগ্নতা অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
সিনেমা হলে সবাই মিলে বসে থাকার সময় একই ধরনের দৃশ্য দেখলে তাই অনেক দর্শক অস্বস্তি বোধ করেন—এমনটাই মনে করেন গ্লাক।
তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি আগের সিনেমার সম্পাদনার সময়ও বুঝেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা ‘ওয়ান নাইট অনলি’তে কাজে লাগিয়েছেন। কিন্তু তাতেও তাঁর মনে হয়েছিল, যথেষ্ট কাটছাঁট করা হয়নি।
কারণ, ছবিতে এমন অনেক নগ্ন দৃশ্য ছিল, যেগুলো নিউইয়র্কের রাস্তায় শুট করা হয়েছিল। নির্মাতার ধারণা ছিল, এমন দৃশ্য ছবির পৃথিবীকে বাস্তব করে তুলবে। কিন্তু দর্শকদের সামনে ছবিটি দেখানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
দর্শক যখন চরিত্রগুলোর গল্পে ডুবে আছেন, তখন হঠাৎ ক্যামেরা ঘুরে দুজন নগ্ন মানুষকে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত দেখালে তাঁদের মনোযোগ গল্প থেকে সরে যাচ্ছে। দর্শকদের শারীরিক প্রতিক্রিয়াও পরিচালক লক্ষ করেছেন—অনেকে পাশে বসা মানুষের দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন।
গ্লাকের উপলব্ধি ছিল, এসব দৃশ্য রাখার সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। তাই একের পর এক দৃশ্য বাদ দিতে থাকেন তিনি। শেষ পর্যন্ত এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা হয়, যাতে দর্শকদের সেই অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়াগুলো আর দেখা না যায়।
অন্তরঙ্গ দৃশ্যে ছিল বিশেষজ্ঞের সহায়তা
যৌন দৃশ্য বাদ দেওয়া হলেও ছবিতে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের অভাব নেই। বরং ছবির গল্পেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ যৌনতা। তাই এমন দৃশ্যের শুটিং কীভাবে নিরাপদ ও পেশাদার পরিবেশে করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গ্লাক জানিয়েছেন, ছবির সেটে একজন দক্ষ ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর ছিলেন। পাশাপাশি ব্যাকগ্রাউন্ডের বিভিন্ন যৌন দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য বাস্তব জীবনের দম্পতিদেরও নেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ, হঠাৎ কোনো অতিরিক্ত চরিত্রকে এনে বলা হয়নি—আপনারা পরস্পরকে চুমু খাবেন বা অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করবেন। বরং বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের বাস্তব দম্পতিদেরই বেছে নেওয়া হয়েছিল।
কেউ ছিলেন বিবাহিত, কেউ সিনেমা চলাকালে সম্পর্ক ভেঙেছেন, আবার কেউ কেউ এমনও ছিলেন, যাঁরা ছবিতে কাজ করতে গিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন।
নিউইয়র্কের রাস্তায় অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
‘ওয়ান নাইট অনলি’র অনেক দৃশ্যই বাস্তব নিউইয়র্ক শহরে ধারণ করা হয়েছে। ফলে অভিনয়শিল্পীদের কখনো কখনো অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
গ্লাক জানিয়েছেন, অনেক সময় গাড়ির ভেতরে অভিনেতাদের অর্ধনগ্ন অবস্থায় অভিনয় করতে হয়েছে। বাইরে দিয়ে যাওয়া মানুষজন স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতেন। কখনো তাঁদের সরে যেতে বলা হলেও কেউ কেউ রাজি হননি। তবে পরিচালক শেষ পর্যন্ত বিষয়টিকে ছবির বাস্তবতার অংশ হিসেবেই দেখেছেন।
কারণ, সত্যিই যদি এমন কোনো ঘটনা নিউইয়র্কের রাস্তায় ঘটত, তাহলে মানুষ নিশ্চয়ই তাকিয়ে দেখত। তাই ছবির কিছু দৃশ্যে পথচারীদের গাড়ির জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
পোস্টার থেকে গ্রাফিতি—সবই ছিল পরিকল্পিত
ছবিতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ‘ওয়ান নাইট’ বা এই বিশেষ আইনের নানা পোস্টার, বিজ্ঞাপন ও সাইন দেখা যায়। এগুলো পরে কম্পিউটারে তৈরি করা হয়নি; বাস্তবেই সেগুলো তৈরি করে শুট করা হয়েছে।
গ্লাকের দল প্রতিটি দৃশ্য নিয়ে আলাদা করে পরিকল্পনা করেছিল। কোন জায়গায় কী সাইন থাকবে, কোথায় কী গ্রাফিতি থাকবে, এমনকি পেছনে কারা চুমু খাবে—সবকিছুর পরিকল্পনা ছিল।
এ কারণে ছবির কাল্পনিক পৃথিবীটিকে বাস্তব মনে হয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, ছবির এসব বিজ্ঞাপনের সঙ্গে যুক্ত ব্র্যান্ডগুলো পরিচালককে কোনো টাকা দেয়নি।
ইন্টারনেটে অনেকে ভেবেছিলেন, ডানকিন, ডিউরেক্সসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডকে ছবিতে দেখানোর জন্য নির্মাতারা নিশ্চয়ই বড় অঙ্কের অর্থ পেয়েছেন। গ্লাক জানিয়েছেন, বাস্তবতা ছিল উল্টো। তাঁদের বরং বিভিন্ন কোম্পানিকে অনুরোধ করতে হয়েছে, যাতে ব্র্যান্ডের নাম ও বিজ্ঞাপনকে ছবির গল্প অনুযায়ী বদলে ব্যবহার করার অনুমতি পাওয়া যায়।
কিছু ব্র্যান্ড রাজি হলেও ডুয়োলিঙ্গোর সম্মতি পাওয়া পরিচালকের কাছেও ছিল বিস্ময়ের বিষয়। ছবিতে ডুয়োলিঙ্গো, রেড বুল, ডানকিন ও ইকুইনক্সের মতো ব্র্যান্ড দেখা যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের তৈরি করা মজার সংস্করণ ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিতে হয়েছে।
মনিকা বারবারোর জন্য বদলে গেল চরিত্র
অ্যালি চরিত্রটি শুরু থেকেই যে গায়িকা হবে, এমনটা ছিল না। অভিনেত্রী মনিকা বারবারোকে চূড়ান্ত করার পর চরিত্রটির এই দিক যোগ করেন গ্লাক। পরিচালকের একটি অভ্যাস আছে—অভিনেতা চূড়ান্ত হওয়ার পর তিনি চিত্রনাট্য আবার নতুন করে লেখেন। মনিকার সঙ্গে কথা বলার পর তাঁর মনে হয়, অ্যালিকে অবশ্যই গায়িকা হতে হবে।
মজার বিষয়, বাস্তবে মনিকার মঞ্চভীতি রয়েছে। অথচ তাঁর কণ্ঠ অসাধারণ। সেই ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যও চরিত্রটির মধ্যে ঢুকিয়ে দেন পরিচালক।
আর ওষুধের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত গান? সেটিও গ্লাকের ব্যক্তিগত পছন্দের ফল। তিনি বরাবরই ওষুধের বিজ্ঞাপন পছন্দ করেন।
পিৎজা বানানো শিখেছিলেন ক্যালাম
ক্যালাম টার্নারের চরিত্র ওয়েন যেহেতু পিৎজার দোকানের মালিক, তাই চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অভিনেতাকেও পিৎজা বানানো শিখতে হয়েছে।
গ্লাক জানিয়েছেন, ক্যালাম টানা পাঁচ দিন একটি পিৎজার দোকানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, অভিনেতা বেশ ভালোই শিখে ফেলেছিলেন।
তবে সিনেমার শুটিংয়ে পিৎজা নিয়ে একটি সমস্যায় পড়তে হয়েছে দলকে। পিৎজা খুব দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। ফলে ক্যামেরায় ভালো দেখানোর জন্য বারবার নতুন পিৎজা বানাতে হয়েছে।
অভিনেতারাও সত্যিকারের পিৎজা খেয়েছেন। তাঁরা খাবার মুখে নিয়ে শুধু অভিনয়ের জন্য চিবিয়ে ফেলে দেননি। ফলে দৃশ্যের শেষ দিকে মনিকা ও ক্যালামের অবস্থা এমন হয়েছিল যে তাঁদের বলতে হচ্ছিল, ‘আর পারছি না।’
এই অভিজ্ঞতা থেকে পরিচালকের শিক্ষা—পরের সিনেমায় এমন খাবার বেছে নিতে হবে, যা এত দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায় না।
‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ জুটির চমক
উইল গ্লাকের আগের রোমান্টিক কমেডি ‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ বক্স অফিসে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছিল। সিডনি সুইনি ও গ্লেন পাওয়েল অভিনীত সিনেমাটি ধীরে ধীরে দর্শকের মুখে মুখে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
‘ওয়ান নাইট অনলি’তেও এই দুই অভিনেতার উপস্থিতি আছে। তবে তাঁরা সরাসরি ক্যামিও করেননি। বরং তাঁদের এমনভাবে দেখানো হয়েছে, যা দর্শকের জন্য মজার ও অপ্রত্যাশিত হতে পারে।
গ্লাক জানিয়েছেন, দুজনই ক্যামিও করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের ব্যস্ত সময়সূচির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তাই শেষ পর্যন্ত অন্যভাবে তাঁদের যুক্ত করা হয়েছে।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে
বাংলাদেশ সময়: ০:২২:০১ ৬ বার পঠিত | ● চলচিত্র ● দৃশ্য ● নগ্ন