ঢাকা    রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
প্রচ্ছদ » বরিশাল » হাসপাতালবিহীন দেশের একমাত্র উপজেলা রাঙ্গাবালী

হাসপাতালবিহীন দেশের একমাত্র উপজেলা রাঙ্গাবালী


আঃ মজিদ খান, (পটুয়াখালী )
প্রকাশ: শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬


হাসপাতালবিহীন দেশের একমাত্র উপজেলা রাঙ্গাবালী

পটুয়াখালী: রাঙ্গাবালী উপজেলায় প্রায় দুই লাখ মানু‌ষের বসবাস। দেশের হাসপাতালবিহীন উপজেলা এটি। দেশের মূল ভূখণ্ড থেক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দাদের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে ছুটতে হয় গলাচিপা, নয়তো কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেজন্য পাড়ি দিতে হয় উত্তাল আগুনমুখা কিংবা রামনাবাদ নদী। প্রসূতি কিংবা গুরুতর অসুস্থ কাউকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছার আগেই চলে যায় প্রাণ।

জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে রাঙ্গাবালীর উপজেলার অবস্থান। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, উত্তরে আগুনমুখা নদী, পূর্বে বুড়াগৌরাঙ্গ ও পশ্চিমে রাবনাবাদ নদনদী বেষ্টিত দ্বীপ উপজেলা এটি। ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি উপজেলাটি প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর কেটে গেছে একযুগের বেশি সময়। এর এক দশক পর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সেখানে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্মাণ শুরু হয়। কিন্তু দুই দফা সময় বাড়িয়েও মূল অবকাঠামোগত কাজ শেশ হয়নি। শুরু হয়নি হাসপাতালের কার্যক্রমও।

গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে এই উপজেলা। গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গাবালী উপজেলায় জনসংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজার ৩১২ জন। এখানকার মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও একটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। তবে উপজেলার নতুন ইউনিয়ন মৌডুবিতে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। পাঁচ চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র একজন। তবে তিনিও বর্তমানে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবস্থান করছেন। সূত্র জানায়, চার বছর আগে চালিতাবুনিয়া উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক হিসেবে ডা. নুরুদ্দিন নামে একজনের পদায়ন হলেও তিনি এক দিনের জন্যও সেখানে আসেননি।

অন্যদিকে, চারটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় বন্ধ রয়েছে। অপর তিনটি রাঙ্গাবালী সদর, ছোটবাইশদিয়া ও চরমোন্তাজ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছয়জন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্বাস্থ্য সহকারী) থাকার কথা; কিন্তু কর্মরত আছেন তিনজন।

স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গাবালী থেকে জেলা সদর ও আশপাশের উপজেলায় যাতায়াতে প্রধান ভরসা ট্রলার ও লঞ্চ। তবে সন্ধ্যার পর নৌযান বন্ধ হয়ে গেলে রোগীকে অন্য উপজেলায় নেওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। তখন ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা ও অনেক সময় স্পিড বোটে পার্শ্ববর্তী গলাচিপা ও কলাপাড়া উপজেলাতে নিয়ে যেতে হয়।

কোড়ালিয়া গ্রামের টুম্পা রানী বলেন, জরুরি চিকিৎসা নিতে গিয়ে পথেই অনেক অন্তঃসত্ত্বা ও গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার এখানে নিয়মিত ঘটনা। জাফর হাওলাদার না‌মে একজন বলেন, আমার স্ত্রী হোস‌নেয়ারা অন্তঃসত্ত্বা ছি‌ল। অসুস্থ তাকে নিয়ে আগুনমুখা পা‌ড়ি দি‌য়ে গলা‌চিপা হাসপাতা‌লে রওনা দিই। পথের ম‌ধ্যে ট্রলা‌রেই আমার স্ত্রী মারা যায়। আমার স্ত্রীর মতো এমন কারও জীবন চিকিৎসার অভাবে ঝরে না পড়ুক, এমনটাই চাওয়া আমার। আমা‌দের দা‌বি দ্রুত রাঙ্গাবালীতে হাসপাতাল হোক।

ঠান্ডা-জ্বর আক্রান্ত তিন মাসের শিশুকে নিয়ে পটুয়াখালীর হাসপাতালে গিয়েছিলেন বেল্লাল গাজী ও সুমাইয়া আক্তার। অসুস্থ সন্তান নিয়েই পরদিন দুপুরেই বাড়ি ফেরেন রাঙ্গাবালী উপজেলার এ দম্পতি। যাতায়াতে দুবার উত্তাল আগুনমুখা নদী পাড়ি দেন তারা।

স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গাবালীতে তিন বছর আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজে শুরু হলেও, এখনো শেষ হয়নি। এতে অসুস্থ হলে নদী পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলা বা জেলা শহরে যেতে হয় তাদের। উপজেলা ঘোষণার ১৪ বছরেও কাটেনি চিকিৎসা সংকট। জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাঙ্গাবালীতে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে প্রথম লটে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবুল কালাম আজাদ,প্রাইম কনস্ট্রাকশনকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৬৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বরাদ্দ না থাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শেষ করতে পারছে না তারা।

গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মেজবাহউদ্দিন জানান, রাঙ্গাবালী বিচ্ছিন্ন একটি উপজেলা। তারা চিকিৎসা কর্মকর্তা পাঠিয়ে দ্বীপবাসীর কাছে সেবা পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় পার্শ্ববর্তী অন্যের বাড়ির আঙিনায় সেবা দিচ্ছেন।

পটুয়াখালী পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, রাঙ্গাবালীতে চিকিৎসক ও লোকবলের সংকট রয়েছে। একটি কেন্দ্র বন্ধও রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ পর্যাপ্ত নেই। তবে সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।

পটুয়াখালী সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, রাঙ্গাবালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শুরুর এক বছরের মধ্যেই নানা জটিলতা ২০২৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। বাকি কাজ দুটি লটে ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ হবে। এর মধ্যে লট-১-এ মূল হাসপাতালের ভবনের নতুন ঠিকাদারের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন।

সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, কয়েকটা কমিউনিটি ক্লিনিক ছাড়া রাঙ্গাবালীতে কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেই। এটা আসলেই দুই লাখ মানুষের জন্য খুবই কষ্টকর ব্যাপার। তবে আশার কথা হচ্ছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বন্ধ কাজ শিগগির শুরু হতে যাচ্ছে। লট-১ মূল হাসপাতালের ভবনটার কাজ এক মাসের মধ্যে শুরু হবে আশা করা যায়। দুই লটে ২০২৭ সালের মধ্যে কাজ শেষ হতে পা‌রে।

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ২০:৪৫:৫৬   ১০ বার পঠিত  |