![]()
আমন চাষের জন্য তিন একর জমি প্রস্তুত করেছেন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চাষি শাহজাহান খাঁ (৫২)। তাঁর বাড়ি উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে। জমির জন্য গত শনিবার কালিশুরি বাজারের সার ডিলার মেসার্স তপন ট্রেডার্সে যান। কিন্তু সেখানে তাঁকে সার দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে এক খুচরা বিক্রেতার (সাব-ডিলার) কাছ থেকে এক বস্তা টিএসপি ও এক বস্তা ইউরিয়া সার কেনেন তিন হাজার ১০০ টাকায়। অথচ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের দাম এক হাজার ৩৫০ টাকা ও টিএসপির দাম এক হাজার ৩৫০ টাকা। সে হিসাবে প্রতি বস্তায় ২৫০ টাকা বেশি গুনতে হয়েছে এই চাষিকে।
গতকাল রোববার শাহজাহান খাঁকে পাওয়া যায় কেশবপুরে। তিনিসহ কয়েকজন চাষি জানান, ডিলারের দোকানে সরকারি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা সংকট দেখিয়ে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বেশি দাম রাখছেন। বাড়তি দাম না দিলে সার পাওয়া যায় না।
একই রকম অভিযোগ নওমালা ইউনিয়নের বটকাজলের কৃষক গোকুল বিশ্বাস, জুরান হাওলাদার ও বাউফল সদর ইউনিয়নের অলিপুরার কৃষক জসিম উদ্দিনের। গোকুল বর্গাচাষি। তিন একর জমিতে আমনের চারা রোপণ করেছেন। মূল ডিলারের কাছে সার না পেয়ে এক বস্তা টিএসপি ও এক বস্তা ইউরিয়া সার কিনেছেন তিন হাজার ১০০ টাকায়।
প্রশাসনের তথ্যমতে, সরকার কৃষক পর্যায়ে বিক্রির জন্য ইউরিয়া সারের ৫০ কেজি বস্তার দাম নির্ধারণ করেছে এক হাজার ৩৫০ টাকা। এ ছাড়া টিএসপির জন্য এক হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি সারের জন্য এক হাজার ৫০ ও এমওপি সারের দাম এক হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে। উপজেলায় সরকার অনুমোদিত ডিলার আছেন ১৫ জন। সাব-ডিলার আছেন ১০৫ জন। তাদের নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রির কথা থাকলেও মাঠের চিত্র বিপরীত।
উপজেলার চরাঞ্চলের আমন ধানের আবাদ বেশি হয়। এ কারণে এই মৌসুমে ইউরিয়া ও টিএসপির চাহিদা বেশি। ইউরিয়া সারের বস্তা কিনতে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চাষিকে গুনতে হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা। এ ছাড়া এক হাজার ১৫০ টাকার নিচে ডিএপি, এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকার নিচে টিএসপি সার মিলছে না কোথাও। দাশপাড়ার চাষি এমরান ঢালির বলেন, যখন সারের প্রয়োজন বেশি হয়, তখনই দোকানদাররা সার নেই বলে নাটক করেন। চাহিদামতো টাকা দিলেই সার বের করে দেন।
ধুলিয়া ইউনিয়নের ধুলিয়া গ্রামের জব্বার প্যাদা বলেন, ইউনিয়ন ডিলারের কাছে গেলে বলেন, খুচরা দোকানে সার ভাগ করে দিয়েছেন। আর খুচরা দোকানিরা বলেন, সারের সরবরাহ কম, বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়; ক্যারিং খরচ আছে– তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।
এ বিষয়ে কালিশুরি বাজারের মেসার্স তপন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তপন কুমারের দাবি, তিনি নির্ধারিত দরেই দোকানি ও কৃষকের কাছে সার বিক্রি করেন। দোকানিরা বেশি দামে বিক্রি করলে তাঁর করার কিছু নেই। নওমালা ইউনিয়নের ডিলার মেসার্স বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আতিকুর রহমান মামুন বলেন, কৃষকরা খুচরা দোকানিদের কাছ থেকে কিনে প্রতারিত হলে তারা কি করবেন?
তবে কয়েকজন সাব-ডিলারের ভাষ্য, ডিলারের কাছ থেকে তারা যে দরে সার কিনেন, তার সঙ্গে ভাড়া যুক্ত করে বস্তায় ৫০ টাকা লাভ থাকে। তাই সামান্য বেশি দাম রাখেন। কালাইয়া বাজারের চিত্ত মাস্টার স্টোরের মালিক ও ইউনিয়নের ডিলার জয়দেব দেবনাথ বলেন, ‘কে কৃষক, কে দোকানি– তার পরিচয় তো আমরা রাখি না। সার নিতে আসলে এক হাজার ৩৫০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি করি। এখন তারা দোকানে নিয়ে বিক্রি করলে আমরা কী করব?’
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের বাউফল উপজেলা শাখার সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, ডিলাররা সরকারি দামেই সার বিক্রি করেন। গ্রামগঞ্জের কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে পারেন। সে বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে আমন ধান চাষের জন্য ৩৪ হাজার ৮০০ হেক্টর ও আউশ ধানের জন্য দুই হাজার ৮০৬ হেক্টর জমি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে ১৫ ডিলারের জন্য ইউরিয়া বরাদ্দ ছিল ২৯৫ টন। আগস্ট মাসে ৭৭০ টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ হয়েছে।
এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাননি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাহরিয়ার রিজভী লিমন। তিনি বলেন, কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।
বাংলাদেশ সময়: ০:১৫:৫০ ৬ বার পঠিত | ● দোকান ● বাউফল ● সার