![]()
কুড়িগ্রাম: কাজ সম্পন্ন না করেই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রকল্পের এক কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভার বিরুদ্ধে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে পৌরসভার উন্নয়নে এডিবি এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ অর্থে ছয়টি প্যাকেজের আওতায় ১৪টি প্রকল্প গ্রহণ করে পৌরসভা। অভিযোগ রয়েছে, কাজ সম্পন্ন না করেই ব্যয় দেখিয়ে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকল্পগুলোর সমুদয় অর্থ উত্তোলন করা হয়।
প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ, প্যালাসাইডিং ওয়াল নির্মাণ এবং পৌর ভবন সংস্কারসংক্রান্ত। সম্প্রতি দুটি সিসি রাস্তা ও পৌর ভবনের কাজ শেষ করা হলেও বাকি প্রকল্পগুলোর কাজ শুরুই হয়নি। এসব কাজ আদৌ সম্পন্ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। প্রকল্পের আওতায় থাকা রাস্তাগুলোর কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
চোকদার পাড়ার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী মো. আফছারী আলী (৬৫) বলেন, “রাস্তাটা কাঁচা ছিল, তাই ভালো ছিল। রাস্তার মাঝখানে ড্রেন করা হয়েছে, দুই পাশে দুই-তিন ফুট গর্ত। পুরো রাস্তাটি সিসি করার কথা ছিল। কিন্তু ড্রেন করে চলে গেছে। এখন আর রাস্তা করার নাম নেই। আগে গাড়ি, রিকশা, ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি—সবই চলত। এখন পায়ে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের চলাচল তো আরও কঠিন। সুস্থ মানুষের চলাফেরাও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। এ কেমন পৌরসভা, বুঝি না। শুনেছি, ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে, টাকাও উত্তোলন করা হয়েছে।”
চোকদার পাড়ার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম রকি বলেন, আগে রাস্তাটি পিচঢালা ছিল। সিসি রাস্তা নির্মাণের জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ছয় মাস আগে রাস্তার মাঝ বরাবর সাড়ে তিন ফুট প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণ করেছে। দুই পাশের গর্ত ভরাট করে পৌরসভার সিসি রাস্তা নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু কেন রাস্তার কাজ হচ্ছে না, তা তিনি জানেন না। এতে তাঁদের চলাচলে ব্যাপক অসুবিধা হচ্ছে এবং যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে মসজিদের মুসল্লিদের ভোগান্তি হচ্ছে। তিনি দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণের দাবি জানান।
উলিপুর পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে এডিবি পৌরসভার উন্নয়নে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। ছয়টি প্যাকেজে ১৪টি প্রকল্প গ্রহণ করে ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রের মাধ্যমে কাজের দায়িত্ব পান মো. আব্দুল হাই সরকার (এম/এস এ, এম ট্রেডার্স), মো. শফিকুল আলম (এম/এস নুর ট্রেডার্স), মো. হাসান ও বাদল কনজুমার প্রডাক্ট।
এডিবির নিয়ম অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে কাজ শেষ করে অর্থ উত্তোলন করতে হবে। কাজ করতে না পারলে বরাদ্দের অর্থ ফেরত যাওয়ার কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, কাজ সম্পন্ন না করেই ওই তারিখে ব্যয় দেখিয়ে সমুদয় অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে, যা আর্থিক নিয়মের গুরুতর লঙ্ঘন।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে উলিপুর পৌরসভার ভবন মেরামত ও আসবাবপত্র সরবরাহ; উলিপুর সদর মৌজায় পৌর সুপার মার্কেটের সামনে থেকে সালামের দোকান পর্যন্ত সিসি রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ; জোনাইডাঙ্গা মৌজায় পূর্ব বাজার রেলক্রসিং থেকে আজমের মোড় পর্যন্ত সিসি ভি-ড্রেন নির্মাণ; উলিপুর সদর মৌজায় লাভলুর বাড়ি থেকে সুরুজ্জামান মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসি করা; নুর মোহাম্মদের বাড়ি থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত পিভিসি পাইপের ড্রেন নির্মাণ; উলিপুর-রাজারহাটগামী সড়কে মাতৃমঙ্গল থেকে নির্বাচন অফিস পর্যন্ত রাস্তা সিসি করা; ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রামদাস ধনিরাম মৌজায় খেয়ারপাড়ে মামুনের বাড়ি থেকে ছোলেমানের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসি করা; এবং উলিপুর সদর মৌজার চোকদার পাড়া শাহী মসজিদ থেকে আব্দুর রহিমের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সিসি করা।
এ ছাড়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নারিকেলবাড়ী মৌজায় আব্দুর রউফের বাড়ি থেকে চাঁদ উল্ল্যা হাজীর কবরস্থান পর্যন্ত দুলু মিয়ার পুকুরে, ২ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব নাওডাঙ্গা মৌজায় রাজারহাট সড়কের মহেশের দোকানের মোড় থেকে মকবুলের বাড়ি পর্যন্ত জমিদারের পুকুরে, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হায়াৎ খাঁ মৌজায় রনির বাড়ি থেকে মতিয়ারের বাড়ি পর্যন্ত রনির পুকুরে এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রামদাস ধনিরাম বলদিপাড়া জামে মসজিদের সামনে থেকে ফয়জারের বাড়ি পর্যন্ত আব্দুল মান্নানের পুকুরে ইটের প্যালাসাইডিং নির্মাণের প্রকল্প রয়েছে। মঞ্জুর পুকুরপাড়, আব্দুল মান্নানের পুকুর এবং জোনাইডাঙ্গার ৭১ গণকবর স্মৃতিস্তম্ভের পুকুরে ইটের প্যালাসাইডিং নির্মাণের পাশাপাশি রামদাস ধনিরাম মৌজায় মঞ্জুর বাড়ি থেকে দুদু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা আরসিসি করার প্রকল্পও রয়েছে।
পৌরসভার একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, প্রতি বছর এডিবির বরাদ্দের আওতায় প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করে গড়িমসি করা হয়। পরে ৩০ জুনের মধ্যে অর্থ উত্তোলন করে প্রকল্পগুলোতে নয়ছয় কাজ দেখিয়ে অর্থ লোপাট করা হয় বলে সূত্রটির দাবি। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত আগস্ট মাসে মাতৃমঙ্গল থেকে নির্বাচন অফিস পর্যন্ত এবং সুপার মার্কেটের সামনে থেকে সালামের দোকান পর্যন্ত সিসি রাস্তার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নুর মোহাম্মদের বাড়ি থেকে পিভিসি পাইপের ড্রেন নির্মাণের কাজও শেষ হয়েছে। পৌর ভবন সংস্কারের কাজ চলছে। তবে বাকি প্রকল্পগুলোর কোনো কাজ করা হয়নি। দুটি ড্রেন নির্মাণের প্রকল্প দেখানো হলেও সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদার মো. হাসান বলেন, ইটের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি কাজ করতে পারেননি। এখন ইটও পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন ইট তৈরি হলে কাজ করা হবে। পৌরসভা বিল দেখিয়ে টাকা তুলে রেখেছে বলেও তিনি জানান।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুব আলম বলেন, বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাজগুলো করা সম্ভব হয়নি। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। অর্থ ট্রেজারি থেকে পৌরসভার হিসাবে রাখা হয়েছে। কাজ না করে কীভাবে টাকা তোলা যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যয় দেখিয়ে টাকা তোলা হয়েছে এবং এখন কাজ করা হবে। তবে এটি আর্থিক অনিয়ম কি না, সে প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।
পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম আরিফ বলেন, কাজ না করায় ইতিমধ্যে ঠিকাদারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ না করলে ১০ শতাংশ টাকা কেটে নিয়ে কাজ বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হবে। কাজ না করে অর্থ উত্তোলন করা আর্থিক অনিয়ম কি না, জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।
বাংলাদেশ সময়: ২২:৩৬:৫৫ ১২ বার পঠিত | ● উলিপুর পৌরসভা ● এডিবি প্রকল্প ● কুড়িগ্রাম ● পৌর উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম