![]()
ঢাকা: মানিকগঞ্জে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি জুলহাস আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিমান তৈরি করে আকাশে উড়লো আজ। জীবনে নিজে কখনো বিমানে না চড়লেও জুলহাস মোল্লা নামের একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি আলট্রা লাইট (আরসি) মডেলের একটি বিমান তৈরি করে চমক দেখালেন। যুবক জুলহাসের বাসানো বিমানের সফল বিমান উড্ডয়নের এক মহরত হয়ে গেল তার নিজ এলাকা তেওতা জাফরগঞ্জের যমুনা নদীর চরে।
সাংসারিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েন উপেক্ষা করে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে স্বপ্নবাজ জুলহাসের টানা চার বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়া আরসি বিমানটি নীল আকাশে উড্ডয়নের দৃশ্যটি দেখতে যমুনার পারে হাজারও মানুষের উপচেপড়া ভিড় পড়ে যায় মঙ্গলবার সকাল থেকে।
সেই সঙ্গে জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রশাসনের স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বিমান উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করতে যমুনার চরে জড়ো হন।
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার ষাইটঘর তেওতা এলাকার কলিল মোল্লার ছেলে জুলহাস মোল্লার এই অবিশ্বাস্য সফলতায় গোটা এলাকা যেন উৎসবের আমেজ পরিলক্ষিত হয়। যমুনার চরে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লার উপস্থিতিতে সফল এ উড্ডয়ন সম্পন্ন হয়।
এ সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জুলহাস মোল্লাকে অনুপ্রেরণা জোগাতে ৩০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা প্রদানসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে কানেক্ট করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। তার উদ্যোগটি একটি ইউনিক উদ্যোগ বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
নিজের হাতে তৈরি আরসি বিমানের নিজস্ব একটি নাম দিয়েছেন জুলহাস। তার বানানো বিমানের নাম স্কাই বাইক জে-৩। চীনের সেনাবাহিনী সদস্যরা এ ধরনের বিমান ব্যবহার করেন বলে তিনি জানান।
জুলহাস আরো জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তাকে যদি সহায়তা প্রদান করেন তাহলে তিনি বিমান তৈরি গবেষণা কাজে মনোযোগ দিয়ে ভালো কিছু করার আশা রাখেন।
তিনি জানান, চার বছর আগে ককশিট দিয়ে রিমোট কন্ট্রোল বিমান বানানোর পর থেকে তিনি নিজে চড়ে বসার বিমান তৈরির কাজে মনোযোগ দিয়ে কাজ শুরু করেন।
তিনি বলেন, উন্নত দেশের মানুষ অফিস করেন বিমান নিয়ে সেখানে আমাদের দেশে বিমান মানে স্বপ্নকে ভাবে। মাত্র দেড় লাখ টাকা খরচ পড়েছে এই বিমানটি তৈরি করতে। ট্রলির চাকাকে মোডিফাই করে তিনি তার বিমানের পেছনের চাকা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর সামনের চাকাটি বাচ্চাদের বাইসাইকেলের চাকা দিয়ে বানানো হয়েছে। বিমান তৈরির নাটবল্টু থেকে প্রতিটি সামগ্রী দেশীয় সামগ্রী ব্যবহার করেছেন। কোনো বিদেশি কিছু ব্যবহার করা হয়নি তার বিমানে।
তিনি নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম ভাগ্যবান ব্যক্তি হিসেবে দাবি করে বলেন, কোনো ব্যক্তি যিনি নিজের তৈরি বিমান নিজে সফলভাবে উড্ডয়ন করতে পেরেছে।
গত বছর যমুনার চরে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন তিনি। আংশিক সফলতা তাকে আরও উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগায়। প্রথম দফায় মাত্র ৭-৮ মিনিট উড্ডয়ন সময়কাল ছিল। এক বছরের মাথায় সোমবার আবারো উড্ডয়নের উদ্যোগ নিলে তাতেই মিলে সফলতা। ৫০ ফুট ওপরে উড়তে সক্ষম হয় জুলহাসের বানানো বিমানটি।
জেলার দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া এলাকায় বাড়ি হলেও যমুনা নদী ভাঙনের কারণে বর্তমানে শিবালয় উপজেলার ষাইটগর তেওতায় পরিবারসহ তিনি বসবাস করছেন। জুলহাস এক সন্তানের জনক। ছয় ভাই, দুই বোনের মধ্যে জুলহাস ৫ম। জিয়নপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাশ করেন ২৮ বছরের এই যুবক। অর্থাভাবে লেখা পড়ালেখা চালিয়ে যেতে না পারলেও তার অদম্য ইচ্ছে শক্তির কারণে তৈরি করেন বিমান। তিনি ঢাকায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করেন। এক সন্তানের জনক জুলহাসের স্ত্রী দ্বিতীয় সন্তানসম্ভাবা। অনাগত সন্তানকে এই বিমান উৎসর্গ করেন।
তার বাবা কলিল মোল্লা বলেন, জুলহাস ছোটবেলায় থেকে প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী কাটাকাটি করে কিছু বানাতে চাইত। জিজ্ঞেস করলে বলত, একদিন দেখবে আমি কি বানাইছি! সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে দেখবে। গত চার বছরের চেষ্টায় তিনি বিমান তৈরির কারিগর বনে যান।
স্থানীয় চেয়ারম্যান মো. মোশারফ হোসেন জানালেন তার গ্রামের ছেলে জুলহাস একদিন বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি তারই প্রমাণ করে।
জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, জুলহাসের গবেষণা কাজে সরকার সহযোগিতা করবে। প্রাথমিকভাবে কিছু আর্থিক সহযোগিতা করে তাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে প্রতিভাসম্পন্ন জুলহাসের একটি যোগসূত্র স্থাপনে সহায়তা করার কথা জানান।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৮:৫১:১৭ ১০৩ বার পঠিত | ● ঢাকা জেলা ● মানিকগঞ্জ ● সিংগাইর