ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
প্রচ্ছদ » চট্রগ্রাম » বিলুপ্তির পথে নাসির নগরে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প

বিলুপ্তির পথে নাসির নগরে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প


খ.ম.জায়েদ হোসেন,নাসির নগর,(ব্রাহ্মণ বাড়ীয়া)
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫


বিলুপ্তির পথে নাসির নগরে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: একটা সময় ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নাসির নগর উপজেলায় মাটির জিনিস পত্রের বেশ প্রচলন বা জনপ্রিয়তা ছিল। তবে আধুনিক শিল্পের ছোঁয়ায় নাসির নগর উপজেলা মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প ধীরে ধীরে স্মৃতির খাতায় নাম লিখতে শুরু করেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগর উপজেলায় এককালে মৃৎশিল্পের বেশ সুনাম ছিল। কালের বিবর্তনে নানা প্রতিকূলতার পাশাপাশি প্লাস্টিক, মেলামাইন, অ্যালুমিনিয়াম আর স্টিলের সামগ্রী ব্যবহার বাড়ার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প।

নাসির নগর উপজেলার শ্রীঘর,বুড়িশ্বর,ভোলাউক,সিংহগ্রাম, আলাকপুর,ফান্দাউক, হরিপুর ছিল মৃৎশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এসব গ্রামের মৃৎশিল্পীরা সুনিপুণভাবে তৈরি করতেন হাঁড়ি, পাতিল, বাসন, নানা ধরনের খেলনা সামগ্রী, কলসসহ বিভিন্ন ধরনের তৈজষপত্র। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নান্দনিক এসব তৈজসপত্র এখন আর খুব বেশি চোখে পড়ে না। দিন দিন এসব তৈজসপত্রের চাহিদা কমছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে নাসির নগরের বহু মৃৎশিল্পীর জীবন-জীবিকায়। একটা সময়ে নানা ধরনের তৈজসপত্র নির্মাণে যেসব মৃৎশিল্পী ব্যস্ত সময় পার করেছেন তারা এখন প্রায় বেকার। মৃৎশিল্প জৌলুস হারানোর কারণে তাদের আয়-উপার্জনে ভাটা পড়েছে। আর্থিক অভাব-অনটন এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

একদিকে বেড়ে গেছে বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র তৈরির জন্য ব্যবহৃত মাটি ও জ্বালানির দাম। অন্যদিকে কমেছে মৃৎশিল্পীদের তৈরি পণ্যের চাহিদা। এসব কারণে বাপ-দাদার পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকেই। নানা ধরনের প্রতিকূলতা চোখের সামনে দেখে তারা রীতিমতো শঙ্কিত। নতুন করে কেউ আর ঐতিহ্যবাহী এই পেশায় নিজেকে জড়াতে চাইছেন না। মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা দাবি করছেন তারা। তাদের মতে, সরকারি সহায়তা পেলেই কেবল টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্পকে। অন্যথায় কালের বিবর্তনে চিরতরে হারিয়ে যাবে গ্রাম-বাংলার এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো জানতেও পারবে না গৌরবময় গ্রামীণ এই ঐতিহ্যের কথা।

এদিকে পেশাগত প্রয়োজনে ব্যাংক থেকেও ঋণ পাচ্ছেন না মৃৎশিল্পীরা। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন তাদের চোখে-মুখে। স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা মনে করেন, নাসির নগরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পকে বাঁচানোর জন্য সরকারের বহুমুখী উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা খুবই জরুরি।

কথা হয়, বুড়িশ্বর ইউনিয়নের বুড়িশ্বর গ্রামের শংকর কুমার পালের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের নাসির নগরের অনেকগুলো গ্রামে মৃৎশিল্পের রমরমা অবস্থা ছিল এক সময়ে। কিন্তু বর্তমানে যারা এই পেশার সঙ্গে জড়িত তারা খুবই হতদরিদ্র। মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িতরা সরকারি কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা কোনো দিন পেয়েছেন কি না আমি জানি না। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। মৃৎশিল্পীদের শিল্প জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যদি আধুনিক রূপ দেওয়া যায় তা হলেই কেবল গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনা নাছরিন বলেন, ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ সরকার সবসময় সচেষ্ট। মৃৎশিল্পীদের দুঃখ দুর্দশার কথা উর্ধতন কতৃপক্ষকে অবগত করে কোন ব্যবস্থা করা যায় কি না দেখবো।

মৃৎশিল্পীদের অনেকেই এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। একদিকে বয়স বাড়ায় কাজ করতে পারছেন না, অন্যদিকে পরিবারের কেউ এই পেশায় এগিয়ে আসছে না। কোনো রকম বয়স্ক ভাতাও পাচ্ছেন না। সবমিলিয়ে জীবন সায়াহ্নে এসে নিদারুণ অর্থকষ্টে কাটাতে হচ্ছে প্রতিটি দিন। আবার কেউ কেউ আর কোনো কাজ না জানায় বাধ্য হয়েই আঁকড়ে ধরে আছেন বাপ-দাদার কাছ থেকে শেখা এই পেশা।

কথা হয়, হরিপুর গ্রামের প্রবীণ মৃৎশিল্পী হরিদাস পালের সঙ্গে। তিনি বলেন, মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাপ-দাদার এই পেশায় জড়াই। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক পেশাতেই আছি। বর্তমানে কেউ নতুন করে এই পেশায় আর আসছে না। এই পেশায় পরিশ্রম অনেক বেশি। পরিশ্রমের তুলনায় আয়-রোজগার কম।

প্লাস্টিক, মেলামাইন, স্টিল আর অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ভিড়ে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা এখন তলানিতে ঠেকেছে।
দীর্ঘদিন অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়াসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। তাই ইদানীং স্বাস্থ্যবিদরা মাটির তৈরি তৈজসপত্র ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত সুফলের প্রতি গুরুত্বারোপ করছেন।

আফ/আর

বাংলাদেশ সময়: ২০:৪২:২৬   ৪৩৭ বার পঠিত  |