![]()
নোয়াখালী: হাতিয়ায় মেঘনার কোল ঘেঁসে তমরদ্দি ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে বিচ্ছিন্ন চর চর আতাউরে জেগে উঠেছে বিশাল বিশাল চর। চারদিকে মহিষ গরুর নির্ভার বিচরণ, আর মাঝেমধ্যে ভেড়ার পাল। এ যেন প্রকৃতির বুকে গড়ে ওঠা এক অনন্য জীববৈচিত্র্যের রাজ্য। বহু প্রজন্ম ধরে এসব চরে বাতানরা লালন-পালন করে আসছেন তাদের গরু ও মহিষ।
কিন্তু সম্প্রতি সেই শান্ত-নির্জন চরে নেমে এসেছে দখলের ঝড়। সরকার পরিবর্তনের পর প্রভাবশালী একটি মহল সারিবদ্ধ মাটির স্তুপ তুলে দখলের চিহ্ন বসাচ্ছে। আর বাতানদের ঘরবাড়ি ঘিরে উচ্ছেদের চাপ বাড়ছে। অনেককে ইতিমধ্যে গরু মহিষ নিয়ে অন্যত্র সরে যাওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন দেখেও যেন নির্বিকার।
দখলের এমন দৃশ্য নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার বিচ্ছিন্ন চর আতাউর ভাইস্যা চর ও জাগলার চরে। উপজেলার তমরদ্দি ও চরকিং ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে এই চর গুলোর অবস্থান। চরগুলি বনবিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দ্বীপের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সীমিত জনবল নিয়ে দখল ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে বনবিভাগ। ইতোমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোস্টগার্ডের কাছে লিখিতভাবে চাওয়া হয়েছে সহযোগিতা।
সরেজমিনে চর আতাউরে গিয়ে দেখা যায়, চরের উত্তর পাশ থেকে সারিবদ্ধভাবে মাটির স্তুপ তৈরি করে রাখা হয়েছে। প্রতিটি স্তুপে একটি করে গাছের ডাল মাটিতে পুতে দেওয়া আছে। টাকার বিনিময়ে প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে এসব জায়গা পরিমাপ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাতানদের ঘরের চার পাশেও রাখা হয়েছে এই স্তুপ। কয়েকটি জায়গায় বাঁশ দিয়ে তৈরি হয়েছে বেড়া।
স্থানীয়রা জানান, চরের উত্তর পাশে ও মাঝামাঝি দুটি জায়গায় বাতানেরা অস্থায়ী ভাবে বসবাস করে। একেবারে দক্ষিণে একটি আশ্রায়ন ও দুটি গুচ্ছগ্রামে ৪ শত পরিবার বসবাস করে। আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রনে কোন প্রশাসন এখানে থাকে না। নদী পার হয়ে হাতিয়ার মূলভূখন্ড থেকে এসে আইন শৃঙ্খলা দেখবাল করতে হয়। বনবিভাগ বিশাল এই চরে পুরতান কেউড়া বাগানের রক্ষনাবেক্ষণ করলেও পাশাপাশি নতুন জেগে উঠা চরে কেউড়ার বীজ বপন করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে দখলকারীরা স্তুপ তৈরি করে দখল করে নিয়েছে বনবিভাগের এই বিশাল এলাকা। দ্রুত এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
বাতানদের মাটির কিল্লার উপর কথা হয় মহিষের বাতান আবু সোলাইমানের সাথে।
তিনি জানান, গত বর্ষা মৌসুম থেকে এই চরে দখলের কর্মকান্ড চলে আসছে। বর্ষায় হঠাৎ তাদের ঘরের চারপাশ দখল করে জমি চাষ শুরু হয়। বাধা দিলে নেমে আসে নির্যাতন। কিছু বুঝে উঠার আগে ঘরে এসে করা হয় হামলা। প্রশাসনকে জানিয়ে কোন সহযোগিতা পায়নি তারা। এতে তাদের বাসায় থাকা প্রায় সহস্রাধিক মহিষ গরুর খাদ্য সংকট দেখা দেয়। চারদিগে জমি চাষ হয়ে যাওয়ায় ঘরে আটকা পড়ে এসব গরু মহিষ। পরে উপায় না পেয়ে দখলদারদের সাথে সমঝোতায় যেতে হয়। তাদেরকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে মহিষ গরু পালনের অনুমতি নিতে হয়েছে। দখলদারদের পক্ষে চরকিং ইউনিয়নের এক ইউপি সদস্য আর মহিষের মালিকরা বসে এই সমযোতা করেন।
আবু সোলাইমান আরো জানান, এই বছর বর্ষার আগে এসব জমি দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত কয়েকদিন থেকে চরবগুলা থেকে লোকজন এসে এসব জায়গা পরিমাপ করে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এই চরটি এখনো বনবিভাগের। সরকারি এসব জায়গা দিনে দুপুরে দখল হলেও প্রশাসনের কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। পর্যায়ক্রমে দখলকারীরা চরের উত্তর পাশ থেকে দক্ষিন দিকে চলে যাচ্ছে।
চরে বসবাস করা বাতানেরা জানান, চর দখলের এই কাজে সরসরি জড়িতদের বাড়ি পাশবর্তী চরকিং ইউনিয়নের চরবগুলা ও শুল্লুকিয়া গ্রামে। এদের মধ্যে সরাসরি চরে উপস্থিত হয়ে জমি মেপে দেওয়ার সাথে জড়িত মাদু, শাহজাহান, জলিল, দুলাল, ফিরোজ ও ইরাক মাঝি। দুটি চরই এদের পাশবর্তী হওয়ায় এরা দিনভর চরে থাকে রাতে বাড়ীতে চলে যায়। রাজনৈতিক ভাবে এরা এক সময় আওয়ামীলীগ করলেও এখন স্থানীয় বিএনপি নেতা সাবেক ইউপি সদস্য মনির উদ্দিনের লোক হিসাবে কাজ করেন। চরে মনির মেম্বারকে কখনো দেখা যায়নি। তবে তিনি তীরে বসে এসব দখল নিয়ন্ত্রন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বিষয়ে চরকিং ইউনিয়ন বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত হওয়া কমিটির সভাপতি ফখরুল ইসলাম বলেন, চর দখলের বিষয়টি আমি শুনেছি। খবর পেয়েছি এর সাথে মনির মেম্বার সহ কয়েকজন জড়িত আছেন। মনির মেম্বার বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও কোন পদ পদবিতে নাই। আমি মনির মেম্বারের সাথে কথা বলার পর তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মনির মেম্বার বলেন, আমি হাতিয়ার বাহিরে অনেক দিন। চরদখলের সাথে আমার সম্পৃক্ততা নেই। যারা দখল করছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নেক। আমার নাম ব্যবহার করে কেউ এই কাজ করলে তার দায়ভার তো আমি না। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
নিজাম উদ্দিন বাতান জানান, গত ১০ বছর ধরে এই চরে মহিষ পালন করে আসছেন। কেউ কখনো চর দখলের চেষ্টা করেন নি। সরকার বদলের পর থেকে বিভিন্ন গ্রুপ এসে চর দখল করছে। চরকিং চরবগুলা ও হাতিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন এসে এই চর দখল করছে। এই ভাবে চলতে থাকলে এক সময় চরের থাকা কেউড়া বন উজাড় হয়ে যাবে।
মহিষের মালিক নুরুল ইসলাম ও রাশেদ জানান, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই চরে মহিষ ও গরু পালন করে আসছেন। ইতিমধ্যে মাটির কিল্লা পুকুর তৈরি করে নিয়েছেন। তাতে অস্বাভাবিক জোয়ারে গরু মহিষ আশ্রয় নেয়। কিন্তু হঠাৎ করে একটি পক্ষ তাদেরকে এই চর থেকে চলে যেতে বলছেন। বাতানদের বিভিন্ন সময় মারপিট করছেন। প্রশাসনকে জানিয়েও কোন সুফল পায়নি বলে জানান তিনি। সরকারি ভাবে এই চরটিকে মহিষের চারণভূমি ঘোষনার দাবি জানান তিনি।
চর এলাকায় বনবিভাগের জায়গা দখলের বিষয়ে নলচিরা রেঞ্জের কর্মকর্তা আল আমিন গাজি জানান, একটি গ্রুপ বেশ কিছু দিন আগ থেকে চরের জায়গা দখলের চেষ্টা করে আসছে। ইতিমধ্যে চারজনকে আটক করে মামলা দেওয়া হয়েছে। তবে নদী বেস্টিত এলাকা হওয়ায় সব সময় অভিযান দেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া সীমিত সংখ্যক জনবল নিয়ে অভিযান সফল হয় না। তবে এই বিষয়ে সহযোগিতার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কোষ্টগার্ড কমান্ডারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আলউদ্দিন বলেন, চর দখলের বিষয়টি মহিষের মালিকরা জানিয়েছে। এছাড়া বনবিভাগ থেকে ও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব চরের দখল মুক্ত করা হবে ।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৭:৩৭:৩০ ৩৬ বার পঠিত | ● চর দখল ● মহাউৎসব ● হাতিয়া