ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
প্রচ্ছদ » রংপুর » চরের মানুষের সুখ দুঃখ তিস্তার চরের ভাঙ্গা গড়ায় কপাল ভাঙ্গে চরবাসির

চরের মানুষের সুখ দুঃখ তিস্তার চরের ভাঙ্গা গড়ায় কপাল ভাঙ্গে চরবাসির


মোন্নাফ আলী,উলিপুর (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬


তিস্তার চরের ভাঙ্গা গড়ায় কপাল ভাঙ্গে চরবাসির

কুড়িগ্রাম: পাগলা তিস্তার ভাঙ্গনে এ চর ভাঙ্গে ও চর গড়ে। নদীর ভাঙ্গা গড়ায় আমগো জীবন ও ভাঙ্গে। চরের বালুর দাম আছে মোগোরে (আমার)দাম নাই। গতবার চর গোড়াই পিয়ারে ১২ একর জমিতে আলু, পিয়াজ, বাদাম ও সরিষা করে ৩/৪ লাখ টাকার বিক্রি করেছি। এ বার সেই জমিতে নদী। ভাঙ্গে চর,ভাঙ্গিল মোর জমি, বাড়ীঘর। ভাঙ্গল মোর কপাল। মোর জমিতে ২০ জনকে আশ্রয় দিছিলাম এবার মোর আশ্রয় নাই,অন্যের জমিতে রইছি। শত শত মজুরী খাটাইছি,অহন নিজে মানুষের জমিতে কিষান দিচ্ছি। কিবা করি পরিবার নিয়া বাছুম আল্লাই জানে। নদীর দিকে তাকিয়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ভাঙ্গা গড়ার গল্প গুলো বলছিলেনন চর গোড়াই পিয়ারের বাসিন্দা আব্দুল কাদের (৬০)।

উমর আলী(৭৫)বলেন, জোয়ান সেতরা চরে তার ১২ একর জমি ছিল। গতবার আলু,পিয়াজ ও আমন ধান করে অনেক টাকার ফসল বিক্রি করেছেন। এবার তার সব জমি ও বাড়ী নদীতে গেছে। এখন অন্যের জমিতে বাড়ী করে আছেন। তার অভিযোগ,কাইম ভাঙ্গলে সরকার ভাঙ্গন রোধ করে নদী চরের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্ত চর ভাঙ্গলে কোন ব্যবস্থা নেয় না। তার দুঃখ আমরা কি মানুষ না। চরের মানুষ ইলিপ চায় না। সাহার্য্য চায় না। শত শত মানুষকে কর্ম দেয়।

চর কিশোরপুর বাসিন্দা মরিচা বেগম(৪০)বলেন, চরে তার ৫ একর জমি ছিল। গতবার আলু, বাদাম ও ধান চাষ করে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিক্রি করেন। এবার বাড়ী ভিটা ও সম্পুর্ন জমি নদীতে ভাঙ্গি গেইছে। কাইমোত জমি ভাড়া নিয়া বাড়ী করি ৩ ছেলে মেয়ে নিয়া আছি। স্বামী রফিকুল ইসলাম এলাকাত মজুরী করতে লজ্জা লাগে বলে ঢাকায় ভ্যান চালাচ্ছেন। এখন আমরা ভুমিহীন নিঃস্ব। তিনি জানান, নদী হামাক একবার ডোবায়, একবার ভাসায়। তবু হামরা চর ছাড়ি না। চরে কাজ থাকে,কাউমের মানুষ চরোত কাজ করবার আইসে। এমন দুঃখের কাহিনী শোনালেন,দড়ি কিশোরপুর চরের মহুবর রহমান(৭০),বুলবুলি বেগম(৩৪) ও মিনারা বেগম (৩০)সহ আরো অনেকে।
চর ভাঙ্গা গড়ার উল্টে গল্প শুনালেন,দড়ি কিশোরপুর চরের বাসিন্দা মো. রুহুল আমিন(৬৫) ৯৩ সাল থেকে তার বাড়ী ও ২২ একর জমি ৩ বার ভাঙ্গে ২ বার ভাসে। এবার তার সম্পুর্ন জমিতে চর পড়েছে। স্বপ্ন বুনোছেন পলি পড়া মাটিতে। আবাদ করেছেন আলু পিয়াজ, রসুন, বোরো ধান ও এখন বাদাম চাষের প্রস্তুতি চলছে। অবসান হয়েছে তার দীর্ঘ দিনের কষ্টের। তার চোখে মুখে সুখের হাসি যেন উকি দিচ্ছে। জমি ভাসায় সুখের হাসি ফুটেছে, গোড়াই পিয়ার চরের আব্দুস সামাদ(৭১), নজরুল ইসলাম(৬৫)ও রাবেয়া বেগম(৩৬)র মুখে।

এ চর ভাঙ্গে,ও চর গড়ে এই তো নদীর খেলা। প্রবাদটি তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনের বাস্তবতা। চর ভেঙ্গে যায় মানুষের কপাল ভাঙ্গে। আবার নুতন চর জাগে, মানুষের স্বপ্নও জাগে। এমন ভাঙ্গা গড়ায় স্বপ্ন বুনেন তিস্তার চরের কপাল পোড়া মানুষ গুলো। কাইম ভাঙ্গলেই ভাঙ্গনরোধে নদীকে ঠেলে দেওয়া হয় চরের দিকে। চর ভাঙ্গলে কর্তৃপক্ষের কোন নজর নাই। এটাই চর বাসির বড় দুঃখ। অথচ চর গুলো কৃষি ফসল উৎপাদনে বিশাল ভুমিকা রাখলেও চর রক্ষায় সরকারী কোন পদক্ষোপ নাই।

পয়সার লোভ দেখিয়ে চরের মানুষের স্বপ্ন কেড়ে নেয় মধ্যশর্ত ভোগি একটি চক্র। তাদের জমি গুলো ১৫০ থেকে ২০০ টাকা শতক পানির দামে ভাড়া নিয়ে ’বিএডিসির আলু বীজ উৎপাদন খামার নামে”বানিজ্যিক ভাবে শত শত একর জমিতে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য উন্নত জাতের ’সান সাইন ও কুইন এনি’ আলুর চাষ করেছে। দড়িকিশোরপুর ব্লক এর মালিক মো. আরাফুল আলম বলেন, কৃষকরা আর্থিক সংকটের কারনে আলুর চাষ করতে পারে না তাদের জমি ভাড়া নিয়ে আলুর চাষ করেছি।

চরের দায়িত্ব প্রাপ্ত,উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল বলেন,চরের কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়। বন্যা চরের কৃষকের জন্য আর্শিবাদ হলেও নদীর বিচিত্র ভাঙ্গনে কৃষকদের ভাগ্য বদলায় না। গত বর্ষায় নদী ভাঙ্গনে চর গোড়াই পিয়ার, চর দড়িকিশোরপুর, জোয়ান সেতরা চরের প্রায় ২০০ হেক্টর জমি ফসলসহ ভেঙ্গে গেছে। রামনিয়াসা, ইঁদুর মারা, খারিজা নাট শালা চর গোড়াই পিয়ার, দক্ষিন চর কিশোরপুর, জোয়ান সেতরা ও গোড়াই পিয়ার চর গুলোতে সোনা ফলছে।তিস্তার এ সমস্ত চরে শীত মৌসুমে কয়েক কোটি টাকার রবি ফসল উৎপাদন হয়। কৃষির উন্নয়নে চর গুলো রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসেন বলেন,নদী ভাঙ্গায় কৃষকদের সিমাহীন দুঃখ কষ্ট। কৃষি বিভাগ চরের কৃষকদের ফসল উৎপাদনে সহায়তা দিচ্ছে। কিন্ত নদী ভাঙ্গনে তাদের কিছু করার নাই। চরের রবি ফসল আলু, পিয়াজ, রসুন, বাদাম ও সুর্যমুখীসহ তৈল জাতীয় ফসল জাতীয় কৃষি অর্থনীতিতে প্রচুর প্রভাব রাখছে।

বিএডিসি কুড়িগ্রাম সিনিয়র সহকারী পরিচালক(বীজ) মো. মিজানুর রহমান বলেন,নিয়ম আছে কৃষকদের মাধ্যমে আলু বীজ উৎপাদন করা। কিন্ত এক সাথে এত কৃষক পাওয়া যায় না বলে ব্লক করে একজন আগ্রহী ব্যক্তি করছেন।
থেতরাই ইপি চেয়ারম্যান বলেন, তিস্তা মহা পরিকল্পনা বাস্থ বায়ন হলে তিস্তার ডান তীরের হাজার হাজার হেক্টর জমিতে কৃষিসহ গড়ে উঠবে মানুষের বাস ও শিল্প কারখানা। যেমনটি গড়ে উঠেছে আলী বাবা থিম পার্ক” সোলার প্যানেল” থেকে দেড় মেগাওয়ার্ড বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যাচ্ছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো.রাকিবুল হাসান বলেন,নদী নীতিমালায় চর রক্ষায় কোন ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান নাই। কাইম এলাকা ভাঙ্গলে অগ্রধিকারের

ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে ভবিষতে নদী শাসন করা হলে তখন চরের ব্যবস্থা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, বিষয়টি চরবাসিদের জন্য জীবন মরন সমস্যা। এ সমস্যা অনেক বড় সমস্যা আমি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখি কিছু করা যায় কি না।
এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ১৮:৫৫:৩০   ১১৬ বার পঠিত  |