![]()
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, শ্রমিকের অধিকার আদায়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে ডা. জামায়াতে ইসলামীর লড়াই চলবে।শুক্রবার আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশের প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন শফিকুর রহমান।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ শ্রমিক দিবসকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিভিন্ন দেশে শ্রমিক সমাবেশে সরকারি দল ও বিরোধী দল হাজির হয়, বক্তৃতা দেয়, বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেয়— এই দেবো, সেই দেবো বলে; কিন্তু ১৪০ বছরে যদি তাদের ওয়াদার দশ ভাগের এক ভাগও বাস্তবায়ন করত, তাহলে এতদিনে শ্রমিকদের আর কোনো দাবি-দাওয়অ অবশিষ্ট থাকত না।
ডা. শফিক বলেন, ৩৬৪ দিন ভুলে থাকি আর পহেলা মে এলে সবাই এই দাবিগুলো নিয়ে দরদি হয়ে মাঠে-ময়দানে নেমে পড়ি। আমাদের অবস্থাও তার ব্যতিক্রম কি না, আল্লাহ ভালো জানেন। সাধারণত দুনিয়ায় যদি প্রাপ্তবয়স্ক ও জনসংখ্যার হিসাব করা হয়, তাহলে প্রত্যেকটি সমাজেই অন্যান্য সকল পেশার চেয়ে শ্রমিকদের সংখ্যা হবে নিঃসন্দেহে বেশি। এ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন এবং মর্যাদাকে উপেক্ষা করে একটা সমাজ কখনো টেকসই হতে পারে না। সত্যিকারের উন্নয়ন আসতে পারে না।
দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে যারা নিজেদেরকে বামপন্থী বলে দাবি করেন, তারা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বেশি সংগ্রাম করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তান, এরপর বাংলাদেশ— ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। নেতানেত্রীরা আন্দোলনের সামনে চলে আসে, মাঠ গরম হয়, মানুষ নিহত হয়, আহত হয়, কিছু মানুষের চাকরি যায়। নেতারা আড়ালে ভাগটা বুঝে নিয়ে যায়, তাদের ভাগ পেয়ে তারা সন্তুষ্ট হয়ে যায়। এভাবে যুগ যুগ ধরে নেতানেত্রীর ভাগ্য পরিবর্তন হলেও শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। তারা আবার শ্রেণিসংগ্রামের আওয়াজ তোলে। মালিকরা যদি না থাকে, শ্রমিকরা কাজ করবে কোথায়? আমরা ওই খতমের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাস করি, মালিক যদি শ্রমিকের ওপর ইনসাফ করে, শ্রমিকরা সমস্ত যোগ্যতা উজাড় করে মালিককে সহযোগিতা করবে, কাজ করবে।
প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা দাবি করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তরুণরা কাজ না পেয়ে সামান্য রুটি-রুজির আশায়, ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রের নৌকার ওপর চড়ে বসে। তারপর সমুদ্রের একটি ঢেউ এসে তাদেরকে সমুদ্রের পেটের মধ্যে হজম করে বসে। আর কেউ ভাগ্যবশত চলতে চলতে, ঘুরতে ঘুরতে কোনো রকমে কোনো একটি বন্দরে গিয়ে পৌঁছাতে পারে। সেখানে কারও জায়গা হয় জেলখানায়, কারও জায়গা হয় বন-জঙ্গলে। তারপর আস্তে আস্তে পথ খুঁজে নেয়। তারা দেশের মাটিতে প্রাসাদ করার চিন্তা করে না, জীবনের অর্জিত সম্পদ আপনজনদের জন্য দেশে পাঠিয়ে দেয়। আর যারা বৈধ পথে বিদেশ যায়, তারা সিন্ডিকেটের হাতে, দালালদের খপ্পরে পড়ে। প্রয়োজনের তুলনায় তিন গুণ, চার গুণ বেশি টাকা দালালদের দিয়ে যেতে হয়। যারা সেই টাকাটা শোধ করতে পারে না, তারা মানবেতর জীবন যাপন করে।
বিদেশে তাদেরকে দেখার সুযোগ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা সুখ ত্যাগ করে দেশে টাকা পাঠায়। আমরা খুব সুন্দর করে বলি ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’, কিন্তু এই যোদ্ধাদের আমরা মর্যাদা দেই না। তারা যখন পাসপোর্ট নবায়ন করতে যায়, তখনও দালালদের খপ্পরে পড়ে কষ্ট পায়। বছরের পর বছর যায়, মিশন আছে, হাইকমিশন আছে— সেখানকার কর্মকর্তাদের কাজ কী তাহলে? কাজ না করলে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
জামায়াত আমির বলেন, রাজনীতি হলো সংশোধনের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। সংসদে শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলেছি। আমরা ওখানে গালমন্দ করতে যাইনি, ইতিহাসের ছাত্র কিংবা মাস্টার হতে যাইনি। আমরা ওখানে গিয়েছি এ দেশের দুঃখী মানুষের পক্ষে কথা বলতে। যতদিন সংসদের ভেতরে থাকব, ততদিন যেন আপনাদের জন্য লড়াই করে যেতে পারি। আর বাইরের লড়াইও চলবে ইনশাআল্লাহ।
শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক লস্কর মো. তসলিমের সঞ্চালনায় সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন ফেডারেশনের সদ্যবিদায়ী সভাপতি আ ন ম শামছুল ইসলাম, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম খান এমপি, নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ সিবগা প্রমুখ।
জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেনসহ এতে আরও বক্তব্য রাখেন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুন খান, কবির আহমদ, মজিবুর রহমান ভূঁইয়া, সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসাইন, আব্দুস সালাম, মুহিব্বুল্লাহ, আখতারুজ্জামান, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নুরুল আমিন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ আজহারুল ইসলাম, ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদক সোহেল রানা মিঠু, প্রকাশনা সম্পাদক জামিল মাহমুদ, প্রচার সম্পাদক হাফিজুর রহমান প্রমুখ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আ ন ম শামছুল ইসলাম বলেন, শ্রমিক বাঁচলে মালিক বাঁচবে, শিল্পও বাঁচবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এসেও আজও শ্রমিকের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি। তার অন্যতম কারণ একশ্রেণির তথাকথিত নেতা, যারা বিভিন্ন ইস্যুতে শ্রমিকদের উসকিয়ে দিয়ে মালিক-ফ্যাক্টরির ক্ষতি সাধন করে। আবার রাতের আঁধারে মালিকের সঙ্গে সমঝোতার নামে নিজেদের পকেট ভারী করেছে।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশে সবাই ক্ষমতায় যাওয়ার আগে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলে, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তাদের কথা ভুলে যায়।
নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রতি ক্ষেত্রে শ্রমিক আজ অবহেলিত। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে শ্রমিক। সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছে শ্রমিকরা। কিন্তু তারা আবারও উপেক্ষিত হচ্ছে।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৯:৪৭:১৩ ৭২ বার পঠিত | ● শফিকুর রহমান