![]()
পটুয়াখালী:বাউফলে ঘরে ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্প বাস্তবায়নের পাঁচ বছর পারিয়ে গেলেও একদিনের জন্য সুপেয় পানি ব্যবহার করার সুযোগ হয়নি এলাকাবাসীর। অভিযোগ রয়েছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারি প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপ- সহকারি প্রকৌশলী ও নির্মাণ কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। নির্মাণ কাজ শেষে বিশুদ্ধ পানির বদলে লবন পানি ওঠার কারণে এলাকাবাসী ওই পানি একদিনের জন্যও ব্যবহার করতে পারেনি।
এ যোনো নোনা জলে ভেসে গেছে নিরাপদ পানির প্রকল্প। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণ ও সহজলভ্য করার জন্য প্রায় ৫ বছর আগে উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তবে নির্মাণ কাজে সিমাহীন অনিয়ম দুর্নীতির কারণে এ প্রকল্প মানুষের কোনো কাজেই আসেনি।
এ প্রকল্পের বিষয়ে জানতে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারি প্রকৌশলীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দায়িত্বরত কর্মকর্তা জানান, এই প্রকল্পের কোনো ফাইল অফিসে নেই। যে কারণে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারছেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৫ বছর আগে নিরাপদ পানির সংকট দূর করতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে কালাইয়া আদর্শ গ্রামে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর নলকূপ, সাবমারসিবল পাম্প, পানি সংরক্ষণে রাখার জন্য চারটি ওভারহেড ট্যাঙ্ক ও পানির পাইপ লাইন স্থাপণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৮০ লাখ টাকা। গভীর নলকূপ ও সাবমারসিবল পাম্প বসানো পর পরীক্ষা মূলক পানি উত্তোলন করলে দেখা যায় বিশুদ্ধ পানির পরিবর্তে লবনাক্ত পানি উঠে। এ অবস্থায় রেখেই উধাও হয়ে যায় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
নির্মাণের কাজের শুরু থেকে নির্মাণ কাজে নিম্মমানের নির্মাণ সামগ্রী সহ ব্যাপক অনিয়ম করেন সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ঠিকাদার। এলাকাবাসী একাধিক বার এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেও বিষয়টি আমলে নেয়নি উপজেলা জনস্বাস্থ্যের তৎকালিন উপ- সহকারি প্রকৌশলী মো. আলী আশরাফ।
এদিকে, এ প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্য স্থানীয়দের নিয়ে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগ। ওই কমিটিতের প্রধান করা হয় আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা মো. কবির হোসেনকে। তার নামেই বিদ্যুতের মিটার স্থাপণ করা হয়। পানির লাইন পরীক্ষা করার জন্য যে বিদ্যুৎ বিল আসে তা নিয়ে পরিশোধ নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করায় পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান কবিরের নামে মামলা করেন বিদ্যৎ বিভাগ। পরে স্থানীয় উপজেলা জনস্বাস্থ্য সহকারি প্রকৌশলীকে চাপ দিয়ে ঠিকাদার ও তৎকালীন উপ- সহকারি প্রকৌশলী মো. আশরাফ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে দেন।
স্থানীয়রা বলছেন, এ প্রকল্পে সীমাহীন দুর্নীতি অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রের টাকা অপচয় হয়েছে। এ প্রকল্পের অনিয়মের সাথে জড়িত প্রকল্প পরিচালক, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারি প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কালাইয়া আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেন জানান,‘ এ প্রকল্প আমাদের কোনো কাজে আসেনি। বিশুদ্ধ পানির বদলে লবন পানি উঠে। যেকারণে আমরা কেউ পানি ব্যবহার করিনি। পরে ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কেউ নিরাপদ পানি উত্তোলনের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করে এ বাসিন্দা বলেন, আমাকে না জানিয়ে আমাকে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান করে আমার নামে বিদ্যুতের মিটার স্থাপণ করা হয়। ঠিকাদার নির্মাণ কাজ চলাকালে সাবমারসিবল পাম্প পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে যে বিদ্যুৎ খচর করেন সেই বিদ্যুৎ বিলের টাকা পরিশোধ করেনি। পরে বকেয়া ৩৮ হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিলের জন্য আমার বিরুদ্ধে মামলা করে বিদ্যুৎ বিভাগ। পরে এলাকাবাসী মিলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর অফিসে গিয়ে চাপ প্রয়োগ করলে ঠিকাদার ও প্রকৌশলী মিলে বিল পরিশোধ করে এবং আামার নামের মামলা বিদ্যুৎ বিভাগ তুলে নেয়।
রোববার ( ৩মে) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আদর্শ গ্রামের মাঝামাঝি জায়গা সাবমারসিবল প্যাম্প বসানো। পাশে একটি পানির ট্যাংক এবং অফিস কক্ষ। অদূরে রয়েছে আরও তিনটি পানির ট্যাংক। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় জুড়ে রয়েছে মাটির নিচ থেকে পাইপ লাইন। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার কারণে মরিচিকা পড়ে সাবমারসিবল প্যাম্প সহ ট্যাংক ও পানির লাইন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কালাইয়া আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা মো. আনোয়ার হোসেন, দুলাল ও মিজান বলেন, যখন কাজ করেই তখন নি¤œ মানের মালামাল দিয়ে কাজ করছেন। দায়সারা কাজ করার কারণে লবন পাঠি উঠে। ওই অবস্থায় ফেলে রেখেই ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন উধাও হয়ে যায়। একদিনের জন্যও আমরা পানি ব্যবহার করতে পারিনি। অহেতুক সরকারের প্রায় ৮০ লাখ টাকা জলে গেছে।
এবিষয়ে উপজেলা সহকারি প্রকৌশলী কার্যালয়ের উপ- সহকারি প্রকৌশলী মো. মাকসুদুর রহমান বলেন,‘ এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। খোঁজ না নিয়ে কিছু বলতে পারছি না। খোঁজ নিয়ে জানাবো। তৎকাকালীন দায়িত্বরত উপ-সহকারি প্রকৌশলী মো. আশরাফ হোসেন বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এবিষয়ে জেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন,‘ এ প্রকল্পের অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের। আমরা শুধু নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেছি। তারপরেও যদি নির্মাণ কাজে অনিয়ম হয় সেবিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রকল্প সচল করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হবে ।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৮:৫৮:৩৩ ৩১ বার পঠিত | ● পানির প্রকল্প ● বাউফল