ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
প্রচ্ছদ » বরিশাল » গ্যাসের আগুনে পুড়ে একই পরিবারের নিঃশেষ পাঁচ প্রাণ, শায়িত হলেন স্ত্রী ও তিন সন্তান!

গ্যাসের আগুনে পুড়ে একই পরিবারের নিঃশেষ পাঁচ প্রাণ, শায়িত হলেন স্ত্রী ও তিন সন্তান!


স্টাফ রিপোর্টার,( বাউফল )
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে ২০২৬


গ্যাসের আগুনে পুড়ে একই পরিবারের নিঃশেষ পাঁচ প্রাণ, শায়িত হলেন স্ত্রী ও তিন সন্তান!পটুয়াখালী: প্রায় ২০ বছর আগে পাড়ি জমিয়েছিল ঢাকার নারায়নগন্জে একবুক আশা নিয়ে আবুল কালাম। কাঁদামাটির বাড়িতে তিলতিলে গড়েছিল স্বপ্নের ইটের দেয়াল। ছাদও হয়েছিল। আশা ছিল এই ঈদে বাড়িতে এসে ছাদ ঢালাই করে স্ত্রী,পুত্র দুই কণ্যাকে নিয়ে বাড়িতে স্বপ্নের পাকা ঘরে উঠবে। আবুল কালাম ও স্ত্রী,সন্তান নিয়ে ঠিকই এসেছে কপিনে মোড়া ৫টি লাশ।নিভে গেল একটি পরিবারের সবকটি প্রাণ। একে একে পরপারে চলে গেলেন স্বামী, স্ত্রী ও তাদের তিন সন্তান। গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় পর্যায়ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তারা।

শনিবার (১৬ মে) সকালে যখন মা সালমা বেগম (৪০), একমাত্র ছেলে মুন্না (১২), দুই মেয়ে মুন্নী (৯) ও শিশু কথা’র (৭) সাদা কফিনে মোড়ানো লাশ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের কাড়াল বাড়িতে এসে পৌঁছায়, তখন পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। এর আগে গত সোমবার সকালে দাফন করা হয়েছিল গৃহকর্তা কালাম মিয়া (৪৫) লাশ। আজ নতুন বাড়ির পুকুরপাড়ে কামাল মিয়ার কবরের ঠিক পাশেই বাকি চারজনের লাশ দাফন করা হয়েছে। একই সারিতে পাশাপাশি পাঁচটি তাজা কবরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিল এলাকার শত শত মানুষ।

জানা গেছে, কালাম মিয়া দীর্ঘ দিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেনলা। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ভুইগড় এলাকার একটি ১০ তলা ভবনের নিচতলায় দুটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতো তিনি। গত রবিবার (১০ মে) সকাল ৬টার দিকে কালাম মিয়া রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় তরকারি গরম করতে যায়। তখন স্ত্রী ও সন্তানরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। ঘরটিতে আগে থেকেই জমে থাকা লিকেজ গ্যাস দেশলাইয়ের সংস্পর্শে আসতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পরে পুরো ঘরে । এ সময় জ্বলন্ত আগুনের মাঝেও বাবা কালাম ঘরের দরজা খুলে দগ্ধ ছেলে মুন্নাকে বাইরে বের করে দেয়। কিন্তু মুহুর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা কামালের স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তাসহ সবাইকে নির্মমভাবে গ্রাস করে নেয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করে।কিন্তু

বার্ন ইউনিটের বিছানায় একে একে নিভে গেছে পাঁচটি প্রাণ। মৃত্যুর এই নির্মম মিছিলে প্রথমে বিদায় নেয়, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আবুল কালাম মিয়া। দুর্ঘটনার দিন রোববারই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যায়। স্বজনরা রাতেই তার মরদেহ নিয়ে আসে কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের বাড়িতে। এবং সোমবার সকাল ১০টায় তার জানাজা শেষে দাফন করা হয়। তখনো কেউ জানত না, একই কবরের পাশে আরও চারটি কবর খুঁড়তে হবে এলাকাবাসি ও স্বজনদের।

গত বুধবার বিকেল মৃত্যুরকোলে ঢলে পড়ে ৭ বছরের অবুঝ শিশু কথা মনি। মায়ের কোল খালি করে চলে যাওয়া কথার লাশ রাখা হয় জাতীয় বার্ণ ইউনিট হাসপাতালের হিমাগারে, কারণ বাকিদের অবস্থাও ছিল আশঙ্কাজনক। বুধবার রাত ১১টা বোনকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় মারা যায় একমাত্র ছেলে মুন্না (১২)। বৃহস্পতিবার না ফেরার দেশে চলে যায় মেঝ মেয়ে মুন্নী (৯)। শুক্রবার সকাল ৮টা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা বেগম (৪০)।

শনিবার(১৬মে) সকালে যখন মা ও তিন সন্তানের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি কাড়াল বাড়ির উঠানে এসে থামে, তখন উপস্থিত শত শত মানুষের চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে যখন একে একে চারটি সাদা কফিন বের করা হচ্ছিল, তখন স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। চলে একাকায় শোকের মাতম।শেষবারের মতো একনজর দেখতে আসা মানুষের ভিড়ে চারপাশ থমকে যায়। এরপর সকাল ১০টায় জানাজা শেষে কামাল মিয়ার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তার স্ত্রী ও সন্তানদের । জানাজার নামাজের বাউফলের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ শত শত মুসুল্লিরা উপস্থিত ছিলেন।

কালাম মিয়ার চাচাতো ভাই সোহাগ বলেন, “প্রায় ২০-২২ বছর আগে কামাল বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে উজিরপুরে বিয়ে করেছিল। কত কষ্ট করে ফতুল্লার ব্যবসাটা দাঁড় করাল। মাত্র ২০-২৫ দিন আগেও ঢাকায় ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না, ভাই-ভাবি আর পুলাপাইনডি এভাবে আমাদের ছেড়ে এক্কেরে চলে যাবে!”

কালাম মিয়ার বোন রাসেদা বেগম বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, “ঈদের আগে ভাইয়ের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল। বাড়িতে ভাইয়েরা মিলে একটা নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ ধরছিল। ভাই বলছিল ‘এবার কোরবানির ঈদে বাড়ি আইসা ঘরের কাজ শেষ করমু, বাকি জীবনটা স্ত্রী-সন্তান নিয়া দেশের বাড়িতেই থাকমু।’ ভাই আমার বাড়ি ফিরল, কিন্তু লাশ হয়া!”

এদিকে এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পেছনে ভবন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন এক স্বজন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাসার গ্যাসের পাইপ লিকেজ হওয়ার বিষয়টি কালাম মিয়া আগের দিনই ভবনের দারোয়ানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তুদারোয়ানের অলসতা করে বাড়ির মালিককে বিষয়টি জানায়নি। যদি সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তবে আজ একটি পুরো পরিবার এভাবে শেষ হয়ে যেত না।”

গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হয়ে একই পরিবারের ৫ জনের এমন নির্মম ও হৃদয়বিদারক মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন বাউফলের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে নিহতদের লাশ পরিবহন ও দাফন সম্পন্ন করার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয় বলে এলাকাবাসি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সালেহ আহম্মেদ আবেগপ্লুতোভাবে সমকালকে বলেন,মর্মাহত ও হৃদয় বিদারক ঘটনা।

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ১৯:০২:৫৯   ২৩ বার পঠিত  |