![]()
গাজীপুর: কালীগঞ্জে রাথুরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার খাতায় ভুল উত্তরে নম্বর না দেওয়ায় সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানাকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন একই বিদ্যালয়ের জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ। ছেলেকে বেসরকারী কিন্ডার গার্টেনে ভর্তি রেখে সরকারি বই ও উপবৃত্তির টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি গত রোববার ঘটলেও বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার সকালে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি প্রকাশ পায়। এই নিয়ে এলাকায় সমালোচনার ঝড় বইছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের রাথুরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী জুনিয়র শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ ২০২৩ সনে এই বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তার ছেলে আহনাফ শেখ তার পরিচালনাধীন বড়গাঁও মডেল কিন্ডার গার্টেনে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হয়ে লেখাপড়া করছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁর ছেলেকে রাথুরা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাজিরা খাতায় নাম লিখে বিদ্যালয় থেকে সরকারি বই ও উপবৃত্তি সহ সরকারি সকল সুবিধা ভোগ করে আসছেন। একই বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানার ছেলে আহসান জারিফ দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। সম্প্রতি তাদের প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
মো. ওমর ফারুক শেখের ছেলে ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষায় একটি প্রশ্নের উত্তর সঠিক না দেওয়ায় শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা তাতে কোন নম্বর প্রদান করেননি। ফারুক শেখ তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে সিনিয়র শিক্ষক রাজিয়া সুলতানার সাথে খারাপ আচরণ করে তাকে নানা ধরণের হুমকি প্রদান করেন। এই প্রশ্নের উত্তর সঠিক হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর ছেলেকে চার নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাকে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। রাজিয়া সুলতানা তাতে অপারগতা প্রকাশ করায় জুনিয়র শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ তাঁর সাথে তর্কে জড়ায় এক পর্যায়ে সিনিয়র শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানাকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করেন সে।
ওমর ফারুক শেখ পরবর্তীতে শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনাটি স্থানীয় লোকজনের কাছে ভিন্নভাবে প্রচার করে নিজের ক্ষমতার বিষয় জাহির করতে থাকেন। পাশাপাশি শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা ও তার ছেলে আহসান জারিফকে দেখে নেওয়ার হুমকি প্রদান করেন। দুইদিন পর বিষয়টি যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে ওমর ফারুক শেখ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাধিকা চন্দ্র দেবনাথকে ম্যানেজ করে বিষয়টি ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় সাংবাদিকরা অভিযুক্ত শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাধিকা চন্দ্র দেবনাথের নিকট বিষয়টি জানতে চাইলে প্রথমে তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাজিয়া সুলতানা ও ফারুক মাষ্টারের সাথে কোন ধরণের ঘটনা ঘটেনি বলে জানান।
পরে স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে লাঞ্ছনার শিকার শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা, অভিযুক্ত শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাধিকা চন্দ্র দেবনাথের সাথে কথা বললে তারা রাজিয়া সুলতানাকে লাঞ্ছনার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন এবং বলেন বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা বলেন, বিদ্যালয়ের জুনিয়র শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখের ছেলে আমাদের বিদ্যালয়ে প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষায় একটি প্রশ্নের উত্তর ভুল দিয়েছে। আমি তার খাতা দেখা সময় ভুল উত্তরে নম্বর না দেওয়ায় সহকর্মী ফারুক স্যার আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন এবং তাতে নম্বর দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আমি অপারগতা প্রকাশ করায় আমার সাথে তর্কে জড়িয়ে পরেন।
আমি ক্লাসে যাওয়ার জন্য চেয়ার থেকে উঠতে চাইলে ফারুক স্যার আমাকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছনা করেন। পরবর্তীতে ফারুক স্যার নিজেই এলাকায় বিভিন্ন লোকজনের নিকট আমাকে হেয় করার উদ্দেশ্যে শারিরীক ভাবে লাঞ্ছনার ঘটনা বলে বেড়ায়। এ বিষয়ে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য আমাকে ও আমার স্বামীকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরণের হুমকি দিয়ে আসছেন।
অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ বলেন, আমার ছেলে বড়গাঁও মডেল কিন্ডার গার্টেনে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। সে এই বিদ্যালয় হতে সরকারি বই নিয়েছে এবং নিয়মিত উপবৃত্তির টাকা পায়। এই বিদ্যালয়ে থেকে প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা পরীক্ষার খাতা দেখার সময় একটি প্রশ্নের উত্তরে নম্বর না দেওয়ায় তার সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়। এই সময় আমি রাগ সামলাতে পারিনি। তাই আমাদের মাঝে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। আমরা তার সমাধান করে ফেলেছি।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার গোলাম রহমান বলেন, উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের রাথুরা ১নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখ কর্তৃক সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকা রাজিয়া সুলতানা শারিরীক লাঞ্চনার বিষয়টি শুনে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে কথা বলেছি। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম কামরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ের জুনিয়র সহকারী শিক্ষক মো. ওমর ফারুক শেখের হাতে সিনিয়র সহকারী শিক্ষিকাকে শারিরীক লাঞ্চনার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ঘটনা তদন্ত পূর্বক দোষী শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরী নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ০:৪৭:০৬ ৬ বার পঠিত | ● কালীগঞ্জ ● লাঞ্ছিত ● শিক্ষিকা