ঢাকা    রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রচ্ছদ » প্রধান সংবাদ » ঢাকা-রংপুর লংমার্চে এক দফার হুঁশিয়ারি ১১ দলের

ঢাকা-রংপুর লংমার্চে এক দফার হুঁশিয়ারি ১১ দলের


অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ঢাকা-রংপুর লংমার্চে এক দফার হুঁশিয়ারি ১১ দলের

গণভোটের ফল অনুযায়ী সাংবিধানিক ও কাঠামোগত সংস্কার না করায় বিএনপি সরকারকে ‘নব্য স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। জুলাই জাতীয় সনদ হুবহু বাস্তবায়নসহ বিরোধীদের দাবি মেনে না নিলে এক দফার আন্দোলন শুরু হতে পারে বলে হুঁশিয়ার করেছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। বাংলাদেশকে বাঁচাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।

গতকাল শনিবার ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত লংমার্চের সমাবেশ ও পথসভায় এসব কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতারা। জোটের শরিক দলের নেতারাও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ করেন। পাশাপাশি জ্বালানি সংকট নিরসন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ ও চাঁদাবাজি বন্ধে বিএনপি সরকার ব্যর্থ বলে দাবি করেন তারা। সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। দেশ চালাতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বলেন জোট নেতারা। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যর্থ দাবি করে তাঁর পদত্যাগ চান তারা।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ জোটের শীর্ষ ও জ্যেষ্ঠ নেতারা এসব কথা বলেন।

গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার, জ্বালানি সংকট নিরসন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধসহ ছয় দফা দাবিতে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ করে ১১ দল। গতকাল শনিবার হয় ঢাকা-রংপুর লংমার্চ। আগের দাবির সঙ্গে চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস বন্ধ এবং দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরুর বিষয়টি যোগ হয়েছে।

জোটের পক্ষ থেকে লংমার্চের বহরে হাজারখানেক গাড়ি থাকবে বলে জানানো হয়েছিল। যমুনা সেতুতে টোল দিয়ে চার শতাধিক গাড়ি পার হয়। তবে গাড়ির প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি। কারণ, ১১ দলের গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের নেতাকর্মীদের গাড়িবহর সেতু পার হওয়ার আগেই ফেরত আসে। আবার সিরাজগঞ্জের বহর যুক্ত হয় সেতু পার হওয়ার পর।

ছাদখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে জোট নেতারা সড়কের দুপাশে জমায়েত হওয়া মানুষকে অভিবাদন জানান।

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে প্রথম সমাবেশের পর সকাল ৯টার দিকে রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করে ১১ দলের লংমার্চের গাড়িবহর। পথে গাজীপুরের ভোগড়া, টাঙ্গাইলের জালফৈ বাইপাস, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল, বগুড়ার মাটিডালি ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পথসভা হয়। নেতাকর্মীদের ভিড়ে তা জনসভায় রূপ নেয়। রাত ৯টার দিকে রংপুরে পৌঁছে লংমার্চ। সেখানে জিলা স্কুল মাঠে বিশাল জনসভার মাধ্যমে কর্মসূচির ইতি টানা হয়।

‘সাহস থাকলে বলুন—গণভোট মানি না’

রংপুরের সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, সরকার জনগণের কাছে কথা দিয়ে কথা রাখেনি। নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রংপুর থেকে ঘোষণা দিয়েছিলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলুন। তিনি তাঁর অঙ্গীকার রক্ষা করেননি, জনগণের রায়ও মানেননি।

বিএনপির উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেন, তারা সাহস করে বলতে পারে না, ‘জনগণের রায় মানি না।’ ইনিয়ে-বিনিয়ে বলে, ‘সংবিধানে গণভোট নাই।’ সংবিধান মেনে চব্বিশে গণবিপ্লব হয়নি। ফ্যাসিস্টদের সংবিধান মেনে হটাতে পারেন নাই। আমরাও পারিনি।

সরকারের সমালোচনায় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এক মন্ত্রী নির্বাচনের আগে তিস্তা নিয়ে আন্দোলন করে বলেছিলেন, ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়।’ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শেষে সংসদে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেছিলেন, যে নামেই হোক, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সাত মাস হয়ে গেল, কোনো নড়াচড়া নাই। নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় আসলেন। দেশটা যাতে ভালো চলে, সে কারণে মেনে নিলাম। কিন্তু সারাদেশের মতো রংপুরেও বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। আছে চাঁদাবাজি।

রাত ১০টায় সমাবেশ শেষ হলেও বিকেল থেকেই জিলা স্কুল মাঠ পূর্ণ হয়ে যায়। পঞ্চগড় থেকে আসা জামায়াত কর্মী আব্দুল খালেক বলেন, ‘হামরা লংমার্চ সফল করিবার জন্যি জোহরের নামাজের আগে থাকি মাঠোত উপস্থিত হইচি। জোহর, আসর ও মাগরিবের নামাজ এটে আদায় করছু। সমাবেশে ম্যালাগুলা মানুষ দেখপার পাইনু। সরকার হামার দাবি মানি নেউক। এটাই চাই।’

সমাবেশ উপলক্ষে রংপুর নগরীর প্রতিটি সড়কে ছিল জনস্রোত। খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা আসেন।

মানিক মিয়ায় হাজারো নেতাকর্মী

গতকাল ভোর থেকেই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জমায়েত হতে শুরু করেন ১১ দলের নেতাকর্মীরা। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন জামায়াতের। এনসিপি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতাকর্মীদেরও উপস্থিতি ছিল।

সকাল ৭টায় শুরু হওয়া সমাবেশে শফিকুর রহমান সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, বিরোধী দলের আট দফার লংমার্চ জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে। আট দফা এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে। সরকার যেন সাম্প্রতিক অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের দাবি মেনে নেয়। চোখরাঙানিতে কাজ হবে না।

জামায়াত আমির বলেন, চট্টগ্রামের লংমার্চ সফল হওয়ায় অনেকের মাথা গরম হয়ে গেছে। এর কিছু লক্ষণ দুদিন ধরে রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে। তারা যেন হতাশ হয়ে মাথা গরম না করে জনতার দাবি মেনে নেয়।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি জনগণের অধিকার হরণ এবং গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে। তারেক রহমানকে নির্ধারণ করতে হবে, তিনি কীভাবে ক্ষমতা থেকে চলে যাবেন। তিনি কি হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে পালিয়ে যাবেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করবেন—সে সিদ্ধান্ত তাঁকে নিতে হবে। এরশাদও সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন।

সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন আইনকে দুর্বল করেছে। র‌্যাবের নাম বদলে এসআরবি করেছে। সরকারের কাজ মানবাধিকারের সুরক্ষা দেওয়া; কিন্তু তারা মানবাধিকার হরণ করার সব ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে।

অলি আহমদ বলেন, তারেক রহমানের সরকার বিএনপির সরকার নয়; এটি হাসিনার সরকার। তাঁকে সাবধান হতে হবে, দেশবাসীকেও সাবধান হতে হবে।

মামুনুল হক বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক দল হিসেবে চিহ্নিত হবে বিএনপি।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, লংমার্চে দেশজুড়ে জোয়ার তৈরি হয়েছে। স্বাগত বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও লড়াই চলবে।

পথে পথে সভা, বড় জমায়েত

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে শফিকুর রহমান উপস্থিত নারীদের দেখিয়ে বলেন, মা-বোনেরা রাস্তায় যখন নেমেছে, তখন দাবি আদায় হবে। যদি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করা হতো, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধ হতো, কৃষকরা সার পেত, তাহলে লংমার্চ করতাম না।

নজরুল ইসলাম লেবু এমপির সভাপতিত্বে সভায় জোট নেতা ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন। এ সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘উনি সর্বমন্ত্রী হয়েছেন। শুধু নিজের মন্ত্রণালয়ের খোঁজ নেই। আপনি পারবেন না। বাংলাদেশকে বাঁচাতে আপনি বিদায় নিন।’

এর আগে বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড়ে পথসভা হয়। সেখানে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসেই জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে জনগণকে অপমান করেছে। সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, কৃষকরা সার পাচ্ছে না, এ জন্যই লংমার্চ।

বগুড়ার সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের কড়া সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম ও এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বোনেরা রাস্তায় চলার সময় নিরাপত্তা পায় না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি এসব কিছুর দায় নেবেন না? নেওয়া উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।

বগুড়ায় মামুনুল হক বলেন, তারেক রহমানের পরিণতি শেখ হাসিনার মতো হোক—চাই না। সংবিধান সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করুন।

এদিকে বগুড়ায় ১১ দলের লংমার্চের ব্যানার ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এনসিপি শেরপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছে। ওসি এস এম মঈনুদ্দিন বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে।

হাটিকুমরুল গোলচত্বরে ১১ দলীয় ঐক্যের পথসভায় সরকারের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, আট দফা ভালোয় ভালোয় মেনে না নিলে তা এক দফায় রূপ নেবে।

টাঙ্গাইলে জামায়াত আমির বলেন, সরকার জাতির সঙ্গে বেইমানি করেছে। বিভিন্ন দপ্তরে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়ে প্রতারণা করেছে।

গাজীপুরের ভোগড়ার পথসভা জনসভায় পরিণত হয়। এখানেও এক দফার হুঁশিয়ারি দেন বিরোধীদলীয় নেতা। গাজীপুরের নেতা মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বিএনপি এখন নাই নাই, খাই খাই পার্টিতে পরিণত হয়েছে।

লংমার্চের সমাবেশ ও পথসভায় বক্তব্য দেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফতের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ জোট নেতারা। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ জ্যেষ্ঠ নেতারাও এ কর্মসূচিতে ছিলেন।

এন/ এস

বাংলাদেশ সময়: ১৬:০৩:৪৩   ১ বার পঠিত  |