![]()
কুরিগ্রাম: “হামার এতি যদি নদীটা বাঁদিল হয়, মোড় বাড়ীটা ভাঙ্গিল না হয়। বাপ-দাদার বাড়ি-ভিটা, জমিজমা এক আইতেই ভাঙ্গি নিয়া গেল। এক দিনে ফকি হয়া গেছি বাহে। জমাজমি নাই, শ্বশুর বাড়ীত কোনোমতে একটা ঘর করি আছি। হামার দুর্গাত কেই দেখে না।”
কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দক্ষিণ দলদলিয়া গ্রামের বাড়ি-ভিটা হারানো আবেদ আলী (৭০)।
একই গ্রামের আব্দুল বাতেন (৬৫) বলেন, “আইতোত ভাঙ্গন শুরু হইছে দিনের ১২টা নাগাত, মোড় বাড়িটা নদীতে চলি গেল। খালি ঘর ২টা ভাঙ্গি সরাইছি। আর কিছুই বাচঁপার পাই নাই। এখন অন্য গ্রামে একজনের বাড়ীতে আশ্রয় নিছি। আগে আছিনো গিরস্থ, এখন হইলাম নদীভাঙ্গা মানুষ। হায়রে কপাল, কি আছিন, কি হইন।”
আবেদ আলী ও আব্দুল বাতেনের মতো বাড়িঘর হারিয়ে দিশেহারা তৈয়ব আলী (৬৫), জহুরুল হক (৬০), মফিজল হক (৬২), জাকির হোসেন (৫০), বজরুল হক (৬৪) ও ফজলুল হক (৫৫)। তাঁরা এলাকা ছেড়ে পরিবার নিয়ে কোথায় চলে গেছেন, তা কেউ জানে না।
নদীভাঙন মানুষের শুধু আশ্রয়ই কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় পরিচয় ও অস্তিত্ব। সেই অস্তিত্ব রক্ষায় তিস্তা পাড়ের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে হিন্দুপাড়া, ডাক্তারপাড়া ও গোড়াই পিয়ার গ্রামেও ভাঙন চলছে। অব্যাহত ভাঙনে অন্তত ২০টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। আশ্রয়হীন হয়েছে ২৫টি পরিবার।
গত সাত দিন ধরে দক্ষিণ দলদলিয়া লাল মসজিদপাড় এলাকায় তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে ১০টি বাড়ি, গাছপালা, বেশ কিছু আবাদি জমি ও প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে দক্ষিণ দলদলিয়া ও গোড়াই পিয়ার গ্রামের ৫ শতাধিক পরিবার, নালারচর সোলেমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লাল মসজিদ ও বাঁধের রাস্তা।
ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতা না পেয়ে ভুক্তভোগীরা গাছপালা দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানায়, নদীর পানি বাড়লেও ভাঙে, কমলেও ভাঙে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুব আলম ছালেহী ভাঙন রোধে ৫ হাজার জিও ব্যাগ চেয়ে ডিও লেটার দিলেও তা দিতে পারেনি কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড। তারা জানিয়েছে, সরকার থেকে জিও ব্যাগ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে। ফলে তারা নিরুপায়। এ কারণে ওই স্থানে নদীভাঙন রোধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।
ভাঙনের মুখে পড়েছেন শাহজাহান আলী (৬৮)। তিনি বলেন, “এবার বাড়িটা ভাঙলে কোথায় যাব”—পরিবার নিয়ে সেই ভাবনায় দিশেহারা তিনি। এর আগে ১০ বার তাঁর বাড়ি ভেঙেছে। থেতরাই থেকে বজরা ইউনিয়নে তিস্তার ভাঙন রোধে সিমেন্ট-বালুর ব্যাগ দিয়ে যেভাবে নদীর পাড় বাঁধা হয়েছে, সেভাবে এদিকেও বাঁধ দেওয়ার দাবি তাঁর। তাহলে তাঁরা ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবেন বলে জানান তিনি।
একই দাবি করেছেন ওবায়দুর রহমান (৬২), হায়দার আলী (৫০), মাঈদুল ইসলাম (৬৫), আবু হানিফ (৪৫), রফিকুল ইসলাম (৫৫) ও জরিনা বেগম।
লাল মসজিদের ইমাম মো. মজিবর রহমান বলেন, ভাঙন রোধের ব্যবস্থা না হলে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী লাল মসজিদটি নদীতে হারিয়ে যাবে।
নালারচর সোলেমানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, “নদীর যে রূপ দেখছি, কখন যে বিদ্যালয়টি ভেঙে নিয়ে যাবে।”
দলদলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. লিয়াকত আলী বলেন, “আমি ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছি। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য অনুরোধ করেছি।”
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ওই এলাকার ভাঙন রোধের জন্য জিও ব্যাগের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এখনও অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এদিকে জেলার বরাদ্দ শেষ হওয়ায় বিপদে পড়েছেন তাঁরা। জাতীয় সংসদ সদস্য জিও ব্যাগের জন্য ডিও লেটার দিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ.টি.এম. আরিফ বলেন, ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে জিও ব্যাগের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে। তাঁরা চেষ্টা করছেন। জিও ব্যাগ না ফেলালে এত বড় লোকালয় রক্ষা করা যাবে না।
এন/ এস
বাংলাদেশ সময়: ২৩:৫৫:৫৭ ১১ বার পঠিত | ● উলিপুর ● তিস্তায ● বিলীন ● ভাঙন