![]()
পিরোজপুর: নাজিরপুর শহীদ জিয়া কলেজে জাল স্বাক্ষর ও ভুয়া সিল ব্যবহার করে তিনজনকে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রতন মন্ডল, পলাশ সাহা ও অনুপ হালদার নামের ওই তিন ব্যক্তি জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে আসছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই নিয়োগ জালিয়াতির মূল হোতা ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তৎকালীন কলেজ সভাপতি একেএম আউয়াল। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে ওই তিনজনকে ভুয়া নিয়োগ দেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পূর্বের নাম ‘শহীদ জিয়া কলেজ’ পরিবর্তন করে ‘নাজিরপুর কলেজ’ রাখেন। গত ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর থেকে প্রভাবশালী এই নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন।
নিয়োগ বোর্ডের নথিপত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের প্রতিনিধি (ডিজি নমিনি) হিসেবে সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যাপক আবদুল জলিল আকনের নাম ও স্বাক্ষর দেখানো হয়েছিল। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে অধ্যাপক জলিল আকন জানান, নথিতে থাকা ওই স্বাক্ষর ও সিল তাঁর নয়। তাঁর দাবি, পুরো নিয়োগ বোর্ডই ছিল ভুয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সিল-সই নকল করা হয়েছে। একইভাবে বিষয় বিশেষজ্ঞ ডক্টর সফিকুল ইসলামের ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
কলেজের প্রশাসনিক পদ নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। জালিয়াতির নথিতে ঘটনার সময় নারায়ণ চন্দ্র হালদারকে কলেজের সদস্য সচিব ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দেখানো হলেও বর্তমান ও সাবেক শিক্ষকদের দাবি, নারায়ণ চন্দ্র কখনো এই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন না। এ বিষয়ে জানতে নারায়ণ চন্দ্রের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘ব্যস্ত আছেন’ বলে কল কেটে ফোন বন্ধ করে দেন। এ ছাড়া কলেজের বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জালিয়াতির বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকদের মুখোমুখি হলে তারা প্রথমে ক্ষোভ প্রকাশ ও হুমকি দেন। নিয়োগের বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হন। অভিযুক্ত অনুপ হালদার শুরুতে কাগজপত্র আছে দাবি করলেও পরে তা অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে ঘটনা ধামাচাপা দিতে কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধি সদরুল আলম মল্লিক শাহিন সাংবাদিকের পকেটে টাকা গুঁজে দিয়ে মীমাংসার প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিক টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়।
এদিকে, জালিয়াতির পাশাপাশি অভিযুক্ত শিক্ষক অনুপ হালদারের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের কুপ্রস্তাব দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। এর আগে গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হলে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও পরে প্রভাব খাটিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, এর আগে ওই নিয়োগ নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি অজ্ঞাত কারণে আংশিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিটির এক সদস্য জানান, নিয়োগে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে এবং তা প্রমাণিত হলে নিয়োগ বাতিলসহ গৃহীত বেতন-ভাতা ফেরত দিতে হবে। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটির অন্য সদস্য প্রভাষক মশিউর রহমান স্পষ্ট জানান, এই বিতর্কিত নিয়োগের সঙ্গে এনটিআরসিএর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মশিউর কবির জানান, সরকারি নিয়োগের নথিতে জাল স্বাক্ষর বা সিল ব্যবহারের অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে উত্তোলিত সমুদয় অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
পিরোজপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী আযিযী জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ সাপেক্ষে তদন্ত করে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাগজে-কলমে সব নিয়ম মানার ভান করা হলেও অভিযোগ অনুযায়ী, জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক ও তাঁদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কবে আইনি পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে নাজিরপুরবাসী।
এন/ এস
বাংলাদেশ সময়: ২১:২২:৩০ ৪ বার পঠিত | ● কলেজ ● নাজিরপুর ● শহীদ জিয়া