ঢাকা    মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রচ্ছদ » বরিশাল » শিক্ষক দিবসে ৬০ বছরের বিনামূল্যের পাঠদানের স্বীকৃতি পেলেন রমণী কান্ত

শিক্ষক দিবসে ৬০ বছরের বিনামূল্যের পাঠদানের স্বীকৃতি পেলেন রমণী কান্ত


আজাদ রহমান,স্টাফ রিপোর্টার (আগৈলঝাড়া)
প্রকাশ: সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬


 শিক্ষক দিবসে ৬০ বছরের বিনামূল্যের পাঠদানের স্বীকৃতি পেলেন রমণী কান্ত

বরিশাল: তিন প্রজন্মের হাতেখড়ি একই শিক্ষকের কাছে। প্রত্যন্ত গ্রামের শিশু থেকে সব বয়সী মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘রমণী স্যার’ নামে। মন্দিরের আঙিনায় টিনের একচালা ঘরে নেই আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ কিংবা কোনো বেতনভুক্ত শিক্ষক। সরকারি কোনো অনুদানও পাননি। অথচ প্রতিদিন সেখানে বসে প্রায় ৬০ বছর ধরে বিনামূল্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন একজন মানুষ।

বয়সের ভারে শরীর ন্যুজ হলেও শিক্ষা দানের নেশায় এখনো ক্লান্ত হননি তিনি। প্রায় ছয় দশক ধরে প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের বিনা পয়সায় পড়িয়ে আসছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের রমণী কান্ত বেপারী।

দীর্ঘদিন পর শিক্ষা ক্ষেত্রে তার এই অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকার আব্দুল গনি রোডের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের পাঠশালার শিক্ষক রমণী কান্ত বেপারীর গলায় মেডেল পরিয়ে দেন এবং নগদ ২ লাখ টাকার চেকসহ তার হাতে সম্মাননা সনদ তুলে দেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন নাতি তরুন বেপারী।

স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি সবার ‘রমণী স্যার’। তিন প্রজন্মের যিনি হাতেখড়ি দিয়েছেন, সেই মানুষটি জীবনের দীর্ঘ সময় উৎসর্গ করেছেন গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের শিশুদের লেখাপড়া শেখাতে।

রাংতা গ্রামের রাখাল বেপারীর ছেলে রমণী কান্ত বেপারী স্কুলের ছাত্র থাকাবস্থায় এলাকার দরিদ্র পরিবারের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পড়ানো শুরু করেন। সালটি ছিল স্বাধীনতারও আগে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের পড়ানোর সেই শুরু, বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেও তা আজও থামেনি। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবর্তন এসেছে গ্রামের জীবনযাত্রায়। এসেছে আধুনিক স্কুল ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা। কিন্তু রাংতা গ্রামের এই ছোট্ট পাঠশালায় এখনো প্রতিদিন শোনা যায় শিশুদের পড়াশোনার শব্দ ও কলরব।

১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বর চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক (এসএসসি) পাস করার পর সরকারি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন রমণী কান্ত। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি তিনি। মেধাবী হওয়ায় সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করেননি। গ্রামের ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের প্রতি মায়া ও ভালোবাসার কারণে চাকরিতে না গিয়ে তাদের পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এরপর কেটে গেছে একে একে প্রায় ছয় দশক। রাজিহার-চাঁদশী সড়কের পাশে রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনাই হয়ে উঠেছে তার পাঠশালা।

পরবর্তীতে স্থানীয়দের কাছে ‘রমণীকান্তের পাঠশালা’ নামে পরিচিতি পায় এটি। সপ্তাহে শুক্রবার বাদে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে শিশুদের পাঠদান চলে। বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ জন শিশু নিয়মিত তার কাছে পড়ালেখা করছে। পাঠশালায় পড়াশোনা শেষে রমণী স্যার নিজেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেন।

এই দীর্ঘ সময়ে তার কাছে পড়াশোনা করে এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থী জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরি করছেন, আবার অনেকে সরকারি-বেসরকারি বড় বড় পদে দায়িত্ব পালন করছেন। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয়, একই পরিবারের তিন প্রজন্মের হাতেখড়িও হয়েছে তার কাছে। যে বাবা একদিন শিশু অবস্থায় রমণী স্যারের কাছে পড়তে এসেছিলেন, পরে তার সন্তানও এই পাঠশালায় তার কাছেই পড়েছে। এখন সেই পরিবারের নাতি-নাতনিরাও তার কাছেই হাতেখড়ি নিচ্ছে।

রমণী কান্ত বেপারীর পাঠশালায় কোনো মাসিক বেতন নেই। শিক্ষার বিনিময়ে তিনি অর্থ নেন না। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই বছরের পর বছর ধরে তিনি শিশুদের পড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে অনেক অভিভাবক মাঝে মধ্যে খুশি হয়ে কিছু দিলে তা গ্রহণ করেন রমণী কান্ত বেপারী।

তার নিজের জীবনও খুবই সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পাকে নিয়ে সংসার; বাড়িতে একটি দোচালা টিনের ঘরেই তাদের বসবাস। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিজের কিছু কৃষিজমি রয়েছে। সরকারি তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা না পেলেও তার নামে রয়েছে বয়স্ক ভাতার কার্ড। অভাব-অনটনের এই দীর্ঘ জীবনের মধ্যেও শিশুদের পড়ানোর আনন্দই যেন তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও সাফল্য।

রমণী কান্ত বেপারী বলেন, “স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পাঠদান করে আসছি। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন যেন এভাবেই এলাকার শিশুদের কিছু শিক্ষা দিয়ে যেতে পারি। বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান আমাকে যে সম্মান ও সম্মাননা দিয়েছেন, এতে আমার শিক্ষক জীবন সার্থক। বাকি জীবন মন্দির আঙ্গিনায় শিশু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করেই কাটাব।”

রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি রনজিত বৈদ্য বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই রমণী কান্ত বেপারী এখানে বসে এলাকার শিশুদের পাঠদান করে আসছেন। তার কারণে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। তার কাছে পড়তে আসা সমৃদ্ধি, অর্ক, বিক্রম, নির্জয়, তাবাসুমসহ শিক্ষার্থীরা জানায়, এই পাঠশালায় পড়তে তাদের অনেক ভালো লাগে। স্যার পড়ালেখার পাশাপাশি ছড়া ও গল্প বলেন, তাদের অনেক আদরও করেন।

রাংতা মন্দির আঙিনায় উপস্থিত অভিভাবক শ্যামল বেপারী, মালা বালা ও রেনুকা বেপারী বলেন, “এই স্যারের কাছে আমার বাবা পড়েছেন, আমি পড়েছি, এখন আমার ছেলেও পড়ছে। আমাদের পরিবারের তিন প্রজন্মই তার কাছে পড়াশোনা করেছে। আমরা আমাদের সন্তানকে প্রতিনিয়ত রমণী স্যারের কাছে পড়াতে নিয়ে আসি। তিনি যত্ন নিয়ে শিশুদের পড়ান। হঠাৎ দুই-একদিন যদি আমাদের সন্তান এখানে না আসে, তবে তিনি খোঁজ নিতে আমাদের বাড়িতে যান। এ যুগে তার মতো একজন ভালো লোক পাওয়া আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার।”

কোনো পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা না রেখে জীবনের প্রায় পুরোটা সময় শিশুদের শিক্ষার পেছনে ব্যয় করে রমণী কান্ত বেপারী যেন নীরবে প্রমাণ করে চলেছেন, শিক্ষা শুধু পেশা নয়, মানুষের জীবন বদলে দেওয়ারও এক মহৎ দায়িত্ব। তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, যার পাঠশালায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, “বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার স্যারের নির্দেশে রমণী কান্তের পাঠশালায় সরেজমিনে আমি দেখতে যাই। শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান দেখে আমার খুবই ভালো লেগেছে। শিক্ষক রমণী কান্ত বেপারী একজন ভালো মানুষ। তার মতো মানুষ সমাজে আছে বলেই আমাদের দেশটা ভালো আছে।”

এন/ এস

বাংলাদেশ সময়: ২২:০৬:১৩   ৪ বার পঠিত  | ●   ●   ●