![]()
ফরিদপুর: সালথা উপজেলা যুবলীগের ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কমিটির সভাপতি নির্বাচন, সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন নেতা-কর্মী।
নবগঠিত যুবলীগ কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক পদে একজনের নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এক নেতা।
অন্যদিকে, ছাত্রদল থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে যুবলীগের সহসভাপতির পদ পাওয়ায় স্বপন গোলদার ওরফে গোল্ডেনকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কমিটি পুনর্গঠন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন নেতা-কর্মীরা।
গত ১৬ অক্টোবর ফরিদপুর জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জিয়াউল হাসান মিঠু ও যুগ্ম আহ্বায়ক খান মো. শাহ সুলতান রাহাতের স্বাক্ষরে কমিটিটি অনুমোদন পায়। এতে সভাপতি করা হয়েছে মো. গোলজার হোসেনকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে দেবাশীষ মজুমদার নয়নকে।
কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে নাম রয়েছে এস এম মঞ্জুরুল ইসলামের। তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়ন শাখার সভাপতি। কমিটিতে নিজের নাম অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে সালথা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। মঞ্জুরুলের দাবি, যুবলীগের এই কমিটির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
কমিটির পাঁচ নম্বর সহসভাপতি করা হয়েছে স্বপন গোলদার ওরফে গোল্ডেনকে। জানা গেছে, তিনি আগে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের উত্তরা পশ্চিম থানা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পেজে ছাত্রদল থেকে পদত্যাগের একটি চিঠি প্রকাশ করেন তিনি। এর কয়েক দিনের মধ্যেই যুবলীগের কমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সামনে আসায় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।
স্বপন গোলদার বলেন, ৫ আগস্টের পর দলীয় নেতা-কর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কৌশলগত কারণে তিনি ছাত্রদলের কমিটিতে যুক্ত হয়েছিলেন। বর্তমানে পরিস্থিতি অনুকূলে আসায় প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করতে চান তিনি। এ কারণেই তাঁকে যুবলীগের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি করেন স্বপন।
তবে স্বপন গোলদারের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফরিদপুর জেলা যুবলীগের সদস্য শওকত হোসেন মুকুল। তিনি বলেন, স্বপন গোলদার গোল্ডেন নামে কাউকে আগে যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে দেখেননি। স্বপনের বাড়ি সালথার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া গ্রামে এবং তাঁর বাবার নাম আলতাব হোসেন বলে শুনেছেন জানিয়ে মুকুল বলেন, ছাত্রদল থেকে পদত্যাগের চিঠির একটি স্ক্রিনশটও তিনি পেয়েছেন। তবে স্বপনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন মুকুল। তাঁর অভিযোগ, বিশেষ কোনো ব্যক্তির ইশারা ও প্ররোচনায় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সালথার আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট অনেক পরিবার এবং দীর্ঘদিনের নেতা-কর্মীদের বড় একটি অংশ কমিটিতে স্থান পাননি বলেও দাবি করেন তিনি। দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও অনেকে যথাযথ মূল্যায়ন পাননি বলে তাঁর অভিযোগ।
কমিটির সভাপতি মো. গোলজার হোসেনকে নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সালথার রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে তাঁর দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ মজুমদার নয়ন মাঠপর্যায়ের কর্মী হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কমিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। সালথা উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাজমুল মাতুব্বর এক ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হলে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং ত্যাগী কর্মীদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে। তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানান।
যুবলীগ নেতা রাজু আহমেদ উজ্জ্বলও ফেসবুক পোস্টে সভাপতি পদে গোলজার হোসেনের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান তিনি। একই সঙ্গে পদ বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের দাবি জানান। পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সালথা উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল জবিউল্লাহ ফেসবুক পোস্টে জেলা যুবলীগের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দলের দুঃসময়ে সাহসী কর্মীদের বাদ দিয়ে ‘পকেট কমিটি’ গঠনের অভিযোগ তুলে তিনি এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
অন্যদিকে, কমিটি ঘোষণার এক দিন পর ফেসবুক লাইভে এসে নবগঠিত উপজেলা যুবলীগের সদস্যপদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের ঘোষণা দেন নিশান খান।
২০২৩ সালের উপজেলা যুবলীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন শেখ সুমন। নতুন কমিটি নিয়ে ফেসবুক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, মো. গোলজার হোসেন কে এবং কীভাবে তাঁকে উপজেলা যুবলীগের সভাপতি করা হলো। একই পোস্টে তিনি দাবি করেন, ৭১ সদস্যের কমিটির ৫০ জনকে তিনি চেনেন না। পাশাপাশি সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার দুই নেতার বিরুদ্ধে কোটি টাকার বিনিময়ে কমিটি দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি।
উপজেলা যুবলীগের নেতা বাকী বিল্লাহও ফেসবুক পোস্টে জেলা যুবলীগের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে তিনি ফরিদপুর জেলা যুবলীগকে বয়কটের ঘোষণা দেন এবং নতুন কমিটির সমালোচনা করেন।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে সালথা উপজেলা যুবলীগের ৭১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিতে খায়রুজ্জামান বাবু সভাপতি এবং বেলায়েত হোসেন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও দীর্ঘদিন নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়নি।
এরপর ২০২৩ সালের ৩ আগস্ট সালথা জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে উপজেলা যুবলীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই সম্মেলনে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। সে সময় সভাপতি পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন সভাপতি খায়রুজ্জামান বাবু, সহসভাপতি খন্দকার সাজ্জাদ হোসেন এবং তৎকালীন সংসদ সদস্য শাহদাব আকবর চৌধুরী লাবুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যুবলীগ কর্মী মো. সোহেল রানা ফরহাদ ও মনির মোল্যা।
সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি দেবাশীষ মজুমদার নয়ন, তৎকালীন সালথা উপজেলা যুবলীগ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. বাদল হোসেন, যুবলীগ কর্মী সোহেল মাহমুদ, সায়েম হোসেন টিটন, শেখ সুমন ও বাকী বিল্লাহ। সম্মেলনের পরও কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়।
নবগঠিত কমিটিতে সহসভাপতি হিসেবে রয়েছেন মো. নুরুল হোসেন মেম্বার, মনির হোসেন দিপু, রাসেল হোসেন, লিমন মোল্যা, স্বপন গোলদার গোল্ডেন, মেহেদী হাসান রানা ও মো. ফুয়াদুজ্জামান। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে হাবিবুর রহমান, শাওন কাজী ও মো. ইব্রাহিম মোল্যাকে। সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন নিবির কুমার সরকার, মো. আবু বকর মাতুব্বার, মো. ইয়ার আলী, মো. ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও তানভীর আহম্মেদ। এ ছাড়া বিভিন্ন সম্পাদকীয় পদে আরও কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পর নতুন কমিটি অনুমোদন পেলেও নেতৃত্ব নির্বাচন, সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নিয়ে ওঠা প্রশ্নে বিতর্ক থামছে না।
নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ মজুমদার নয়ন বলেন, যেহেতু কমিটিটি জেলা যুবলীগের পক্ষ থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তাই এ কমিটি নিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো মন্তব্য করতে চান না।
সালথা উপজেলা যুবলীগের নবগঠিত কমিটির সভাপতি মো. গোলজার হোসেন বলেন, “আমি দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দলীয় কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ফরিদপুর জেলা যুবলীগের নেতৃবৃন্দ আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন।”
নিজের ও কমিটির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সালথায় যুবলীগের এ যাবৎকালের অন্যতম সেরা কমিটি গঠন করা হয়েছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চান তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলা বা হামলার শিকার হয়েছেন কি না, জানতে চাইলে গোলজার হোসেন বলেন, “৫ আগস্টের পর আমি কোনো মামলা বা হামলার শিকার হইনি।”
নবগঠিত কমিটির কয়েকজন সদস্যের পদত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। এ নিয়ে তাঁর কিছুই বলার নেই।
ফরিদপুর জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খান মো. শাহ সুলতান রাহাত বলেন, সালথা উপজেলা যুবলীগের কমিটির তালিকাটি স্থানীয়ভাবে পাঠানো হয়েছিল। সেই তালিকায় তাঁরা স্বাক্ষর করেছেন। কমিটি গঠন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ভালো বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুর জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জিয়াউল হাসান মিঠুর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এন/ এস
বাংলাদেশ সময়: ১৮:৩৭:১৪ ৩ বার পঠিত | ● কমিটি পুনর্গঠনের দাবি ● ফরিদপুর জেলা যুবলীগ ● মো. গোলজার হোসেন ● সালথা উপজেলা যুবলীগ কমিটি