ঢাকা    শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
প্রচ্ছদ » রংপুর » ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন ডিমলার শেফালী

৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন ডিমলার শেফালী


বাসু দেব রায়,ডিমলা (নীলফামারী)
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬


৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন ডিমলার শেফালী

নীলফামারী: জীবনের ৫২টি বসন্ত পেরিয়ে যখন অনেকেই শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে দেন, তখন নতুন করে বই হাতে তুলে নিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকার শেফালী বেগম। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি, পারিবারিক দায়িত্ব ও জীবনের নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। তাঁর এই সাফল্য যেমন অভাবনীয়, তেমনি তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য এখন উচ্চশিক্ষা অর্জন করা।

শেফালী বেগমের এই অর্জন কেবল একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়, এটি দীর্ঘদিনের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ, আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, যদি থাকে শেখার অদম্য আগ্রহ, তবে শিক্ষার পথে বয়স কখনো বাধা হতে পারে না।

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী শেফালীর এ সাফল্যে আনন্দিত তাঁর পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী। বিশেষ করে পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা আর্থিক সংকটের কারণে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া মানুষের কাছে তিনি এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখার এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

জানা যায়, শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা বেশ সম্ভাবনাময় ছিল। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর পারিবারিক সংকটের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষাগুলোতে মেধার স্বাক্ষর রাখা এই শিক্ষার্থীকে একসময় বই-খাতার পরিবর্তে কাঁধে তুলে নিতে হয় সংসারের দায়িত্ব। সময়ের সঙ্গে স্বামী-সন্তান, পরিবার ও জীবনের নানা বাস্তবতায় নিজের শিক্ষার স্বপ্ন আড়ালে চলে যায়। তবে শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনোই পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

দীর্ঘ বিরতির পর স্বামী ও তিন সন্তানের উৎসাহ ও সহযোগিতায় আবারও পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। বয়সের ব্যবধান, সংসারের ব্যস্ততা এবং দীর্ঘদিনের শিক্ষাবিরতি-সবকিছু উপেক্ষা করে নিয়মিত পড়াশোনায় মনোযোগী হন। অবশেষে তাঁর সেই অধ্যবসায়ের স্বীকৃতি মেলে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে।

শেফালী বেগমের ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। অন্যদিকে, তার মেয়ে মাখসূরা খানম নাজমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়ন করছেন। সন্তানদের শিক্ষাজীবন ও অর্জনেও শেফালী বেগমের ত্যাগ ও অনুপ্রেরণার বড় ভূমিকা রয়েছে।

গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রভাষক আব্দুল মান্নান বলেন, শেফালী বেগমের এই সাফল্য সমাজের জন্য একটি শক্তিশালী ইতিবাচক বার্তা। নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল থাকলে জীবনের যেকোনো বয়সেই সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।

নিজের সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপুত শেফালী বেগম বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর সংসারের নানা পরিস্থিতির কারণে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বরাবরই ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়া চালিয়ে যেতে পারিনি। পরবর্তী সময়ে আমার ভাগ্নি ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া দেখে নিজের মধ্যেও আবার পড়াশোনা করার ইচ্ছা জাগে। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় নতুন করে পড়াশোনা শুরু করি। আজ জিপিএ ৪.২১ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।

তাঁর স্বামী মকছেদুল আলম বলেন, শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে-এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তাঁর এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তাঁর পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।

শেফালী বেগমের নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজের চোখেও দাদি এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক। সে বলে, আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন- এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।

দীর্ঘ শিক্ষাবিরতির পরও শেফালী বেগমের এই অর্জন প্রমাণ করে, দৃঢ় সংকল্প, পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতা থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকেই নতুন করে পথচলা শুরু করা সম্ভব। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়-পরিস্থিতি হয়তো স্বপ্নের পথ সাময়িকভাবে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে সেই স্বপ্ন ঠিকই বাস্তবে রূপ নেয়।

তারিখঃ- ৩১/১০/২০২৬

বাসুদেব রায়

ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি ।

মোবা- ০১৭২৫১৯২৭৪৭

বাংলাদেশ সময়: ২১:৪২:১৮   ৬ বার পঠিত  | ●   ●