ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
কুড়িগ্রাম:টিফিনের টাকা জমিয়ে শুরু করা আরজুমা”স কালেকশন আজ একটি সফল হস্ত শিল্প। দুই বান্ধবির অক্লান্তিক প্রচেষ্টা আর অদম্য ইচ্ছা শক্তিতে গড়ে উঠা প্রতিষ্টানটি আজ জিরো থেকে হিরো হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলছে। চাকুরী না করে নিজে এবং নারীদের কর্ম সংস্থান করার চিন্তা থেকে ৪ বছর আগে অনার্সে পড়া শুনার পাশা পাশি রংপুর শহরে শুরু করা প্রতিষ্টানটি,সুদুর পল্লীর নিজ গ্রামে একটি টিনসেড ঘরে স্থানন্তরিত ফ্যাক্টরীতে চলছে বর্তমান তাদের কার্যক্রম।
কাপড়ের তৈরী নক্রি ফুল তোলা পুশি কাটার, লেচ,সোফার কভার, কুশন কাভার,পর্দ্দাসহ ঘর সাজানো বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিষ,অনলাইনে অর্ডারের মাধ্যমে বেচা বিক্রি করে প্রতিষ্টানটি রীতিমত সারা ফেলে দিয়েছে। চাহিদাও প্রচুর প্রতি মাসে ৭/৮ লাখ টাকা পন্য বিক্রি করছেন। বাজারে ও প্রচুর চাহিদা। কিন্ত সে চাহিদা পুরন করার সক্ষমতা নাই বলে বাজারের অর্ডার নেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে কারখানায় বেতন ভুক্ত নারী পুরুষ ১৫ জন শ্রমিক কাজ করছে।
সেই সাথে ৩ শত নারী ও স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজ বাড়ীতে বসে এ কাজ করছে। ইতিমধ্যে নিজ এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্টানটির নাম ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকার মানুষের মুখে মুখে প্রতিষ্টানের ও দুই উদ্দ্যোগতার নাম। তাদের স্বপ্ন অনেক বড়। বড় পরিসরে একটি ফ্যাক্টরী করে হাজারো নারীর কর্ম সংস্থান করা।
নিজ গ্রামসহ উপজেলার অসহায় ও মধ্যবৃত্ত নারীদের কর্ম সংস্থানের মাধ্যমে অভাবী সংসারে স্বচ্ছলতা ও তাদের সন্তানদের লেখা পড়া নিশ্চিত করে অভাব মুক্ত আধুনিকও নারী পুরুষ বৈষম্যহীন গ্রাম প্রতিষ্টা করাই তাদেও লক্ষ। গ্রামের সব ছেলে মেয়েরা সবাই লেখা পড়া করবে। এই প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলছেন উচ্চ শিক্ষিত দুই বান্ধবী নারী উদ্দ্যোগতা আরজুমা সরদার ও জেবা আনিকা। কিন্ত আর্থিক সংকট তাদের স্বপ্নে বড় বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। এ স্বপ্ন পুরন না করে বিয়েও করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন এ দুই নারী উদ্দ্যোগতা । তাদের এ স্বপ্ন কি পুরন হবে না। আর্থিক প্রতিষ্টান গুলো কি তাদের স্বপ্ন পুরনে পাশে দাড়াবে না। নাকি তাদের এ স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেনী ঠাকুর বাড়ী গ্রামে সরদার পরিবারে জন্ম। বাবা আজাহারুল সরদার, ৩ ভাইয়ের এক বোন আনজুমা সরদার। লেখা পড়ায় ছোট বেলা থেকে ভাল। এইচ এস সি পাশ করে ২০১৪ সালে রংপুর কার্মাইকেল কলেজে ভর্ত্তি হয়ে পরিচয় হয় বান্ধবী জেবা আনিকার সাথে। পাশ্ববর্তী হাতিয়া অনন্তপুর গ্রামে জেবা আনিকার বাড়ী। বাবা মো,হায়দার আলী। একই এলাকার হওয়ায় তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় গভীর। একে ম্যাচে থাকেন। এক সাথে চলাফেরা উঠা বসা পড়া শুনা সব যেন একাত্মা। অনেকে তাদের এ বন্ধুত্ব দেখে হিংসা করে টোল করত। কিন্তু তাদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়নি বরং গভীর ও মজবুত হয়েছে। দুজনে চিন্তা করে লেখা পড়ার পাশা পাশি কিছু একটা করতে হবে। কিন্ত টাকা পাবে কোথায় তখন সিদ্ধান্ত নেয় টিফিনের টাকা না খেয়ে জমানোর। এর মধ্যে শুরু হয় করোনা। কলেজে লেখা পড়া সাময়িক বন্ধ ঘোষনা করে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
২০২০ সালে দুই বান্ধবী চিন্তা করে বসে না থেকে সামান্য জমানো টাকা দিয়ে রংপুরের হাড়ি ভাংঙ্গা আম অন লাইনে বিক্রি শুরু করেন। দু মাসে ভাল লাভ হয়। মৌসুম শেষ ব্যবসাও বন্ধ। তখন আবার সিদ্ধান্ত নেয় অন লাইনে হস্ত শিল্পের কাজ শেখার। যোগাযোগ করে হস্ত শিল্পের কাজ শেখেন। হাতে অল্প অল্প করে কাজ করে অন লাইনে পেজ খুলে অর্ডার আহবান করলে কিছু দিনের মধ্যে অর্ডার শুরু হয়ে যায়। ধীরে ধীরে অর্ডার বাড়তে থাকে।
তখন কলেজের পাশে লালবাগ বাজারে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে একটি মেশিন দিয়ে বিভিন্ন রকমের হস্ত শিল্প পন্য তৈরী ও অন লাইনে বিক্রি করেন। ২০২৪ সালে মাষ্টার্স পাশ করে। দুই বান্ধবী একমত হন চাকুরী করবেন না। তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হবেন এবং গ্রামের অসহায় নারীদের কর্ম সংস্থান করবেন। তাই হস্ত শিল্পটা বড় পরিসরে করার চিন্তা ভাবনা নিয়ে উলিপুরে বাবার গ্রামের বাড়ীতে পড়ে থাকা মিল ঘরে আরো কয়েকটি মেশিন কিনে একটু বড় পরিসরে কাজ শুরু করেন।
গ্রামের কয়েকজন নারীকে প্রশিক্ষন দিয়ে এবং রংপুর থেকে একজন এম্বোটারী প্রশিক্ষক নিয়োগ দিয়ে, ফুল তোলা দরজা জানালার পর্দ্দা, সোফার কভার,কুশন কভার, বেডসিট ,পুশি কাটার,লেচ কাটারসহ ঘর সাজানোর সব কাপড়ের পন্য তৈরী শরু করেন। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গ্রামের ৩ শত নারীকে প্রশিক্ষন দিয়ে তাদের কাজ দেন। তারা বাড়ীতে বসে সংসারের কাজের ফাকে ফাকে এ কাজ করেন। এ ভাবে কারখানার উৎপাদন বাড়ে বিক্রি ও বাড়তে থাকে। বর্তমানে কারখানায় ১ জন নারী, ১জন পুরুষ সুপারভাইজার ও ১জন এমেব্রাটারী প্রশিক্ষকসহ ১৫ জন নারী পুরুষ শ্রমিক কাজ করছে। শ্রমিকদের বেতন ৭ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। যারা বাড়ীতে কাজ করে তারা পান প্রতি পিচ ৭০/৮০ থেকে ২ শত টাকা। আমরা দুই উদ্দ্যোগতাও ওদের সাথে কাজ করি।
আরজুমা সরদার জানান,এখানে আমরা মালিক,শ্রমিক ভেদা ভেদ নাই। এখানে সবাই মালিক, সবাই শ্রমিক। এই মানুষিকতা নিয়ে সবাই মিলে মিশে কাজ করি। কাজের শুরুতে খুব একটা লাভ হতো না। বর্তমানে ভাল লাভ হচ্ছে। শ্রমিকদের প্রতি মাসে বেতন ও দিতে পাচ্ছি। প্রতি মাসে ৭/৮ লাখ টাকা সেল হচ্ছে। বছরে প্রায় কোটী টাকার পন্য অন লাইনে বিক্রি করছি। জিরো থেকে শুরু করে বর্তমানে ফ্যাক্টরীর সম্পদের পরিমান প্রায় ৫০/৬০ লাখ টাকা। খোলা বাজারের ব্যবসায়ীরা অনেকে পন্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করছেন। ব্যবসায়ীদের পন্য দিতে হলে ফ্যাক্টরী আরো বড় করতে হবে।
সে চিন্তা ভাবনাও পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্ত বড় বাঁধা হচ্ছে আর্থিক সংকট ও বিদ্যুৎ সংকট। আর্থিক সহায়তার জন্য, ডাস বাংলা ব্যাংক, কর্ম সংস্থান ব্যাংকসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্টানের সাথে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু জামানত ছাড়া কেউ লোন দিতে চায় না। প্রশিক্ষন কেন্দ্রসহ ভবিষতে ১ হাজার নারীর কর্ম সংস্থান করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্থবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে করবেন না বলে পন করেছেন বলে জানান।
নারী শ্রমিক রিনা বেগম বলেন,আগে অভাবী সংসারে খালি ঝগড়া হতো। এখন আমি ৭ হাজার টাকা পাই। স্বামী স্ত্রী দুজনে আয় করি সংসারে সুখ শান্তি আছে। রিনা আক্তারের মত, শ্রমিক মিতু আক্তার, শারমিন আক্তার, লিমা বেগম, তাইরিন বেগম ও রিমা আক্তার জানালেন, এখানে কাজ করে তাদের অভাব মোচনের কথা। ধামশ্রেনী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পল্লবী আক্তার বলেন, লেখা পড়ার ফাকে ফাকে এ কাজ করে মাসে ২/৩ হাজার টাকা আয় করি। আমার লেখা পড়ার খরচ ও সংসারে উপকারে লাগে। অভাবের সংসার এ কাজটা করে বাড়তি আয় করছি বলে লেখা পড়া করতে পারছি না হলে বাবা মা বিয়ে দিতো। পল্লবীর মত এ কাজ করছেন শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার, ঝরনা আক্তার, বিউটি বেগম ও তাপসীসহ অনেক শিক্ষার্থী এ কাজ করছে বলে জানান।
ধামশ্রেনী ইউনিয়নের গ্রাম গুলো ঘুরে দেখা যায়,বাড়ীর বারান্দা,উঠানে ও ঘরের কোণে বসে হস্ত শিল্পের কাজ করছে নারীরা। তারা জানালেন, সংসারের কাজ সেরে বাকী সময়টুকুতে তারা এ কাজ করেন। এতে তাদের বাড়তি আয় হচ্ছে। বাড়তি আয়ের টাকা দিয়ে ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া ও সংসারের অভাব দুর করছি।
গ্রামের বাসিন্দা অবঃ সরকারী কর্মকর্তা মো. শাহের আলী বলেন,উচ্চ শিক্ষিত দুই নারী উদ্দ্যোগতার হস্ত শিল্প প্রতিষ্টা করে গ্রামের অনেক পরিবারের নারীদের কর্ম সংস্থান করেছেন। এমন একটি প্রতিষ্টান করে গ্রামের মানুষের মাথার মুকুট হিসাবে সম্মান করছেন। প্রতিষ্টানটি সরকারী পৃষ্ট পোষকতা পেলে অনেক বড় প্রতিষ্টানে পরিনত হবে। কর্ম সংস্খান হবে হাজারো নারীর।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প করপোরেশন(বিসিক)কুড়িগ্রাম শাখার উপব্যবস্থাপক শাহ মো. জোনায়েদ বলেন,আমি ওই নারী উদ্দ্যোগতাদের ফ্যাক্টরী পরিদর্শন করে আমাদের পন্য মেলায়, তাদের পন্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা,শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষন ও আর্থিক সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো.লুৎফর রহমান বলেন,অতি দ্রুত ফ্যাক্টরী সরেজমিন দেখে কি ব্যবস্থা করা যায় সেটা করব। সেই সাথে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা যায় কিনা দেখব বলে জানান তিনি।
এন/এস
বাংলাদেশ সময়: ২২:২৬:১৬ ৬ বার পঠিত | ● উদ্যোক্তা ● উলিপুর ● নারী ● সাফল্য