![]()
কুড়িগ্রাম: বিগত সরকারের শেষ সময়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতার পরিচয়ে ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে কুড়িগ্রাম জেলা সদরের সাব রেজিষ্টার হওয়া সত্ত্বেও একাধিক উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণকারী ও রাজারহাটের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সাব- রেজিষ্টার নাবিব আফতাবের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ফি এর চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় সহ ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
যোগসাজস করে হাতিয়ে নেয়া অতিরিক্ত টাকা ফেরত চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছেন এক ভূক্তভোগী। এরআগে উক্ত সাব-রেজিষ্টার অন্য এক দলিল লেখকের সাথে যোগসাজস করে একজনের জমি অন্য জনের নামে রেজিষ্ট্রি করারও অভিযোগও তদনÍাধীন।
জানাযায়,জেলা সদরের সাব-রেজিস্টাররা অন্য উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রাপ্তির নিয়ম না থাকলেও পতিত সরকারের শেষের দিকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতার পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে কুড়িগ্রাম সদর সাব- রেজিষ্টার নাবিব আফতাব একাধিক উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহন করেন। ২০২৪ সনে জেলার চিলমারী উপজেলা সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকাকালীন সাবেক ছাত্রলীগের নেতা পরিচয়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তিনি বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।
চিলমারী উপজেলার একাধিক দলিল লেখক বলেন,তিনি টাকাও নিতেন,বিভিন্ন ভাবে জনগণকে হয়রানীও করতেন। একারনে দলিল লেখকরাও তার উপর অসন্তুষ্ট ছিল। পরে তাকে কুড়িগ্রাম সদরের পাশাপাশি রাজারহাট উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়।
রাজারহাটে যোগদানের পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন নাবিব আফতাব। বিশেষ করে ভ্রম সংশোধী, চুক্তিপত্র,দানপত্র ও বন্ঠন নামায় সরকার নির্ধারিত ফি এর চেয়ে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০গুণ পর্যন্ত টাকা গ্রহণ করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। সরকার পতন হলেও তার দাপ্তরিক কক্ষে মুজিব শতবর্ষের কর্মসূচি পালনের বঙ্গবন্ধুর ছবিও তিনি সরাননি। সাংবাদিকরা যেন তার সাথে যোগাযোগ করতে না পারেন সেজন্য সরকারি তথ্য বাতায়নে নেই তার যোগদানের কোন তথ্য। তার মোবাইল নম্বর না দিতেও নির্দেশনা রয়েছে কর্মচারীদের উপর।
রাজারহাট উপজেলা সদরের চাকির পশার তালুক গ্রামের আবুল কাশেম অভিযোগ করেন,আমার সমন্ধি (স্ত্রীর বড় ভাই) উপজেলার ফুলখা গ্রামের হারুণ-অর রশিদ গত ২২জানুয়ারী সকালে তার প্রতিবেশি জাহাঙ্গীর আলমসহ আমার নিকট আসেন। আমি তার দুটি সংশোধনী দলিলের বিষয়ে আলোচনা করার জন্য তাদেরকে নিয়ে সাব-রেজিষ্টার অফিসে যাই। এসময় দলিল লেখক মোজাম্মেল হক সাব-রেজিষ্টার নাবিব আফতাবের খাস কামরায় নিয়ে যান। সাব-রেজিষ্টার আমাদেরকে দলিল লেখক মোজাম্মেলের সাথে কথা বলে কাজ করতে বলেন। আমরা তার খাস কামরা (বিশেষ কক্ষ) থেকে বেড়িয়ে আসি।
অল্প কিছুক্ষণ পর মোজাম্মেল সাব-রেজিষ্টারের কক্ষ থেকে বেড়িয়ে এসে আমাদেরকে জানান স্যার ২টি সংশোধনী দলিল পার করবেন না, নতুন করে কবলা দলিল করতে বলেন। নতুন কবলা দলিলের খরচ ১লক্ষ ৬০হাজার টাকা লাগবে বলে জানান। আমাদের এত টাকা না থাকায় এবং নিয়ম অনুযায়ী ভ্রম সংশোধনী দলিল করা যাবে বললে,পরোক্ষনে দলিল লেখক মোজাম্মেল বলেন করা যাবে,তবে সাব-রেজিষ্টার স্যারকে ৫০হাজার এবং ভ্রম সংশোধনী দলিলের স্ট্যাম্প,ব্যাংক ড্রাফট,দলিল লেখক ফি বাবদ ২০হাজার টাকা সহ সর্বমোট ৭০হাজার টাকা লাগবে।
পরে আমরা বাধ্য হয়ে উক্ত সাব-রেজিষ্টার ও দলিল লেখকের দাবীকৃত ৭০হাজার টাকা দিয়ে ভ্রম সংশোধনী দলিল করে নিতে রাজী হই এবং দলিল করে নেই। পরে আমি জানতে পারি এধরনের ভ্রম সংশোধনী দলিল করতে প্রতিটিতে দলিল লেখক সহ সর্বোচ্চ খরচ দুই হাজার টাকা লাগে। এছাড়া ভ্রম সংশোধনী দলিলে নতুন কোন ব্যাংক ড্রাফটের প্রয়োজন হয় না। অথচ সাব-রেজিষ্টারের সাথে যোগসাজস করে প্রতারনার মাধ্যমে দলিল লেখক মোজাম্মেল হক আমাদের ভূল বুঝিয়ে দু’টি ভ্রম সংশোধনী দলিলে ৭০হাজার টাকা নিয়েছেন। আমি অতিরিক্ত ৬৬হাজার টাকা ফেরত সহ উৎকোচ বাণিজ্যে জড়িত সাব-রেজিষ্টার ও দলিল লেখকের বিচারের দাবিতে জেলা রেজিষ্টার সহ বিভিন্ন দপ্তরে
অভিযোগ করেছি।
অপরদিকে উপজেলার চাকিরপশার পাঠক গ্রামের বাসিন্দা ও রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহকারি অধ্যাপক স্বপন কুমার অভিযোগ করেন,গত বছরের ২অক্টোবর একই গ্রামের সুবোধ চন্দ্র ও সুধাংশু চন্দ্র ভূয়া বিআরএস খতিয়ান তৈরি করে সাব-রেজিষ্টার
নাবিব আফতার ও দলিল লেখক সামিদুল হক দুলুর সাথে যোগসাজস করে আমার মালিকানাধীন ১২শতক জমি গ্রামের আলম মিয়ার নিকট ৩০৭৯নম্বর কবলা দলিলে বিক্রি করেন। পরে আমি জানতে পেরে ২নভেম্বর কুড়িগ্রাম জেলা রেজিষ্টারের নিকট অভিযোগ করি।
জেলা রেজিষ্টার মোস্তাফিজ আহমেদ অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলার ভূরুঙ্গামারী সাব-রেজিষ্টার মাহফুজুর রহমানকে তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত করেন। এরপ্রেক্ষিতে গত ১৫জানুয়ারী জেলা রেজিষ্টার তার অফিস আদেশে শুধুমাত্র দলিল লেখক সামিদুল হক দুলুর দলিল লেখক সনদ সাময়িক ভাবে স্থগিত করে ৫কর্ম দিবসের মধ্যে সুস্পষ্ট লিখিত ব্যাখ্যা প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করলেও সাব-রেজিষ্টার নাবিব আফতাবের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এমনকি দলিল লেখককে শোকজের পর আর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করাও হয়নি। আমি জড়িত সাব-রেজিষ্টার ও দলিল লেখকের বিচার চাই। এমনি ভূরি ভূরি অভিযোগ এখন রাজারহাটের সাব- রেজিষ্টার নাবিব আফতাবের বিরুদ্ধে।
এবিষয়ে দলিল লেখক মোজাম্মেল হক জানান ,৩৯ টি সংশোনী দলিলে সত্তুর হাজার টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করলেও সাবরেজিস্টারকে কত দিয়েছেন তা বলতে রাজি হননি।
সাব-রেজিষ্টার নাবিব আফতাব বলেন,’আমার নাম ভাঙিয়ে দলিল লেখকরা কেউ টাকা নিয়েছেন। আমি এর সাথে জড়িত নই।’
এ বিষয়ে নবনিযুক্ত জেলা রেজিষ্টার মোঃ রুহুল কুদ্দুছ বলেন,’আমি নতুন দায়িত্বে পেয়েছি। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
আর/ এন
বাংলাদেশ সময়: ১৯:৪৯:৪৭ ১৩৭ বার পঠিত | ● রাজারহাট ● সাব রেজিষ্টার