ঢাকা    বুধবার, ২০ মে ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫
প্রচ্ছদ » ঢাকা » দোহারে কৃষি জমির মাটি পুড়ছে ইটভাটায়

দোহারে কৃষি জমির মাটি পুড়ছে ইটভাটায়


মাহবুবুর রহমান টিপু, ( দোহার )
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ মার্চ ২০২৫


 

দোহারে কৃষি জমির মাটি পুড়ছে ইটভাটায়

ঢাকা: দোহার উপজেলার কৃষি জমির টপ সয়েল পুড়ছে ইটভাটায়। দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার সিমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ২২ টি ইটভাটা সবগুলোই কৃষি জমি দখল করে গড়ে উঠছে। আর এই কৃষি জমির টপ সয়েল পুড়িয়েই বানানো হচ্ছে ইট।নিয়ম অনুসারে অধিকাংশ ইটভাটার হাল সমূহের নেই ট্রেড লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। অপরদিকে উটভাটার কারনে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে এবং ভাটার আগ্রাসনে দিন দিন কমে যাচ্ছে ফসলি জমি, ফসল ফলনে উৎপাদন কমছে দিনদিন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ থাকলেও রহস্যজনক কারণে নিরব সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না ইটভাটার মালিকরা, কৃষিজমির আকার পরিবর্তন করে মাটি কেটে মাহেন্দ্র নামক ট্রাকে ভরাট করে পরিবহন করা হচ্ছে ইট ভাটায়। আর কৃষি জমি থেকে মাটি সংগ্রহের পর তা অবাধে পরিবহনে জন্য মাহেন্দ্র নামক দানব ট্রাকের উৎপাতে প্রতিদিনই ঘটছে নানা দূর্ঘটনা। এছাড়াও সরকারে অর্থায়নে গড়ে উঠা সড়কগুলি ভেঙ্গে খানাখন্দকে পরিনত হয়েছে। স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন,পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন একেবারেই নিবর ভূমিকা পালন করছে। কোন প্রকার প্রশাসনের নজরদারি না থাকায়, নিয়ম নীতির তোয়াক্কাই মানছেন না এসব ইটভাটা।

জানা গেছে, দোহার উপজেলা ও তার সিমান্তবর্তী এলাকায় প্রায় ২২টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার সবগুলোই স্থাপন করা হয়েছে ফসলি জমি বা জনবসতি এলাকার পাশ ঘেঁষে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা আছে কৃষিজমিতে কোনো ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। আইনের আরও উল্লেখ রয়েছে নির্ধারিত সীমারেখার (ফসলি জমি) এক কিলোমিটারের মধ্যেও কোনো ইটভাটা করা যাবে না। অপরদিকে আদালতের আদেশ অমান্য করে অবৈধ ইটভাটা পরিচালনা করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দারা জানান ইটভাটা মালিকরা স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জোরপূর্বক রাতের আধারে তাদের কৃষি জমি থেকে মাটি কেটে নিচ্ছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার ইউসুফপুর চক,রসুলপুর চক,সাহেবখালী চকে,সুতারপাড়া মিজান নগর, ডাইয়ারকুম- আলআমিন বাজার পদ্মা পাইপাস সড়ক এলাকায়, মৌড়া-ধীৎপুর,হাসির মোড়, সাইনপুকুর তদন্ত কেন্দ্রের আওতাধীন ও মেঘুলা ভূমি কার্যালয়ের আওতাধীন শিমুলিয়া-জালালপুর আড়িয়ল বিলের কৃষি জমির টপ সয়েল, জালালপুর-টিকরপুর পদ্মা বাইপাশ সড়কের পাড়ে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কৃষি জমি পরিবর্তন করে দিঘী খনন করায় তিনটি নবনির্মিত সেতু ও সড়কটি ঝুকিঁর মধ্যে রয়েছে। এসব এলাকার কৃষিজমিগুলো থেকে দিনে ও রাতে কাটা হচ্ছে মাটি। এই অঞ্চলের কৃষিজমির মাটি কেটে তা মাহেন্দ্র ও ড্রাম ট্রাকে মাটিভর্তি করে চলাচলের কারনে সড়কগুলি ভেঙ্গে খান-খান। পাশাপাশি রাতভর মাটিবাহী মাহেন্দ্র ও ড্রাম ট্রাকের চলাচলে সড়কগুলি কাদায় মাখামাখি। মাটি ব্যবসায়ীদের রাতের এই বীভৎস কর্মকান্ডে সকালে দোহার ও নবাবগঞ্জের সাধারন মানুষের চলাচলে দূর্ভোগ নেমে আসেন। মটরসাইকেল- বাইসাইকেল চালক ও অটোআরোহীরা শিকার হউন নানা র্দূর্ঘটনার।

কৃষি জমির মাটি কেটে তা পরিবহন করার সময়ে গোটা এলাকার সড়কে কাদাঁ ও আঠালো মাটি পড়ে থাকায় পুরো সড়কটি পিছিল হয়ে পড়ে। ফলে ছোট ও মধ্যম সাইজের কোন যানবাহন ও গাড়ি চলাচল করতে পারে না। এমনকি পায়ে হেটেঁও চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। শুক্রবার সকালে কথা হয় জরুরী চিকিৎসা নিতে আসা এক দম্পত্তির সাথে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গোবিন্দপুর থেকে দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসলে আমাদেও বহন করা অটো গাড়িটি পিছিল সড়কে পড়ে দূর্ঘটনার শিকার হই। এতে আমার স্ত্রীসহ আমি সড়কে পড়ে যাই। সারা শরীর কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়।আমিসহ আমার স্ত্রীর শরীরের কয়েক জায়গায় আঘাত পাই।

নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা ইউনিয়নের আজহার উদ্দিন জানান,বিয়ের দাওয়াত খেতে আমরা ১০/১২ টি মটরসাইকেলযোগে দোহারে রওনা দেই।এ সময়ে গোবিন্দপুর- জালালপুর পদ্মা বাইপাস সড়কে আমাদের মটরসাইকেলের বহর মারাত্বক দূর্ঘটনার স্বীকার হই। বিষয়টি দোহার থানাকে জানিয়েছি। নারিশা ইউনিয়নে মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে বলে অভিযোগ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম খলিল সবুজ। রাতে ঘরে ঘুমাতে গেলে মাটি বহনকারী মাহেন্দ্র ও ড্রাম ট্রাকের হর্ন ও চলাচলের আওয়াজ যন্ত্রনা হয়ে দাড়িয়েছে।

আল-আমিন বাজার এলাকার বাসিন্দা আমিন মুন্সি জানান, পরিবেশ আইন অমান্য করে মাসখানেক ধরে দোহার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনে ও রাতে কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে সরবরাহ করা হচ্ছে ইটভাটায়। এতে যেমন জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্যও।

এ বিষয়ে কৃষিজমি থেকে মাটি কেটে নেওয়ার বিষয়টি শিকার করে পিভিসি ইটভাটার পরিচালক লিটন দেওয়ান বলেন, ‘যাঁরা মাটি বিক্রি করছেন, তাঁরা জেনেশুনেই বিক্রি করছেন। সেই মাটি কিনে নিয়ে উটভাটায় কাচাঁমাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দোহার উপজেলার আড়িয়ল বিলের মাটি ইটভাটার জন্য খুবই উপযোগী মাটি। এই মাটির চাহিদা ইটভাটায় সবচেয়ে বেশী।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা মো.তুরাজ এর সাথে তার মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি ব্যাস্ত আছেন বলে সংযোগটি কেটে দেন। পরে তাকে মোবাইল ফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি পরবর্তীতে কোন উত্তর কিংবা যোগাযোগের চেষ্ঠা করেননি।

এ বিষয়ে দোহার থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.রেজাউল করিম জানান, বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে টপ সয়েল লুটকারীদের আটক করা হবে।

এ বিষয়ে দোহার উপজেলা সহকারি কমিশনার(ভুমি) মো.তাসফিক সিবগাত উল্লাহ বলেন, ফসলি জমির উপরিভাগের ১০ থেকে ১২ ইঞ্চির মধ্যে মাটির জৈব উপাদান থাকে। সেই মাটি কাটা হলে জমির জৈব উপাদান চলে যায়। এতে জমির স্থায়ী ক্ষতি হয়। ফসলি জমির মাটি কাটা তাই বেআইনি ও দন্ডনীয়। গত ১০ দিন আগেও অভিযান চালিয়ে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করেছি।এবার অভিযানে কেউ আটক হলে তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরসহ ও দন্ড প্রদান করা হবে।

এ বিষয়ে দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া তাবাসসুম জানান, অবৈধ ইটভাটা অভিযান চালিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হবে।

এইচ/এল

বাংলাদেশ সময়: ১৮:৪৬:১৩   ৪২২ বার পঠিত  |