ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
প্রচ্ছদ » ঢাকা » জনতার গণপিটুনিতে ইউপি সদস্য নিহত

জনতার গণপিটুনিতে ইউপি সদস্য নিহত


আড়াইহাজার ( নারায়ণগঞ্জ ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫


জনতার গণপিটুনিতে ইউপি সদস্য নিহত

নারায়ণগঞ্জ: আড়াইহাজারে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আগ্নেয়াস্ত্র বের পর স্থানীয় জনতার গণপিটুনিতে পুরস্কার ঘোষিত মাদক কারবারি সোহেল মিয়া (৩৫) ওরফে ফেন্স সোহেল নিহত হয়েছেন। তবে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন আরও কয়েকজন। সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে উপজেলার ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। তবে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ স্বজনদের।

নিহত সোহেল মিয়া ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও বালিয়াপাড়া এলাকার মকবুল হোসেনের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, বালিয়াপাড়া এলাকায় আব্দুল আউয়াল মৌলভী ছেলে সায়েম মিয়া ৮টি দোকার ঘর তৈরি করছে। সোহেল প্রত্যেক দোকানবাবদ এক লাখ টাকা চাঁদা দাবী করে। এ নিয়ে এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর চাঁদা চাইতে গিয়ে এলাকাবাসী ধাওয়া খেয়ে সোহেল ও তার সহযোগিরা পালিয়ে যায়।

সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সোহেল ও তার কয়েকজন সহযোগি নিয়ে সায়েমের বাড়িতে ফের চাঁদা চাইতে যায়। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে সোহেল কোমর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বের করে। পাশের কয়েকজন নারী এ দৃশ্য দেখে দ্রুত মসজিদের ইমামকে অবহিত করে। মসজিদের ইমাম মাইকে সোহেল মেম্বার ফের চাঁদা চাইতে এসেছে এ সংবাদ ঘোষনা দিলে আশপাশের ৬০০/৭০০ লোক একত্রিত হয়ে তাকে ঘেরাও করে ফেলে। পরে বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী তাকে গণপিটুনী দেয়। এতে সোহেল ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।
আড়াইহাজার থানার ওসি খন্দকার নাসির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ মর্গে প্রেরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেখান থেকে সোহেলের কাছে থাকা অস্ত্রটি জব্দ করা হয়। সোহেল ও তার সহযোগিদের বিরুদ্ধে আড়াইহাজার থানাসহ বিভিন্ন থানায় মাদক, মারামারিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করে ফের মাদক ব্যবসায় জড়ায় সোহেল। এ নিয়ে এলাকায় লোকজন বিক্ষুব্দ ছিলো।

কে এই সোহেল মেম্বার
আড়াইহাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা বালিয়াপাড়া থেকে শুরু করে রূপগঞ্জ হোরগাও-দড়িকান্দি ও সোনারগাঁয়ের পাকুন্ডা মাঝেরচর তালতলা, নয়াপুরসহ নরসিংদী মদনগঞ্জ আঞ্চলিক মহাড়কের এলাকার একচ্ছত্র মাদক সম্্রাজ্ঞী ফেন্সি সোহেলের মা সোনা আক্তার। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের মাদক ব্যবসায়ী ও গদফাদারের তালিকা ১০ নং এ ছিলো ফেন্সি সোহেল আর তার মা ছিলো ১৬ নং তালিকায়। সোহেলের মা বাবাসহ তার চার ভাই এক বোনের গোটা পরিবারই মাদক ব্যবসায় করে।
বিভিন্ন সময় তাদের পরিবারের লোকজন গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন কারাভোগের পর ফের মাদক ব্যবসা ব্যবসা চালু রাখে। ফেনসিডিল ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন বিক্রি করে রাতারাতি অর্থনৈতিকভাবে প্রভাব বাড়তে থাকে।
অবৈধ টাকার নেশায় একে একে পুলিশের পুরস্কার ঘোষিত মাদক ব্যবসায়ী সোহেল, তার ভাই বোবা সামছুল, হাবিব, সাইফুল, বোন মাসুদা, ভগ্নিপতি হাবু এবং সোনা আক্তাররের স্বামী মকবুল হোসেনকেও মাদক ব্যবসায় নিয়ে আসে। এই পরিবারের সকলের বিরুদ্ধে আড়াইহাজার, সোনারগাঁসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মাদক মামলা রয়েছে।

তাদের দেখাদেখি, আশপাশের একই এলাকার রিপন, রাজন, সাদ্দাম, মনির, রোকসানাসহ আরও ১০/১২জনকে দিয়ে মাদক ব্যবসা শুরু করেন। সোহেলের কারণেই বালিয়াপাড়া এলাকাকে মাদকের হটস্পট বলা হয়ে থাকে। গত প্রায় তিন দশকে অবৈধ মাদক ব্যবসা করে তার পরিবারটিই এখন ফুলে ফেঁপে অঢেল সম্পদের মালিক।

মারণ নেশা ইয়াবা’ বিক্রি করে তারা গোলাকান্দাইল আলিশান বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক বাড়ি কিনেছেন। ব্যাংকে আছে তার বিপুল পরিমান টাকা। সর্বশেষ গত ১২ জুন র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-১১ এর সদস্যরা কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার দাউদকান্দি সেতুর টোল প্লাজা এলাকা থেকে এক সহযোগিসহ সোহেলকে গ্রেপ্তার করে।
ওই সময় র‌্যাব-১১ এর স্কোয়াড কমান্ডার (সিপিএসসি) মোঃ শামসুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ফেন্সি সোহেলের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন থানায় সন্ত্রাসী ও মাদক, অপহরণ, চুরি, হত্যা চেষ্টাসহ ১৪ থেকে ১৫টি মামলা রয়েছে।

সোহেল মিয়ার যত অপকর্ম
‘মাদক ব্যবসা করবো না আর মাদক ব্যবসা কাউকে করতে দিব না’ এই প্রচার চালিয়ে ২০২০ সালের ইউপি নির্বাচনে প্রভাব খাটিয়ে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন সোহেল। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সে আরও বেপোরোয়া হয়ে উঠে। ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর রাতে বালিয়াপাড়া দলীয় কার্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের উপর সন্ত্রাসী হামলা হয়। হামলাকারী এলোপাথাড়ি দা দিয়ে কুপিয়ে জখম করার পর দেলোয়ার মারা গেছে ভেবে হামলাকারীরা চলে যায়। দেশ বিদেশে দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে দেলোয়ার অনেকটা পঙ্গুত্ব নিয়ে প্রাণে বেঁচে আছে। এ হামলার জন্য সোহেল মিয়াকে প্রধান আসামী করে হত্যা চেষ্টা থানায় মামলা দায়ের করে আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার। গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে বোল্ট পাল্টে ফেলে ফেন্সী সোহেল।

এর পর হত্যার চেষ্টা মামলার আসামী করার জেরে চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ও তার ভাইদের বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট শেষে আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে। গত সেপ্টেম্বর মাসের ৭ তারিখে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নেরর ভাটি গোবিন্দি এলাকায় ময়লা পানি ব্রহ্মপুত্র নদে নিষ্কাশনের জন্য নির্মাণাধীন পাইপ লাইনের জন্য সোহেল ও তার তার সহযোগি গোলাম রসুল গ্রামবাসীদের কাছে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করে।

এতে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে তাদের ধাওয়া দিয়ে সোহেল মেম্বার ও তার সহযোগিরা পালিয়ে যায়। পর দিন রোববার ৭/৮শ’ গ্রামবাসী দেশিয় অস্ত্রে সজ্জে সজ্জিত হয়ে সোহেল মেম্বারের কদমদী ও বালিয়াপাড়া বাড়িতে, তার সহযোগি গোলাম রসুলের উতরাপুরের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়।

পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার অভিযোগ স্বজনদের
নিহত সোহেলের মরদেহ পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে আড়াইহাজার থানায় আনা হলে স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা যায়। সময়মত পুলিশ না যাওয়া স্বজনরা পুলিশের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিহত সোহেলের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম বাবলী বলেন, ‘ সকাল আটটা থেকে প্রায় তিন ঘন্টা ধরে সোহেলকে বেঁধে পিটিয়েছে। অথচ এই সময়ের মধ্যে পুলিশ যায়নি। পুলিশের কাজতো মানুষকে রক্ষা করা। সে যদি অপরাধী হয় তাকে এভাবে মারতে হবে? দেশে কি কোন আইন কানুন নেই। সোহেলের ১০/১২টি মামলা রয়েছ স্বীকার করে বাবলী বলেন, ‘টাকা দিলেই মামলা করা যায়। মামলা করলে কেউ অপরাধী হয়না। সোহেলে মেয়ে ফেরদৌস ইসলাম শোভা বলেন, ‘জনপ্রিয়তা আছে বলেই আওয়ামী লীগের আমলে আমার বাবা ইউপি মেম্বার হয়েছিলেন। তিনি মাদক ব্যবসা বিরুদ্ধে ছিলেন। আমার বাবাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ব্যপারে থানায় অভিযোগ দিয়েছি।
তবে আড়াইহাজার থানার ওসি খন্দকার নাসির উদ্দিন জানান, ভিকটিমের অভিযোগ সত্য নয়। আমার কাছে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বালিয়াপাড়া থেকে এ ব্যপারে ফোন পাই। ফোন পাওয়ার সাথে সাথেই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠনো হয়েছে। পুলিশ গিয়ে দেখতে পায় সোহেলের মরদেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ মর্গে প্রেরণ করে। সোহেলের বিরুদ্ধে আড়াইহাজার থানাসহ বিভিন্ন থানায় হত্যা, মারামারি,অগ্নিসংযোগ, মাদকসহ ১৩টি মামলা রয়েছে।
থানার ওসি আরও জানান, সোহেলের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম বাবলী বাদী হয়ে অজ্ঞাত ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ এ ব্যপারে তদন্ত শুরু করেছে।

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ১৯:২৩:১৫   ১১৪ বার পঠিত  |