![]()
হবিগঞ্জ: নবীগঞ্জ উপজেলার সর্বত্র বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের জন্য সরকারের বিশেষ বরাদ্দ কৃষি প্রনোদনা বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। ক্ষুব্ধ কৃষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সুত্রে জানাযায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ফসল হানি ঘটেছে ব্যাপক কৃষকের। অনেক কৃষকরা তাদের ব্যাপক ক্ষতির কারনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এর প্রেক্ষিতে সরকার কৃষকদের প্রনোদনার জন্য সারা দেশের ন্যায় নবীগঞ্জ উপজেলায়ও তালিকা তৈরী করেন। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ওই তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে প্রেরন করেন। মন্ত্রনালয় থেকে অনুমোদন হয়ে আসার পর তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের নগদ ৬ হাজার টাকা ও ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হয়।
এতে দেখা যায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের নামের পরিবর্তে সরকারী দলীয় নেতা-কর্মী ও তাদের আত্মীয়, স্বজনের নামে ভরপুর। ফলে উপজেলা ব্যাপী ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ নিন্দার ঝড় উঠেছে। প্রতিবাদে অনেক এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন কৃষি প্রনোদনা বঞ্চিত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা।
স্থানীয় সুত্রে জানাযায়, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত বিশেষ প্রণোদনা মানবিক সহায়তা ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার সব ক’টি ইউনিয়ন ও পৌরএলাকায় জলাবদ্ধতা ও উজানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ প্রথম ধাপে ৬ হাজার কৃষকের নামের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। চূড়ান্ত তালিকায় ১ হাজার ৫৬২ জন কৃষকের নাম স্থান পায়। চূড়ান্ত তালিকায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির যেন শেষ নেই। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকায় স্থান পেয়েছেন সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, তাদের আত্মীয় স্বজন, ব্যবসায়ী, অকৃষক, উদ্যোক্তা, চাকরিজীবীসহ নেতাদের পরিবারের সদস্যরা।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের জাহিদপুর গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক সবুর মিয়া জানান, সদর ইউনিয়নের তালিকায় অন্য ইউনিয়নের ও পৌরসভার লোকজনের নাম স্থান পেয়েছে। অথচ ওই ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্থ অনেক কৃষকের নাম নেই। তিনি বলেন, প্রায় ১৫/২০ কেয়ার জমি করেছিলাম। কোনোমতে ২/৩ কের জমিনের ধান কাটলেও রোদের অভাবে সে ধানগুলোও পচে যায়। বাকী জমি গুলেঅ ফসলসহ পানিতে তলিয়ে যায়। মেম্বার প্রথমে আমার নাম তালিকায় দিছিল। ভাবছিলাম সরকারের সহায়তা পেলে কিছুটা হলেও পরিবারে স্বস্তি মিলবে। কিন্তু হঠাৎ শুনি আমার নাম কেটে দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি উপজেলার ১নং ইউনিয়নের আমড়াখাইর গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্থ সাধারণ কৃষক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের পক্ষে হিমাংশু দাশসহ ১৯ জন কৃষকের স্বাক্ষরিত অভিযোগে বলা হয়, গত ১১ জুন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের মধ্যে জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা ও ৩০ কেজি চাল বিতরণকৃত তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ অনেক কৃষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বরং দলীয় প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতার আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে।
ৎঅভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, কয়েকটি ক্ষেত্রে কৃষকের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল লিখে বাবার নাম ঠিক রেখে সরকারি বরাদ্দের টাকা ও চাল উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের অন্তত চারটি নাম তালিকায় রয়েছে, যার মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে। একটি ক্ষেত্রে ওই নেতার পরিবারের এক সদস্যের নাম ভিন্নভাবে উল্লেখ করে সরকারি সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ওই নেতার চাচাতো ভাই অলিলুর রহমান (খলিলুর রহমান), পিতা জুহুর আলী, দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে অবস্থান করলেও তাকে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের ভাষ্য, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনের জন্য দেওয়া সরকারি সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। ফলে প্রকৃত কৃষকরা সহায়তা না পেয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভের মধ্যে রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিদ আহমেদ তালুকদার বলেন, “আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে এ অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
এ প্রসঙ্গে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, “বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের তালিকায় যদি কোনো প্রবাসীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে স্বজনদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়ে থাকে, তাহলে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে কৃষকদের এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি সহায়তা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে অসহায় মানুষের অধিকার হরণ করতে না পারে। এ ধরনের অভিযোগ উপজেলার সব ক’টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় অবস্থানরত ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের। বিভিন্ন ইউনিয়নে কৃষকরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
নবীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফজলুল হক মনি বলেছেন, উপ-সহকারী (কৃষি)গণ যথাযথভাবে তালিকা প্রণয়ন করে নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। এক পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নাম এবং এক ইউনিয়নে অন্য ইউনিয়নের লোকজনের নাম কিভাবে আসলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন বিষয়টি আমি তদ;ন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ২০:২৬:৪০ ৭ বার পঠিত | ● অকৃষক ● কৃষক ● কৃষক কার্ড ● নবীগঞ্জ ● প্রতিবাদে ● বিক্ষোভ