ঢাকা    মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রচ্ছদ » খুলনা » পরীক্ষাকেন্দ্র আছে, নেই পর্যাপ্ত কক্ষ

পরীক্ষাকেন্দ্র আছে, নেই পর্যাপ্ত কক্ষ


তারিক লিটু,কয়রা ( খুলনা )
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পরীক্ষাকেন্দ্র আছে, নেই পর্যাপ্ত কক্ষ—প্রতিবছর ভরসা টিনশেড

খুলনা: সকাল ১০টা। খুলনার কয়রা উপজেলার মদিনাবাদ দাখিল মাদ্রাসায় শুরু হয় পাঠদান। ষষ্ঠ শ্রেণির একটি কক্ষে ঢুকলেই চোখে পড়ে ঠাসাঠাসি করে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের দৃশ্য। এ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ১১১ জন। অথচ তাদের বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। শ্রেণিকক্ষের সংকটে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করানোও কঠিন হয়ে পড়েছে শিক্ষকদের জন্য।

কয়রা উপজেলা সদরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে শিক্ষার্থী ৪০৮ জন। শিক্ষক-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ ২৬টি হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১৬ জন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট। পুরোনো ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া এবং কোথাও কোথাও রড বেরিয়ে আসায় শ্রেণিকক্ষে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মদিনাবাদ দাখিল মাদ্রাসাটি কয়রা উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। প্রতিবছর দাখিলসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহৃত হয়। উপজেলার বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এখানে পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের বসানোর জন্য বাইরে টিনশেডের অতিরিক্ত কক্ষ তৈরি করতে হয়।

মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের প্রধান পাকা ভবনটি প্রায় ২৬ বছর আগে, ২০০০ সালের দিকে নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ভবনটির বিভিন্ন অংশ এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কয়েকটি শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নেওয়ার সময়ও ওপর থেকে পলেস্তারা খসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, একটি শ্রেণিকক্ষে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বসিয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণির ১১১ শিক্ষার্থীর জন্য বিদ্যমান শ্রেণিকক্ষটি অপর্যাপ্ত। ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে বসা, চলাফেরা ও পাঠ গ্রহণে সমস্যা হচ্ছে।

মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানান, উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার অনেক মাদ্রাসায় নিয়মিত ক্লাস পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তুলনামূলকভাবে উপজেলা সদরের এই মাদ্রাসায় সকাল ১০টা থেকে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম চালু থাকে। ফলে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে এসে পড়াশোনা করে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলও ভালো হওয়ায় প্রতিবছর নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির চাপ থাকে। কিন্তু শিক্ষার্থী বাড়লেও সেই অনুপাতে অবকাঠামো বাড়েনি।

শিক্ষকদের দাবি, শিক্ষার্থী বাড়লেও শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা ও শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা সেই অনুপাতে বাড়েনি। ২৬টি পদ থাকার কথা থাকলেও ১৬ জন দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এতে একদিকে শিক্ষকরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

মাদ্রাসাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কয়রা উপজেলার বিভিন্ন মাদ্রাসার পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরীক্ষার সময় পর্যাপ্ত স্থায়ী কক্ষ না থাকায় পরীক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থা করতে প্রতিবছরই বাইরে নতুন করে টিনশেডের কক্ষ তৈরি করতে হয়। পরীক্ষা শেষ হলে সেই অস্থায়ী ব্যবস্থারও আর প্রয়োজন থাকে না। ফলে স্থায়ী ভবনের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মাদ্রাসার সুপার মো. শাহাদাৎ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানের মূল সমস্যা অবকাঠামোগত। এখানে একটি নতুন ভবন খুবই প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করে। মাদ্রাসাটি পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র হওয়ায় প্রতিবছর পরীক্ষা শুরুর আগে নতুন করে টিনশেড তৈরি করে সেখানে পরীক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থা করতে হয়। তাই এখানে একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা খুবই জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের যেসব পদ শূন্য রয়েছে, সেসব পদে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হলে মাদ্রাসাটি আরও কার্যকরভাবে ও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।’

মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষক মো. আজিজুর রহমান বলেন , নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করছে। বিশেষ করে দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে প্রতিষ্ঠানটি উপজেলার মধ্যে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা ও শ্রেণিকক্ষের সংকট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করতে দ্রুত বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ বৃদ্ধি এবং শূন্য পদে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ করা জরুরি।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ঝুমা সুলতানা ও ৮ম শ্রেণির লামিয়া সুলতানা সাথে কথা বললে তারা দ্রুত নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণের দাবি জানায়। তাঁদের মতে, যে প্রতিষ্ঠানে চার শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে এবং প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেখানে এমন অবকাঠামোগত সংকট থাকা দুঃখজনক।

কয়রা মদিনাবাদ দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে। কিন্তু সেই শিক্ষার্থীদেরই প্রতিদিন সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিকক্ষে বসে পাঠ নিতে হচ্ছে। ফলে ভালো ফলাফলের এই প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে এখন দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ২২:১৬:২৬   ৫ বার পঠিত  |