ঢাকা    মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রচ্ছদ » প্রধান সংবাদ » জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধে কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধে কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড


অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধে কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আজ মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপর আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত আসামিই পলাতক।

রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এর প্রায় ১০ মাস পর দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে মামলার রায় হলো।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় আজ সপ্তম রায় হলো।

দুটি ট্রাইব্যুনালের সাত রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জনই পলাতক। কারাগারে আছেন চারজন।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

সাত আসামির কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ট্রাইব্যুনালে উত্থাপিত এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ থেকে জানা যায়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিনটি ‘কাউন্ট’ (ধারা) রয়েছে।

প্রথম কাউন্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মোবাইলে কথোপকথন হয়। আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়ে সাদ্দামকে তখন কাদের বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’

২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ সম্বোধন করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন ওবায়দুল কাদের।

পরদিন ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রুখে দিতে ও আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য রাজধানীর ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’। এ বক্তব্যের মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেন ওবায়দুল কাদের। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ দেন তিনি।

ওবায়দুল কাদেরের উল্লিখিত নির্দেশসহ অন্যান্য বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরীহ-নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়। এতে সেদিন নারীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন।

আন্দোলন দমন করতে ১৬ জুলাই তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। একই দিনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের সব এলাকা দখলে রাখার নির্দেশ দেন তিনি।

ওবায়দুল কাদেরের এমন নির্দেশনার পর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার মুরাদপুর এলাকায় মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যা করে। একই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দুই নম্বর কাউন্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাজধানীর তেজগাঁওয়ের দলীয় কার্যালয়ে ঢাকা জেলা ও ঢাকা মহানগর (উত্তর-দক্ষিণ) আওয়ামী লীগ এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আন্দোলন দমনে নিজ নিজ এলাকায় প্রস্তুতি নেওয়া ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন তিনি।

পরদিন ১৮ জুলাই ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দেন ওবায়দুল কাদের। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের রাজপথে নেমে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেন তিনি।

১৯ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের প্রধানদের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শুট অ্যাট সাইট হবে।’ অর্থাৎ, দেখামাত্রই গুলির নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।

শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথোপকথনে ওবায়দুল কাদের আন্দোলন দমনের জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে এর দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেন তাঁরা।

আন্দোলন দমনের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান খান, আনিসুল হক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মির্জা আজম, শামীম ওসমান, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদসহ অন্যদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে অপহরণ, গুম, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।

ওবায়দুল কাদেরের এসব নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ১৮ জুলাই শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনসহ ৩ জন, ১৯ জুলাই আসিফ ইকবালসহ ৩০ জন, ২০ জুলাই সিফাত হোসেন ও মহাখালী এলাকায় ৬ জনসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করে।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে তিন নম্বর কাউন্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন রুখে দিতে দলের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।

ওবায়দুল কাদেরের এ নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা গুলি করে মিরপুরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শাহরিয়ার হাসান আলভী, মিরাজ ফরাজি, মহিউদ্দিনসহ ১২ জনকে, ফেনীর মহিপালে ইশতিয়াক আহাম্মেদসহ ৭ জনকে এবং লক্ষ্মীপুর সদরে সাদ-আল আফনানসহ ৪ জনকে হত্যা করে। একইভাবে ৫ আগস্ট মিরপুরে মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে এবং রাজশাহী মহানগরে রায়হান আলী ও সাকিব আনজুমসহ সারা দেশে অসংখ্য আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।

একইভাবে সারা দেশে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করা হয়।

নাছিমের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

বাহাউদ্দিন নাছিমের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই আন্দোলন রুখে দিতে ও আন্দোলনকারীদের দমনের জন্য ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’।

বাহাউদ্দিন নাছিম ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর নির্বাচনী এলাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়।

বাহাউদ্দিন নাছিমের ওই প্ররোচনার পর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করে চট্টগ্রামে মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ ও মো. ফারুককে হত্যা করে। একই দিন আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জনকে হত্যা করা হয়।

শেখ হাসিনা মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ছাত্র-জনতাকে হত্যার নির্দেশ দেন। ওবায়দুল কাদের ‘শুট অ্যাট সাইট’–এর (দেখামাত্র গুলির) নির্দেশ দেন এবং বাহাউদ্দিন নাছিম ওই নির্দেশ বাস্তবায়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা করেন।

এ নির্দেশ বাস্তবায়নে ১৮ ও ১৯ জুলাই নাছিম তাঁর নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। ১৮ জুলাই নিউমার্কেট এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন নাছিম। সেখানে ১৮ জুলাই দীপ্ত দে এবং ১৯ জুলাই তৌহিদকে হত্যা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রচ্ছায়ায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্যাডাররা অসংখ্য আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করে।

৩ আগস্ট ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে পাড়া-মহল্লায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলন রুখে দিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের যে নির্দেশ দেন, সেখানে বাহাউদ্দিন নাছিম উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দিয়েছেন।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের জামায়াত-শিবির, যুদ্ধাপরাধী, ধর্ম ব্যবসায়ী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অশুভ শক্তি, স্বাধীনতাবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন বাহাউদ্দিন নাছিম। এমন প্ররোচনার পর ৪ আগস্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আসামির নির্বাচনী এলাকার বাংলামোটরে আবদুল গনি, বেলাল হোসেন ও নয়ন মিয়াকে হত্যা করে এবং পল্টন নাইটিঙ্গেল মোড়ে ওবায়দুল হককে হত্যা করে। পরদিন ৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলের সামনে রাকিব হোসেন, গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে রমজান মিয়া, বাংলামোটর এলাকায় ইসমাঈল হোসেন, চাঁনখারপুল এলাকায় ইসমামুল হকসহ মোট ১৩ জনকে হত্যা করা হয়।

একইভাবে সারা দেশে আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়।

আরাফাতের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তাঁর বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই তেজগাঁওয়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে কোটা আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই বলে মন্তব্যসহ নানা উসকানি ও ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্য দেন তিনি।

পরদিন ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি’ সম্বোধন করে উসকানিমূলক যে বক্তব্য দেন, সেখানে আরাফাত উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন। ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করে আরাফাত বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্য দেন এবং পরিকল্পিতভাবে হামলার নির্দেশ দেন। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগ।

১৯ জুলাই আরাফাত প্রেস ব্রিফিংয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী তকমা দেন। পাশাপাশি তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টানা ৫ বছর অস্ত্র-গুলি ব্যবহারের মতো মজুতের বিষয় উল্লেখ করে হুমকি দেন।

আরাফাতের নির্বাচনী এলাকা মহাখালী রেলক্রসিং, চৌরাস্তাসহ আশপাশের এলাকায় ১৯ জুলাই হামলা চালিয়ে মো. শাহজাহান, গনি মিয়াসহ ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা। এ হত্যাকাণ্ডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আরাফাত।

ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ২০ জুলাই ফোনে আলাপ করেন আরাফাত। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন ও আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আরাফাত বলেন, ‘ওই যে অফ করে দিছি গতকাল দুই–একটাকে (টেলিভিশন)। আজকেও বলে রাখছি, যেগুলা শুনবে না, অফ করে দিতে বলব সাথে সাথে।’

আন্দোলন দমনে সরকারের অবৈধ বল প্রয়োগ ও বিভিন্ন সহিংসতার সংবাদ প্রচার করায় ১৮ জুলাই সন্ধ্যা ছয়টার সংবাদ বুলেটিন চলার সময় বাংলা ভিশন, দেশ টিভি, চ্যানেল ২৪ ও এনটিভি এবং ২২ জুলাই বেলা দুইটায় সংবাদ চলার সময় বাংলা ভিশন ও চ্যানেল ২৪–এর সম্প্রচার ৩০ মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেন আরাফাত।

৪ আগস্ট আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিলে আরাফাত সংসদ ভবন এলাকায় পতিত সরকারের মুখপাত্র হিসেবে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেন। আন্দোলনকে সহিংস কর্মকাণ্ড দাবি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন তিনি।

সেই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গুরুতর জখম করা হয়।

পরশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

শেখ ফজলে শামস পরশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলার সময় শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশনা মোতাবেক সারা দেশে আন্দোলন নস্যাৎ করতে পরশ তাঁর নিয়ন্ত্রিত যুবলীগকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন।

পরশের নির্দেশ অনুসরণ করে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও গুরুতর আহত করে।

এ আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪–দলীয় সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর আক্রমণে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০–এর বেশি ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়। ২৫ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা গুরুতর আহত হন। এ হত্যা ও নির্যাতনের অন্যতম নির্দেশদাতা এবং নেতৃত্বে ছিলেন পরশ।

১৮ জুলাই যুবলীগ ক্যাডাররা চট্টগ্রাম মহানগরে নির্বিচার গুলি চালিয়ে তানভীর ছিদ্দিকী, সায়মন মাহিন ও হৃদয় চন্দ্র তরুয়াকে হত্যা করে।

১৯ জুলাই যুবলীগ ক্যাডাররা মহাখালী এলাকায় শাহাজাহান, গণি মিয়া, আল আমিন রনি, জাহিদ হোসেন, ইমাম মেহেদী হাসান ও মামুন হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ১ আগস্ট পরশ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে আগ্রাসন ও ধ্বংসলীলা বলে আখ্যায়িত করেন। পরশ বলেন, ‘আজকে অবশেষে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার একটি নির্বাহী ঘোষণা আসতে পারে। এ ঘোষণা আসার পর ওরা আবারও মরণকামড় দিতে পারে। আপনাদের এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার জামায়াতে ইসলামীর মতো সুশৃঙ্খল দলকে ১৪–দলীয় বৈঠকের আগেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ষড়যন্ত্রের শামিল বলে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে আরও বলা হয়েছে, ৪ আগস্ট পরশের অধীন যুবলীগ ক্যাডাররা লক্ষ্মীপুর শহরে নির্বিচার গুলি করে সাদ-আল আফনান, ওসমান পাটোয়ারী, সাব্বির হোসেন ও কাওসারকে হত্যা করে। ৫ আগস্ট যুবলীগের নেতা-কর্মীরা রাজশাহী মহানগরে আলী রায়হান ও সাকিব আঞ্জুম নামের দুজনকে হত্যা করে।

মাইনুলের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

মাইনুল হোসেন খানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১২ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশনের এক অনুষ্ঠানে তিনি আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করেন। আন্দোলন প্রতিহত করতে যুবলীগের নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন তিনি।

ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ ও প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯ জুলাই মাইনুল নিজে অস্ত্র হাতে নিয়ে মিরপুর এলাকায় মহড়া দেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণসহ হামলা করেন। সেদিন বিকেলে তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচার গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয়।

মাইনুলের উপস্থিতিতে ও তত্ত্বাবধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যুবলীগসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মিরপুরে ৪ আগস্ট শাহরিয়ার হাসানসহ ১২ জনকে হত্যা করে, ৫ আগস্ট মাহফুজুল আলমসহ ২০ জনকে হত্যা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

সাদ্দামের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, সাদ্দাম হোসেন ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে ছাত্রলীগের এক জমায়েতে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি ও উসকানি দেন।

‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন’—ওবায়দুল কাদেরের এমন নির্দেশনা বাস্তবায়নে সারা দেশে ছাত্রলীগ নামধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের প্ররোচনা ও নির্দেশ দেন সাদ্দাম। এ ছাড়া তিনি আন্দোলন দমনে দলীয়ভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও অর্থ গ্রহণ করেন।

১৫ জুলাই সাদ্দামের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় বহিরাগত যুবলীগ ও ছাত্রলীগ। এ হামলায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি এবং ঢাকা কলেজ কমিটির সদস্যরা সরাসরি জড়িত ছিলেন।

‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’—ওবায়দুল কাদেরের এমন প্ররোচনা ও নির্দেশনা মোতাবেক সাদ্দাম ছাত্রলীগকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন এবং তদারক করেন।

১৫ জুলাই সাদ্দাম ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। ১৬ জুলাই আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন সাদ্দাম। তাঁর এমন বক্তব্যের পর রাজধানীসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা চালায়। ১৬ জুলাই সারা দেশে ৬ জন নিহত হন। তার পরদিন সারা দেশে চার শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ১৮ জুলাই নির্বিচার গুলি করে, যাতে সারা দেশে ২৩ জন নিহত হন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সাদ্দামের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সারা দেশে হামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনে শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বিভিন্ন পরিকল্পনা করেন, নির্দেশনা দেন এবং অর্থ গ্রহণ করেন। ১৩ জুলাই মধুর ক্যানটিনে তিনি হিংসাত্মক, বিদ্বেষ ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। আন্দোলন থেকে সরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি দেখান তিনি।

১৫ জুলাই আসিফ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার নির্দেশ দেন। তাঁর নেতৃত্বে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের কমিটি এবং ঢাকা কলেজ কমিটির সদস্যরা হামলা চালান।

১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সাদ্দাম আন্দোলনকারীদের দেখে নেওয়ার যে হুমকি দেন, সেখানে উপস্থিত থেকে তা সমর্থন করেন আসিফ। সেদিন সারা দেশে ছয়জন নিহত হন।

১৮ জুলাই ছাত্রলীগসহ অন্যদের হামলায় দেশে ২৩ জন নিহত হন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে আসিফের প্ররোচনা, নির্দেশ ও তত্ত্বাবধানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সারা দেশে হামলা করে। তাঁর বিরুদ্ধেও ১ হাজার ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৩১:৩১   ৭ বার পঠিত  |