ঢাকা    রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আপনার এলাকার খবর

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রচ্ছদ » খুলনা » মুক্তিযুদ্ধের পর শিক্ষায় ও জনসেবায় কেরামত আলীর দীর্ঘ পথচলা

মুক্তিযুদ্ধের পর শিক্ষায় ও জনসেবায় কেরামত আলীর দীর্ঘ পথচলা


তারিক লিটু,কয়রা ( খুলনা )
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মুক্তিযুদ্ধের পর শিক্ষায় ও জনসেবায় কেরামত আলীর দীর্ঘ পথচলা

খুলনা: ৭৬ বছর বয়সে হাঁটাচলায় আগের মতো গতি নেই। শরীরেও পড়েছে বয়সের ছাপ। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনের কথা শুনলে এখনো ছুটে যেতে ইচ্ছে করে তাঁর। কেউ আইনি সমস্যায় পড়েছেন, কেউ অসহায় হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, কেউ জমিজমা কিংবা পারিবারিক বিরোধ নিয়ে বিপাকে—খবর পেলে তাঁর কাছে আসেন। তিনি তাঁদের কথা শোনেন, পরামর্শ দেন। অনেক সময় কোনো পারিশ্রমিকও নেন না।

এই মানুষটির জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। তখন তিনি তরুণ। দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসে একটি মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কপিলমুনি ও খুলনার বিভিন্ন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন তিনি। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট কেরামত আলী।

খুলনার কয়রা উপজেলার মহারাজপুর গোবিন্দপুর গ্রামের এই মানুষটি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা নন। তিনি শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত সংগঠক, সমাজকর্মী, নির্বাচিত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, বিআরডিবির নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং আইনজীবী। দীর্ঘ জীবনের নানা অধ্যায়ে তিনি যুক্ত থেকেছেন মানুষের সঙ্গে। স্থানীয় মানুষের কাছে তাই কেরামত আলীর পরিচয় শুধু ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’তে থেমে নেই। তাঁর জীবনজুড়ে ছড়িয়ে আছে মানুষের জন্য কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাস।

১৯৫০ সালে জন্ম কেরামত আলীর। শৈশব কেটেছে নিজের এলাকায়। পড়াশোনার শুরু প্রতাপনগর স্কুলে। পরে ভর্তি হন খুলনার বিএল কলেজে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি। মেধাবী ছাত্র হিসেবে অনার্স পরীক্ষায় নবম স্থান অর্জন করেন। কিন্তু শিক্ষাজীবনের সেই পথ বেশি দূর এগোনোর আগেই দেশের ইতিহাস বদলে যায়। ১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তরুণ কেরামত আলী তখন আর শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি। দেশের স্বাধীনতার জন্য যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে।

ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে শহীদ নারায়ণ ক্যাম্পের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর সরাসরি যুক্ত হন সম্মুখযুদ্ধে। কপিলমুনির যুদ্ধ এবং খুলনার বিভিন্ন যুদ্ধের স্মৃতি তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। একসময় যে হাতে ছিল অস্ত্র, স্বাধীনতার পর সেই হাতেই ধরা পড়ে শিক্ষার খাতা, মানুষের আবেদন আর আইনের বই।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। যুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু কেরামত আলীর লড়াই যেন শেষ হলো না। এবার তাঁর লড়াই অন্যরকম—অশিক্ষা, দারিদ্র্য, মানুষের অসহায়ত্ব আর সামাজিক নানা সমস্যার বিরুদ্ধে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি এলাকার পরিবর্তন শুধু রাস্তা বা অবকাঠামো দিয়ে সম্ভব নয়; প্রয়োজন শিক্ষার বিস্তার।

সেই ভাবনা থেকেই তিনি যুক্ত হন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে। হোগলা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। গাজী আব্দুল জব্বার স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কয়রা উপজেলার একমাত্র সরকারি মহিলা কলেজ, যার পূর্ব নাম জাবেদা খানম মহিলা কলেজ, প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

নিজ এলাকা মহারাজপুরের গোবিন্দপুরসহ কয়রার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে তাঁর এই ভূমিকা আজও স্মরণ করেন স্থানীয়রা। তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা কেরামত আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়’। একজন মুক্তিযোদ্ধার হাতে অস্ত্র যেমন স্বাধীনতা এনেছিল, তেমনি স্বাধীনতার পর তাঁর হাতে শিক্ষা হয়ে উঠেছিল সমাজ পরিবর্তনের আরেক অস্ত্র।

তিনি দীর্ঘদিন কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। উপজেলার নির্বাচিত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড—বিআরডিবির নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তিনি এলাকার মানুষের নানা সমস্যা ও প্রয়োজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

একজন জনপ্রতিনিধিত্বমূলক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে যেমন মানুষের কথা শুনেছেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এলাকার একাধিক মসজিদের উন্নয়নেও তিনি দাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

বয়স তাঁকে থামাতে পারেনি। আইন পেশায় যুক্ত থাকার কারণে এখনো প্রতিদিন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর কাছে আসেন। কেউ জমিজমা নিয়ে সমস্যায়, কেউ পারিবারিক বিরোধে, কেউ মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে দুশ্চিন্তায়। বিশেষ করে দরিদ্র, অসহায় ও বয়স্ক মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি বেশি।

অনেকেই তাঁর কাছে আইনি পরামর্শ নিতে এলে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে তাঁদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। কার কোথায় যেতে হবে, কীভাবে আইনি প্রক্রিয়া এগোতে হবে—এসব বিষয়ে সহযোগিতা করেন। তাঁর কাছে আসা মানুষের জন্য হয়তো এটি ছোট কোনো ঘটনা। কিন্তু অসহায় একজন মানুষের জন্য একটি সঠিক আইনি পরামর্শ অনেক সময় বড় আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়।

নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা বলতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট কেরামত আলী বলেন, “দেশের মানুষের জন্য, জনগণের জন্যই আমি আমার জীবন থেকে সময় দিয়ে কাজ করে এসেছি। জীবনের যে সময়টুকু পেয়েছি, চেষ্টা করেছি মানুষের উপকারে লাগাতে। এখনো আমার এলাকার মানুষের কথা ভেবে কাজ করে যাচ্ছি। তাঁদের কোনো সমস্যা হলে, বিশেষ করে আইনি বিষয়ে কেউ অসহায় হয়ে আমার কাছে এলে, যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। মানুষের পাশে থাকতে পারাটাই আমার কাছে বড় পাওনা।”

তিনি বলেন, “আমার এলাকার মানুষ যেন ন্যায়বিচার পায়, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে এবং বিপদে পড়ে অসহায় বোধ না করে—এটাই আমি চাই। বয়স হয়েছে, আগের মতো হয়তো সবকিছু করতে পারি না; কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটা এখনো আছে।”

আজকের প্রজন্মের কাছে ১৯৭১ ইতিহাসের একটি অধ্যায়। কিন্তু কেরামত আলীর কাছে একাত্তর শুধু বইয়ের পাতা নয়। সেই সময় তিনি ছিলেন তরুণ। যুদ্ধ করেছেন, সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, দেখেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং স্বাধীনতার জন্য মানুষের আত্মত্যাগ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই তাঁর কাছে স্বাধীনতার মূল্য অন্যরকম। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা বানায়নি; মানুষের জন্য দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে—এমনটাই মনে করেন তাঁর পরিচিতজনেরা।

কেরামত আলীর জীবনকে এক বাক্যে বলা কঠিন। তিনি একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত সংগঠক, সমাজকর্মী, আইনজীবী ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তবে সব পরিচয়ের ভেতরে একটি পরিচয় যেন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান—তিনি মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। একাত্তরে দেশের জন্য লড়েছেন। স্বাধীনতার পরে শিক্ষার জন্য কাজ করেছেন। সামাজিক দায়িত্বে থেকে মানুষের সমস্যা সমাধানে যুক্ত থেকেছেন। আর এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও অসহায় মানুষের আইনি সহায়তায় পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

একটি প্রজন্মের মানুষ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অনেক গল্পও। কেরামত আলীর মতো মানুষ তাই শুধু একজন ব্যক্তি নন; তাঁরা একটি সময়ের জীবন্ত সাক্ষী। তাঁর জীবনের দিকে তাকালে বাংলাদেশের একটি দীর্ঘ পথচিত্রও দেখা যায়—একাত্তরের যুদ্ধ, স্বাধীনতার পরের পুনর্গঠন, গ্রামবাংলায় শিক্ষার বিস্তার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা এবং মানুষের অধিকার নিয়ে দীর্ঘ লড়াই।

৭৬ বছর বয়সেও তিনি মানুষের কথা শোনেন, পরামর্শ দেন, পাশে দাঁড়ান। হয়তো বয়স তাঁকে আগের মতো ছুটতে দেয় না। কিন্তু মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদটি এখনো তাঁকে চালিয়ে নেয়। তাই কয়রার মানুষের কাছে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট কেরামত আলী শুধু অতীতের একজন বীর নন। তিনি বর্তমানেরও একজন আশ্রয়স্থল। একাত্তরে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন। আর স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তিনি লড়ে যাচ্ছেন মানুষের জন্য—কখনো শিক্ষার জন্য, কখনো সামাজিক ন্যায়ের জন্য, কখনো অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষায়।

এক জীবনে এমন অনেকগুলো অধ্যায় খুব কম মানুষেরই থাকে। কেরামত আলীর জীবন তাই শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধার গল্প নয়; এটি একটি জনপদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা, সেই জনপদের জন্য কাজ করা এবং শেষ বয়সেও মানুষের পাশে থাকার গল্প।

এন/ এস

বাংলাদেশ সময়: ২৩:০০:১৫   ৭ বার পঠিত  | ●   ●   ●   ●