ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
বরিশাল: দুর্গাপূজার আর মাত্র দুই দিন বাকি। শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ঢাক-ঢোলের চাহিদা থাকলেও আধুনিক ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে আগৈলঝাড়ায় ঢাক-ঢোল ও হারমোনিয়াম তৈরির কারিগরদের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। নতুন অর্ডার না থাকায় হতাশায় ভুগছেন তাঁরা। তবে শেষ মুহূর্তে পুরোনো বাদ্যযন্ত্র মেরামত ও জোড়াতালি দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
বরিশাল জেলার মধ্যে আগৈলঝাড়া উপজেলায় সর্বাধিক ১৬১টি মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। উপজেলার রত্নপুর ইউনিয়নের বারপাইকা বাজারে এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে দুই মাস ধরে ব্যয়বহুল আয়োজনের মাধ্যমে বৃহৎ দুর্গাপূজার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করতে মণ্ডপের সাজসজ্জায় রাখা হয়েছে বিশেষ নতুনত্ব।
আগৈলঝাড়া উপজেলা রোডে ঢাক-ঢোল ও হারমোনিয়াম তৈরি এবং মেরামতের কাজ করেন শ্যামল দাস, সুনীল মণ্ডলসহ একাধিক কারিগর। বছরের অন্যান্য সময় তাঁরা শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে ঢাক-ঢোল, তবলা ও হারমোনিয়াম তৈরির নতুন অর্ডার এবং মেরামতের কাজের অপেক্ষায় থাকেন। পুরোনো বাদ্যযন্ত্র মেরামতের কাজ বাড়বে—এমন আশায় প্রস্তুতি নিলেও ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে তাঁদের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে।
দুর্গাপূজার আর মাত্র দুই দিন বাকি থাকলেও দোকানগুলোতে বাদ্যযন্ত্রের চামড়া পরিবর্তন, চাক পাল্টানো, খোল বদল, ছাউনি ও নতুন দড়ি লাগানোসহ সামান্য মেরামতের কাজই হচ্ছে। নতুন অর্ডার তেমন নেই বলে জানিয়েছেন কারিগররা।
উপজেলা রোডে ৪০ বছর ধরে ঢাক-ঢোল তৈরি ও মেরামতের কাজ করছেন শ্যামল দাস (৬০)। তিনি জানান, পাঁচ-ছয়টি পুরোনো ঢাক মেরামত করছেন, তবে নতুন ঢাক তৈরির কোনো অর্ডার পাননি। দুটি ঢাক পাঁচ দিনের জন্য মন্দিরে ভাড়া দিয়েছেন। একটি নতুন ঢাক তৈরি করতে মজুরিসহ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে মজুরি ১ হাজার ৫০০ টাকা। কাঠ ও স্টিলের এক জোড়া বায়া-তবলার দাম ৭ হাজার টাকা।
শ্যামল দাস বলেন, পুরোনো ঢাক-ঢোল মেরামতের কাজের ওপর নির্ভর করেই তিনি মজুরি পান। ঢাক-ঢোল তৈরির চামড়া, চাক, দড়ি, আংটা, ছাউনিসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও জানান, তাঁর বাবাও এ পেশায় ছিলেন। আগে অনিল দাস, নির্মল দাস, হরি দাস ও নারায়ণ দাসসহ অনেকেই এ পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরে তাঁরা অন্য পেশায় চলে গেছেন। ঢাক-ঢোল তৈরি ও মেরামতের উপকরণের দাম বাড়ায় এখন আর এ ব্যবসায় লাভ হয় না। এ কারণে নতুন করে কেউ এ পেশায় আসছেন না। তাঁর ছেলে রুমন দাসও অন্য পেশায় চলে গেছেন। তবে কাজের চাপ বাড়লে বাবাকে সহযোগিতা করতে আসেন।
শ্যামল দাস বলেন, আধুনিক ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে ঢাক-ঢোলের চাহিদা প্রায় নেই বললেই চলে। কোনো রকমে তিনি পেশাটি ধরে রেখেছেন। বাপ-দাদার এ পেশায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকতে চান তিনি।
উপজেলার বাকাল গ্রামের গণেশ মণ্ডলের ছেলে সুনীল মণ্ডল (৬৫) হারমোনিয়াম তৈরির কারিগর। দেশের শীর্ষস্থানীয় হারমোনিয়াম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যতিন অ্যান্ড কোং-এ তিনি ২৩ বছর কাজ করেছেন। পরে নিজের প্রতিষ্ঠান ‘মিউজিক মাঠ’ প্রতিষ্ঠা করেন। একসময় তাঁর দোকানে হারমোনিয়াম তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন নলিনী বৈরাগী, নিতাই রায়, মৃণাল বিশ্বাস ও সুজিত ঘরামিসহ পাঁচজন।
বয়সের ভার উপেক্ষা করে সুনীল মণ্ডল এখনো দক্ষ হাতে নিখুঁতভাবে হারমোনিয়ামসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামত করছেন। দুর্গাপূজার আগে নেওয়া অর্ডার অনুযায়ী দুটি নতুন ও চারটি পুরোনো হারমোনিয়াম তৈরি ও মেরামত করে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। প্রকারভেদে প্রতিটি নতুন হারমোনিয়ামের দাম ২৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা। এগুলো তৈরির জন্য তিনি ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা মজুরি নেন।
সেগুন কাঠ, ক্রাশিন কাঠ, রিড (বাঁশি), পিতলের তার, সোলুলাইট, প্লাস্টিক, বার্নিশ ও আঠাসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকের হারমোনিয়াম তৈরির ইচ্ছা থাকলেও বেশি খরচের কারণে তাঁরা আর তৈরি করান না।
সুনীল মণ্ডল জানান, সারা বছর তিনি দুর্গাপূজায় ভালো অর্ডারের আশায় অপেক্ষা করেন। কিন্তু হারমোনিয়ামসহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র না কিনে আধুনিক ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ভাড়া নিয়ে পূজাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। নতুন করে কেউ এ পেশায় না আসায় একসময় অভিজ্ঞ বাদ্যযন্ত্র কারিগরদের এ পেশা থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১৯:১২:২৮ ৩ বার পঠিত | ● আগৈলঝাড়ায় ঢাক-ঢোল কারিগর ● ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ● শ্যামল দাস ● সুনীল মণ্ডল