ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাজনৈতিক অপরিপক্বতা ও অদূরদর্শী নেতৃত্ব থেকে বিএনপি সরে না আসায় সাত মাসেই সরকার একেবারে লেজেগোবরে অবস্থায় পড়েছে। এ সময়ের মধ্যে প্রায় চারজন মন্ত্রী-এমপি বিদায় নিয়েছেন। সরকারে থেকে দায়িত্ব পালনের সময় এত অপরিপক্ব, অদক্ষ ও অরাজনৈতিক বক্তব্য এবং অরাজনৈতিক নেতৃত্ব আগের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখা যায়নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: বুধবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজার রহমান ইরান। এতে বক্তব্য দেন ১১ দলের শীর্ষ নেতারা।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশে অনেক ভুঁইফোড় রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিয়েছে। তারা নানা তদবির ও লেজুড়বৃত্তি করেছে। মন্ত্রিত্ব, পদ-পদবি ও ভাগ-বাটোয়ারার আশায় অনেকে দল গঠন করে। কিন্তু লোভ-লালসার নানা প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে আপস না করে দেশপ্রেমিক ও আধিপত্যবাদবিরোধী ইসলামী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে লেবার পার্টি উদাহরণ তৈরি করেছে। এ জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলের পক্ষ থেকে দলটির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিনি ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে শ্রমিক-মজুরদের অবস্থা ভালো নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের অসন্তোষ, দুই-চার দিন পরপর পোশাক ও শিল্প খাতে অস্থিরতা এবং সড়ক অবরোধের ঘটনায় বিরোধী দলকে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলের উসকানিতে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি তার চেয়েও বেশি, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিও বেশি। প্রতিনিয়ত জনদুর্ভোগ বাড়ছে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। কঠিন পরিস্থিতিতে শ্রমিক পরিবারগুলো জীবন নির্বাহ করতে পারছে না। বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গার্মেন্টস শ্রমিকসহ সব পেশার শ্রমিক-মজুরদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন চলছে। এ আন্দোলন থামাতে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের দাবি পূরণ করা সরকারের কর্তব্য।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সব অপরাধের বিরুদ্ধে অনমনীয় ও আপসহীন ভূমিকা রেখে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দেশের অস্থিতিশীলতার জন্য তাঁকে দায়ী করার অর্থ হলো, নিজেদের চাঁদাবাজি, দখলদারি, অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি আড়াল করতে দেশপ্রেমিক বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা।
সরকারকে উদ্দেশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরকারের নেটওয়ার্ক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে। উত্তরবঙ্গে গিয়ে মঙ্গলবার সরকারপ্রধান বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানতে পেরেছেন, অস্থিরতার পেছনে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আওয়ামী লীগ যে গোয়েন্দা বাহিনী ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা রেখে গেছে, সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে জঙ্গি বানিয়ে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়েছে, রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছে। সেই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে এখন বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানো হবে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকারের রেখে যাওয়া পুলিশ ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার কর্মকর্তাদের এখনো সরানো হয়নি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের অপকর্ম ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে কথা বললেই বিরোধীদের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ দেওয়া হয়। অথচ সরকারের অপকর্ম জাতির সামনে তুলে ধরা বিরোধী দলের দায়িত্ব। তাহলে কি কোনো কথাই বলা যাবে না? তাঁর ভাষায়, এটিই ফ্যাসিবাদের পথ।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বললেই রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হতো। নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে জঙ্গি বানিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে। বর্তমান সরকারও সেই খারাপ পথেই যাত্রা শুরু করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকার এখন বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করতে চায়। আগেও দলীয়করণ দেখা গেছে, কিন্তু বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও চিফ হুইপরা নির্লজ্জভাবে দলীয়করণের কথা বলছেন। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বরগুনায় গিয়ে বলেছেন, সব ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থীকে জেতানো না হলে উন্নয়নের কোনো বরাদ্দ দেওয়া হবে না। সরকারে থেকে একজন চিফ হুইপ এমন বক্তব্য দিতে পারেন কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন গোলাম পরওয়ার।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সাত-আট মাস পেরিয়ে গেলেও গণভোটের গণরায় কার্যকরের দাবিতে বিরোধী দল আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তারা দুটি লংমার্চ করেছে, আরেকটি লংমার্চের কর্মসূচি রয়েছে ৩১ তারিখে। এর মধ্যে সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, সারসংকট তৈরি করেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। খুন, ধর্ষণ ও নৃশংসতাও সীমা ছাড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত পদসহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির লোকজনকে বেছে বেছে বসানো হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও বিরোধী দল একদিনের জন্য হরতাল বা অবরোধ করেনি, কোনো গাড়িতে আগুন দেয়নি কিংবা ভাঙচুর করেনি। এরপরও তাদের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শাসক দলের বিরুদ্ধে বিরোধী দল এখনো কোনো সহিংস আন্দোলন করেনি। দেশকে ভালোবেসেই তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে দেয়নি। এখনো সরকারের হাতে সময় আছে। সংসদের বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে সংবিধান সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে তৈরি হওয়া প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, সরকারকে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতে চান, বিএনপিও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। ব্যালটের চারটি প্রশ্নে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে ৮৪টি ঐকমত্যের বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছে। তাঁর দাবি, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের ভোটের মধ্য দিয়ে বিএনপির সব নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়ে গেছে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের গণরায় মেনে নিয়ে দেশকে স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব এখন সরকারের।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামী জুলাই সনদকে ধারণ করে। জুলাই শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধী দল চিকিৎসা ও সহায়তা দিয়েছে। সরকারি দলের কতজন শহীদের বাড়িতে গিয়েছেন এবং কতজন জুলাই যোদ্ধাকে সেবা দিয়েছেন, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, যারা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে, তারা গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের রায় প্রত্যাখ্যান করতে পারে না বা সংসদে গণভোট বাতিল করতে পারে না। তা করলে জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করা হয় না।
সরকারের উদ্দেশে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশকে অরাজকতা ও অস্থিরতার আগুনে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। দেশে অশান্তি তৈরি করে রাজপথ উত্তপ্ত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সরকার ভুল রাজনীতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে আবারও রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে।
এন/এস
বাংলাদেশ সময়: ২০:৫০:২৮ ১৩ বার পঠিত | ● বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ● বাংলাদেশ লেবার পার্টি ● মিয়া গোলাম পরওয়ার ● সরকারের সাত মাস