![]()
খুলনা: পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নের শীলেমানপুর গ্রামে জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে ৭০ বছর বয়সী সাকাত মোড়ল ও তাঁর অসুস্থ স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের। মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয়টিও এখন বসবাসের অনুপযোগী। ভাঙা টিন, ফাটা মাটির টালি ও পলিথিনের ছাউনিতে ঘেরা ঘরটির একাংশ ইতিমধ্যে ভেঙে পড়েছে। বাকি অংশও যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। অর্থাভাবে ঘরটি মেরামত করার সামর্থ্য নেই তাঁদের। ফলে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে এই বৃদ্ধ দম্পতির।
সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশের খুঁটি, পলিথিনের বেড়া ও মরিচা ধরা টিন দিয়ে কোনোমতে টিকে আছে তাঁদের বসতঘর। মাটির দেয়ালগুলোও জরাজীর্ণ। ছাদের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র থাকায় বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। মেঝে ভিজে কাদায় পরিণত হয়। তখন নিজেদের ঘরে থাকা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। ঘরটিতে শোয়ার মতো একটি খাটও নেই। মেঝেতে পলিথিন বিছিয়েই রাত কাটান তাঁরা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ছেলে-মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে একাই জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন সাকাত মোড়ল। তাঁর স্থায়ী আয়ের কোনো উৎস নেই। তিনি জানান, বয়স্ক ভাতা ছাড়া সরকারি কোনো সহায়তাও পান না। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় কোনোমতে চলে তাঁদের সংসার। কখনো কেউ খাবার দেন, আবার কখনো সামান্য অর্থ সহায়তা করেন। বৃষ্টি হলে আশ্রয় নিতে হয় প্রতিবেশীদের বাড়িতে।
সাকাত মোড়লের জমিজমা বলতে রয়েছে মাত্র দুই শতক। সেখানে দুই ছেলের ঘরের পাশাপাশি রয়েছে তাঁর জরাজীর্ণ বসতঘর। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নতুন ঘর নির্মাণ কিংবা পুরোনো ঘরটি সংস্কার করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। শীতের সময় ছেঁড়া কাপড় জড়িয়ে ঠান্ডা নিবারণের চেষ্টা করেন তাঁরা। গ্রীষ্মের গরম ও বর্ষার বৃষ্টিতে তাঁদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
নিজের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে সাকাত মোড়ল বলেন, “বয়স্ক ভাতা ছাড়া সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই না। প্রতিবেশীদের কেউ খাবার দেন, কেউ সামান্য টাকা-পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করেন। বৃষ্টি হলে তাঁদের বাড়িতে আশ্রয় নিই। এভাবেই কোনোমতে বেঁচে আছি। মানুষের সাহায্যে দুমুঠো ভাত জোটে। কেউ সাহায্য না করলে অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়। থাকার জায়গাটুকু ছাড়া আমার আর কোনো সম্বল নেই।”
তিনি আরও বলেন, “শুনেছি, সরকার অনেক অসহায় মানুষকে ঘর দিয়েছে। আমার যদি থাকার মতো একটি ঘর হতো, তাহলে অন্তত মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতাম। ঝড়-বৃষ্টি হলে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় চাইতে হতো না। সরকার কিংবা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা যদি একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিতেন, তাহলে স্ত্রীকে নিয়ে জীবনের শেষ সময়টা একটু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অসহায় অবস্থায় রয়েছেন সাকাত মোড়ল ও তাঁর স্ত্রী। প্রতিবেশীরা সাধ্যমতো সহযোগিতা করলেও তাঁদের আবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বিশেষ করে বর্ষা ও শীতকালে তাঁদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। সরকারি উদ্যোগে একটি টিনশেড ঘরের ব্যবস্থা করা গেলে এই বৃদ্ধ দম্পতির জীবনযাপনে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা।
স্থানীয় সচেতন মহল ও বাসিন্দারা সাকাত মোড়লের অসহায়ত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, মানবিক সংগঠন ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন বৃদ্ধ ও তাঁর অসুস্থ স্ত্রীর এমন দুর্বিষহ জীবনযাপন অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিরাপদ বাসস্থান তাঁদের মৌলিক প্রয়োজন। সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে তাঁদের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা গেলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।
বৃদ্ধ সাকাত মোড়লের চাওয়া খুব বেশি নয়। ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজতে হবে না, রাতে নিরাপদে ঘুমানো যাবে এবং অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে নিশ্চিন্তে বসবাস করা যাবে—এমন একটি ছোট্ট ঘরই তাঁর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণে এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের সহৃদয় মানুষের সহযোগিতার অপেক্ষায় রয়েছেন এই অসহায় দম্পতি।
বাংলাদেশ সময়: ১৮:১৯:২৩ ৭ বার পঠিত | ● নিরাপদ বাসস্থানের সংকট ● পাইকগাছায় অসহায় বৃদ্ধ দম্পতি ● শীলেমানপুর ● সাকাত মোড়ল