ঢাকা রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
বরগুনা: “আমাদের আর কেউ রইল না, কী নিয়ে বেঁচে থাকব আমরা”—কথাগুলো বলতে বলতে নির্বাক হয়ে যান মো. জিয়াদুল কবির ও তাঁর স্ত্রী কাজল রেখা। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে তাঁরা হারিয়েছেন একমাত্র ছেলে নাসির সিয়াম (২৬), একমাত্র মেয়ে ফারিহা কবির (৩২) ও নাতি ফাইজান নূরকে (৬)। জিয়াদুল কবির বরগুনার আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউনিয়নের কালিপুরা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সদ্য অবসরপ্রাপ্ত যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পূজার ছুটিতে জিয়াদুল কবিরের মেয়ের জামাই নূর আলম চুয়াডাঙ্গা থেকে ফারিহা কবির (৩২), ছেলে নাসির সিয়াম (২৬), নাতি ফাইজান নূর (৬) এবং দুই ভায়রার পরিবারের আরও ছয়জনসহ মোট ১০ জনকে নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছেলে, মেয়ে ও নাতিসহ স্বজনদের হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন জিয়াদুল কবির ও তাঁর স্ত্রী কাজল রেখা।
জিয়াদুল কবিরের একমাত্র ছেলে নাসির সিয়াম আমতলী এ কে সরকারি হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ঢাকার সেন্ট যোসেফ কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক শেষ করে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তরের শেষ বর্ষে পড়াশোনা করছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বেড়াতে যান। তবে জরুরি কাজ থাকায় শুক্রবার সকালে স্ত্রী ফারিহা কবির, মেয়ে ফাইজান নূর ও শ্যালক নাসির সিয়ামকে সেখানে রেখে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে যান নূর আলম। এতে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
এ ঘটনায় জিয়াদুল কবিরের দুই ভায়রার মেয়ে মালিহা, নাভিলা ও আলভীও প্রাণ হারান। মালিহা (২৮) এ বছর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। নাভিলা এ বছর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। মালিহা ও নাভিলা ঢাকার বনশ্রী এলাকার তিতাস রোডের মুনসুর রশীদের মেয়ে। অন্যদিকে, আলভী (২৬) জিয়াদুল কবিরের আরেক ভায়রা সেলিম মিয়ার মেয়ে। তিনি এ বছর ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁরা সবাই একই এলাকার বাসিন্দা।
ছেলে, মেয়ে, নাতি ও দুই ভায়রার তিন মেয়েকে হারানোর খবর পেয়ে জিয়াদুল কবির স্ত্রীকে নিয়ে শনিবার দুপুর ১২টার দিকে বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। মোবাইল ফোনে সমকালকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার একমাত্র ছেলে নাসির সিয়াম, একমাত্র মেয়ে ফারিহা কবির ও নাতি ফাইজান উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে। আমার এখন বেঁচে থেকে লাভ কী? কী নিয়ে আমি বাঁচব? সব তো আমার শেষ হয়ে গেছে।”
স্ত্রী কাজল রেখা বলেন, “ছেলে, মেয়ে, নাতি—সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা আর দুনিয়ায় বেঁচে থেকে কী করব? ও আল্লাহ, আমাদেরও এখন নিয়ে যাও।”
মেয়ে ফারিহা কবিরের স্বামী নূর আলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “স্ত্রী, ছেলে, শ্যালক গেছে। আল্লাহ, আমাকে এখন বাঁচিয়ে রেখেছ কেন? ওদের সঙ্গে আমাকেও নিয়ে গেলে বেঁচে যেতাম।”
মালিহা ও নাভিলার বাবা মুনসুর রশিদ এবং মা রোকসানা আক্তার রীনা কান্না করতে করতে বলেন, “আমার জান নাভিলা ও মালিহা চলে গেছে। ও আল্লাহ, আমাদের কেন মৃত্যু দাও না? আমাদেরও ওদের সঙ্গে নিয়ে যাও।”
আলভীর বাবা সেলিম ও মা নূর নাহার বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেন, “আমি এখন কাকে আদর করব? ও আল্লাহ, আমার মেয়েটাকে এখন ফিরিয়ে দাও।”
বাংলাদেশ সময়: ১৯:৫১:০৯ ১৪ বার পঠিত | ● উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড ● জিয়াদুল কবির ● নাসির সিয়াম ● বরগুনার আমতলী