ঢাকা বুধবার, ২০ মে ২০২৬
শিরোনাম
![]()
কুড়িগ্রাম: মোস্তফা হিমাগারোত তিন দিন যায়া ঘুরি আসছি আলুর স্লিপ পাই নাই। একজনে কইলো জাগা শ্যাষ হয়া গেইছে। সব স্লিপ ব্যবসায়ীরা নিয়া গেইছে। এ্যলা হামার আলুর কি হইবে। আলু নিয়া বড় বিপদোত পড়ছি বাহে। আলু কেনার মানুষ নাই। অহন আলু রাখার বুদ্ধি পাইতাছি না। আলু জমিতে ফ্যালে থুইছি। অহন আল্লা ভরসা। ৩ একর জমিত আলুর আবাদ করছি ফ্যালে দিয়া ১ হাজার মন আলু হইবে। এবার হামার তিস্তা চরত খালি আলু আর আলু এত ভাল ফলন হইছে। আরোতোত দিলে ১১ টাকা কেজি। গাড়ী ভাড়া, ২ কেজি ধলতা ও খাজনা বাদ দিয়া কেজি ৭ ট্যাকা পড়ে। আবাদ করতে খরচ হইছে ২০ ট্যাকা। আলুর চিন্তায় গলায় দড়ি দিবার খাইবে। এমনি তো মরা আরো মরছি বাহে। জোয়ান সেতরা চরের কৃষক বকুল মিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে এভাবে কথা গুলো বলছিলেন।
এ হক হিমাগারে আলু রাখার স্লিপ পাননি শেখের খামার চরের কৃষক ফকরুল ইসলাম। তার ভাষ্য হিমাগারের মালিক আগেই মজুতদার ব্যবসায়ীদের কাছে সব স্লিপ বিক্রি করে দিয়েছে। ফলে তিস্তা চরের কোন কৃষক স্লিপ পাননি। অন্যবার মহাজন ব্যবসায়ীরা জমি থেকে আলু কিনে নিয়ে গেছে। এবার আলু কিনতে আসছেন না। বাজারেও আলুর মারাক্ত দাম কমেছে। আগাম আলুতেও লোকসান খেয়েছি। ভেবেছিলাম দ্বিতীয় দফা আলুর ভাল বাজার পাব । কিন্ত সে আশায়ও গুড়ে বালি। ফলে আলু নিয়ে মহা বিপদে পড়েছি। জমিতে আলু পড়ে আছে বৃষ্টি নামলে সব ধবংস হয়ে যাবে। আলু বিক্রি করতে পাচ্ছি না।ঋনের টাকা শোধ করতে পাচ্ছি না।।খেন কি খাব কি ভাবে চলব সে চিন্তায় দিশেহারা
হয়ে পড়েছি।
বকুল মিয়া ও ফকরুলের মত তিস্তার চরের শেখ ফরিদ,শাহেদুল ইসলাম, মিন্টু মিয়াসহ শতাধিক কৃষক আলু সংরক্ষন করতে না পেরে বিপদে পড়েছেন। ক্ষেত থেকে আলু তোলা শেষ না হতেই আলু সংরক্ষনের স্লিপ শেষ হয়ে গেছে বলে কৃষকদের অভিযোগ। আলু খ্যাত চিন্তার বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা গেল কৃষকরা আলু তুলে জমিতে ফেলে রেখেছেন। কেউ আবার চালা তুলে ঢিপ (জরো) করে রেখেছেন। কৃষকরা জানান এবার কেউ
আলু কিনতে আসছে না। হিমাগারে সংক্ষনে স্লিপের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছি স্লিপ যোগাড় করতে পারিনি। এখন আলু নিয়ে বড় বিপাকে পড়েছি। তাদের একটাই দাবী কৃষি বিভাগের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের আলু সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা হউক।
জানা গেছে”স্বনির্ভর আলু চাষী সমিতি”নামের একটি ব্যবসায়ী ও মজুতদার সিন্ডিকেট আগে ভাগেই হিমাগার গুলোতে অগ্রিম বুকিং দিয়ে কৃষকদের সংরক্ষন বঞ্চিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের ভাষ্য,মজুতদার ব্যবসায়ীরা হিমারের সাথে যোগসাজশে অগ্রিম বুকিং দিয়ে তারা আলু না কিনে দরপতনের সৃষ্টি করেছে। কৃষকরা বলছেন সংরক্ষন করতে না পেরে পানির দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে কৃষকরা মারাক্তক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভালো ফলন হলেও কৃষকদের বিপদ কাটছে না। আলু সংরক্ষন করতে না পারলে আগামী মৌসুমে বীজ আলু সংকটে পড়বেন তারা। হিমাগার কর্তৃপক্ষের তদারকি বাড়িয়ে মজুতদারদের অগ্রাধিকার না দিয়ে প্রকৃত কৃষকদের সংরক্ষনের ব্যবস্থা করার দাবী তাদের। তবে হিমাগার কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ী ও মজুতদার সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, কারা ব্যবসায়ী, কারা কৃষক সেটা আমরা
কিভাবে বুঝব।
কিশোরপুর চরের কৃষক মহসিন আলি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, লোন করে চড়া দামে সার বীজ কিনে ৫ একর জমিতে আলুর চাষ করেছি। ফলন ভালো হলেও বাজারে আলুর দাম এত কম যে বিক্রি করে বীজের টাকা উঠে না। একটা স্লিপের জন্য অনেক চেষ্টা করেও পাইনি। অথচ কৃষক নয় সাইদুর রহমান, মতিয়ার রহমান ও রফিকুল ইসলাম আলু সংরক্ষনের স্লিপ পেয়েছেন। পরে অনেক অনুরোধ করে এজেন্ট(মজুতদার) মতিয়ারের মাধ্যমে ১০২ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছি। বাকী আলু নিয়ে দুর্চিন্তায় আছি। কৃষকরা এজেন্ট দালালদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
এবিষয়ে স্বনির্ভর আলু চাষী সমিতির সদস্য মতিয়ার রহমান, সাইদুল ইসলাম ও রফিকুলের সাথে যোগাযোগ করলে তারা কেউ ফোর ধরেন নাই।
কৃষি বিভাগ চলতি মৌসুমে উপজেলায় আলু চাষের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে এক হাজার ১০০ হেক্টর। তার মধ্যে তিস্তার ২১টি চরে আলুর আবাদ হয়েছে ৬০০ হেক্টরে। এবার চরে ২ দফায় আলুর চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় রোগ বালাই হয়নি। ফলে বাম্পার ফলন হয়েছে। ফলনে খুশি হলেও বাজারে দাম কম হওয়ায় কৃষকরা মারাক্তক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। কৃষকরা আলু বিক্রি করতে পাচ্ছে না ঋন পরিশোধ করতে না পেরে উভয় সংকটে পড়েছে।
এ হক হিমাগারের পরিচালক মো. তোফায়েল হোসেন বলেন,স্বনিভর আলু চাষী সমিতি”আলু সংরক্ষনের বুকিং দিয়েছে। ফলে সরাসরি কোন কৃষককে স্লিপ দিতে পারিনি। মোস্তফা হিমাগারের পরিচালক জাহাগীর আলম বলেন গত ২০ ফেব্রয়ারী স্লিপ দেয়া শুরু করি। যে আসছে তাকে দিয়েছি। কে কৃষক, কে কৃষক নয় তা কিভাবে বুঝব। তবে ব্যবসায়ী যারা আমাদের সাথে থাকে তাদের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। জেলার
৪টি হিমাগারের ধারন ক্ষমতা ৪৮ হাজার মেট্রিক টন। কিন্ত এবার ধারন ক্ষমতার দ্বিগুন উৎপাদন হওয়ায় এ সমস্যা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো.আব্দুল্ল্যাহ আল মামুন বলেন,চলতি মৌসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৭ হাজার হেক্টর, অর্জিত হয়েছে ৮ হাজার হেক্টর। উৎপাদন হয়েছে ৫২ হাজার মেট্রিক টন। যা হিমাগারের ধারন ক্ষমতার অনেক বেশী। ফলে এ সংকট তৈরী হয়েছে। আলু সংরক্ষনের বিষয়টি কৃষি বিপনন বিভাগ দেখভাল করেন। আমরা উপজেলা পর্যায়ে হিমাগার নির্মানের চেষ্টা করছি।
এইচএল/আর
বাংলাদেশ সময়: ১৭:১৬:৪১ ১০৯ বার পঠিত | ● উলিপুর ● কুড়িগ্রাম ● কৃষক ● দুর্চিন্তায়