ঢাকা বুধবার, ২০ মে ২০২৬
শিরোনাম
![]()
কুড়িগ্রাম: রবিবার থেকে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সিন্দুর মতি মেলা ও বাসন্তি পুঁজা। এবারে খাজনা ও চাঁদামুক্ত পরিবেশে মেলার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। ঐতিহ্য ফেরাতে এপদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তিনি।
জানা গেছে,যুগ যুগ ধরে চৈত্রের নবম তিথিতে রাজারহাট উপজেলার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত কিংবদন্তির সিন্দুর মতির পুকুর পাড়ে মেলা ও বাসন্তি পুঁজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাম্বলীরা এই পুকুরটিকে তীর্থ স্থান হিসেবে বিশ্বাস করেন। একারণে পাশর্বর্তী বিভিন্ন দেশ সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার ভক্ত-অনুসারীরা পাপ মোচনের উদ্দেশ্যে এই পুকুরে পূর্ণ স্মানে অংশ গ্রহণ করেন। সনাতন ধর্মাম্বলীরা পুরাকীর্তির নিদর্শন স্বরূপ ঐতিহ্যবাহী পুকুরটিকে স্রষ্টার স্বর্গীয় দান মনে করেন। তারা জীবনে ব্যপ্ততা ও পরজনমে পূর্ণবান হওয়ার মাধ্যম বলেও বিশ্বাসী। এটি শুধু একটি সু-বিশাল পুকুর নয়, হাজার বছর ধরে হিন্দুদের তীর্থক্ষেত্র। রবিবার শুরু হওয়া পূর্ণ স্মান ও মেলায় অংশ গ্রহণ করতে শনিবার থেকেই,ট্রেন,বাস,অটো,সিএনজি সহ বিভিন্ন যানবাহনে আসছেন ভক্ত অনুসারীরা। তাই শনিবার এই এলাকার প্রায় প্রতিটি যানবাহনেই উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
মেলা উদযাপন কমিটির আহবায়ক ও বিএনপি নেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন,সনাতন ধর্মাম্বলীরা যেন সুষ্ঠু ভাবে পূর্ণ স্মাণ, পুজাঁ-অর্চনা এবং মেলা করতে পারে এজন্য ২১সদস্য বিশিষ্ঠ মেলা পরিচালনা কমিটি গঠণ করা হয়েছে। এছাড়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সাবেক উপমন্ত্রী ও বিএনপির জাতীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু জুয়া,খাজনা ও চাঁদা মুক্ত পরিবেশে মেলা উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান।
ঐতিহ্যবাহী সিন্দুর মতি পুকুর বিষয়ে হিন্দু ঠাকুর,প্রবীণ গুণীজন এবং পুজঁকদের মতে,কয়েক হাজার বছর আগে শ্রীলঙ্কায় নারায়ণ চক্রবর্তী নামের ধার্মিক ও দাতা জমিদার ছিলেন। জমিদারের অগাধ ধন সম্পদ থাকলে ও মনে কোন সুখ-শান্তি ছিল না। জমিদারের স্ত্রী মেনেকা দেবী নিঃসন্তান হওয়ায় সন্তান কামনার্থে তারা বিধাতার কাছে অনেক কান্নাকাটি করতেন। এক পর্যায়ে জমিদার সন্তান লাভের আশায় স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করে নিজ স্ত্রীকে সংগে নিয়ে বিভিন্ন তীর্থ স্থান ভ্রমন করতে লাগলেন। অবশেষে জমিদার বঙ্গদেশের উত্তর জনপদে প্রসিদ্ধ দেউল সাগরে এসে পৌছেছেন । দেউল সাগরে একটি প্রাচীন মন্দির র্ছিল। মন্দিরটির চারদিক জল দ্বারা বেষ্টিত ছিল। জমিদার উক্ত ধামে তিন রাত্রি যাপন করেন। সু-প্রাচীন এ ধামটি তার কাছে খুবই ভাল লাগল।
এ স্থানেই তিনি শেষ তীর্থ স্থান ভ্রমন সমাপ্ত করতে মনস্থ করলেন। অল্প দিনে তিনি নিরন্তন প্রচেষ্টায় জমিদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি গড়ে তোলেন ঐশ্বর্যময় এক শান্তির লীলাভূমি। জমিদার ও তার পত্নীর আরাধনায় ভগবান সন্তুু‘ষ্ট হন। মেনেকা দেবী লাভ করেন চন্দ্রিকা সাদৃশ্য দুই কন্যা । সুচরিত জমিদার স্ত্রী আদর করে কন্যাদ্বয়ের নাম রাখেন সিন্দুর ও মতি। দিনে দিনে সিন্দুর মতি বেড়ে ওঠে। একদা রাজ্যে তীব্র খরা দেখা দেয়। নদী-নালা, খাল-বিল সব ফেটে চৌচির। প্রজারা পানীয় জলের ভীষন কষ্টে পড়ে যায়। অনুপযোগী জল পান করে মারা যায় অনেক প্রজা। জমিদার পড়ে যান দুশ্চিন্তায়। বৃষ্টি নেই ,দিনে আগুন ঝরা রোদ। অবশেষে জমিদার অলৌকিক ভাবে পানীয় জল কষ্ট লাঘবের উপায় পেলেন। প্রজা হিতৈষী জমিদার রাজ প্রাসাদের অনতি দূরে প্রায় ১৭ একর জমির উপর বিশাল আকৃতির একটি পুকুর খননের পরিকল্পনা গ্রহন করেন। জমিদার পুকুর খননকাজে কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়োগ করলেন।
শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অল্প দিনের মধ্যে খনন কাজ সমাপ্ত হয়। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় পুকুরে এক ফোটা জলও উঠল না। সবার মাথায় হাত। জমিদার কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জল পাওয়ার উপায় কি? উপায়হীন জমিদার ধ্যানরত হয়ে জপ করতে থাকেন। ভগবান খুশি হলেন। জমিদারকে রাতেই স্বপ্নাদেশ করলেন, তোমার দু‘ কন্যা সিন্দুর ও মতিকে নিয়ে জলবিহীন পুকুরের তল দেশে পুঁজা অর্চনা করলে ওই পুকুরে জল আসবে। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী জমিদার কাল বিলম্ব না করে চৈত্রের নবমীতে পুঁজা অর্চনার আয়াজন করলেন। সিন্দুর মতির পুজা হবে এ সংবাদ রাজ্যের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। যথা সময়ে পুজা দেখার জন্য রাজ্যের আবাল, বৃদ্ধ,বনিতার ঢল নামল। জমিদার পত্নী মেনেকা দেবী নিজ হাতে মেয়ে সিন্দুরকে একটি লাল ও মতিকে একটি সাদা শাড়ি পড়িয়ে সাজালেন। দু’ বোন সোনার বরণডালা নিয়ে পুকুর ঘাটে চলে আসল । অন্য পুজারীরা ও পুজার সরঞ্চমাদি নিয়ে যথা সময়ে উপস্থিত হলেন।
পুজারীরা শঙ্খধনী,বাদ্যকরেরা ঢাক-ঢোল,তবলা বাজাতে লাগলেন । জমিদার ইষ্ট নাম জপ করে পুজার সূচনা করলেন। কিšু‘ পুকুরে এক ফোটা জলও উঠল না । ঠিক তখনই জমিদার মনে পড়ে গেল তিনি ভূলবশতঃ তুলসি পাতা নিয়ে আসেননি। তাই তিনি তুলসি পাতা আনার জন্য রাজ প্রাসাদে গেলেন। জমিদার প্রাসাদের কাছে যেতে না যেতেই সহসা বিকট শব্দে পুকুরের তলদেশ ভেদ করে তীব্রবেগে অজস্র জলরাশি বের হল । নিমিষে পুকুরটি জলে টইটম্বুর হয়ে যায়। বাধ্যকাররা কোন রকম সাতাঁরদিয়ে ডাংগায় ওঠে প্রাণ বাচাল। কিন্তু সিন্দুর ও মতি আর ভেসে উঠল না।
ইত্যবসরে ব্রাক্ষ্মন জমিদার ফিরে এসে দেখেন তার আদরের সিন্দুর ও মতি আর নেই। জমিদার ও তার স্ত্রী পুকুর পাড়ে আছড়ে পড়েন। আবার এক রাতে জমিদার কে স্বাপ্নাদেশে ভগবান জানালেন তার দু কন্যা মৃত্যু হয়নি। পকুর এর তল দেশে দেবত্ত প্রাপ্ত হয়ে তারা চিরত্ব লাভ করেছে এই বানি শুনে জমিদার শান্তনা পেলেন না। তিনি সরাসরি তার দু’কন্যাকে দেখতে চাইলেন। ভগবান জমিদারের মনোবাসনা পূর্ন করেন। মনোবাসনা অনুযায়ী ঘটনার অষ্টম দিনে অরুনদয়ের পূর্বে জমিদার ও তার পত্নীকে পুকরের ভাসমান জলে জ্যোর্তিময় মন্ডলে সিন্দুর ও মতির শাড়ি আচল ও কনিষ্ঠ আঙ্গুল দেখালেন। এতে তারা আবেগাপুত নয়নে অভিভূত হয়ে সিন্দুর ও মতির সংগে কথাও বলেন।
এসময় তার কন্যাদ্বয় জানায় তারা মানবী থেকে দেবী সিন্দুর মতিতে পরিনত হয়েছে। এ কথা জেনে জমিদার ও তার পত্নী মহা খুশি হয়ে যায়। পরবর্তীতে সিন্দুরমতির নামনুসারে পুকুরটির নাম করণ হয় সিন্দুরমতির দিঘী। এই পুকুরের চারিদিকে বড় বড় সান বাঁধা ঘাট তৈরী হয়েছে। ছোট পর্যটন কেন্দ্রের ন্যায় মেলা ছাড়াও প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারনা ঘটে সিন্দুর মতিতে। অন্যান্য বারের মতো এবারেও ৬ এপ্রিল রবিবার থেকে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সিন্দুর মতির মেলা ও বাসন্তি পুঁজা। মেলা উপলক্ষে পুকুরের চার ধারে অস্থায়ী দোকানপাট নির্মাণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন দোকানিরা।
এল/আর
বাংলাদেশ সময়: ১৮:৩৫:১৪ ৪০৭ বার পঠিত | ● অজানা ● কথা ● কুড়িগ্রাম ● পুকুরের ● মতির ● রাজারহাট ● সিন্দুর