ঢাকা বুধবার, ২০ মে ২০২৬
শিরোনাম
![]()
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী শপথ নেওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে টেবিলে বসে এক বান্ডেল টাকা নিতে দেখা যাচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীকে। কয়েক বছরের পুরনো ভিডিওটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের আলোচিত নারদা স্টিং অপারেশনের সময় প্রকাশ হয়েছিল।
২০১৬ সালে এক সাংবাদিকের চালানো অভিযানের খবর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। শুভেন্দু অধিকারী তখন ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা। তাঁর টাকা নেওয়ার ভিডিও নিয়ে উপহাস করে এক জনসভায় ভাষণও দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। বলেছিলেন, ‘চেহারা কত ভোলাভালা। মনে হচ্ছে, এটি তাঁর (শুভেন্দু) প্রতিদিনকার অভ্যাস।’ এ সময় শুভেন্দুর টাকার বান্ডেল সরিয়ে রাখার ভঙ্গি নকল করে দেখান মোদি।
সেই শুভেন্দুর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া এবং শপথ অনুষ্ঠানে মোদির উপস্থিতিকে রাজনীতির বিচিত্র রূপ হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা। শনিবার থেকে এ নিয়েই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভিডিও বানাচ্ছেন বিজেপিবিরোধী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা।
জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি নিজের চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওতে মোদি ও শুভেন্দুর ২০১৬ এবং ২০২৬ সালের অবস্থান নিয়ে বলেছেন, এটি গণতন্ত্রের সঙ্গে বড় রসিকতা। এক সময় তৃণমূল নেতা শুভেন্দুকে ঘুষ কারবারী বলে সমালোচনা করেছিলেন মোদি। এখন তিনিই শুভেন্দুকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছেন।
ঘুষকাণ্ডের প্রায় চার বছর পর শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেন। তৃণমূলে থাকার সময় তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সবশেষ বিধানসভা নির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধেই প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। শনিবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। অনুষ্ঠানের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে মাথা নত করে আছেন শুভেন্দু। তাঁর পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন মোদি।
দুই নেতার আগের ও বর্তমান ছবি নিয়ে ভিডিও বানিয়েছেন এক সময়কার রেডিও উপস্থাপক আকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইউটিউবে ‘দ্য দেশভক্ত’ নামের চ্যানেলে তিনি ভিডিও প্রকাশ করেন। শনিবার প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি শুভেন্দুর রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কিত ও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।
আকাশের মতে, শুভেন্দুর এই উত্থান একইসঙ্গে আদর্শ, সুযোগসন্ধানী রাজনীতি এবং পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কংগ্রেস থেকে তৃণমূল, এরপর বিজেপি। নকশালদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগের কথা শোনা যায়। শুভেন্দুর তিন দশকের এই রাজনৈতিক পরিক্রমা মূলত ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত চরিত্রের প্রতিফলন।
ধ্রুব রাঠি তাঁর ভিডিওতে বলেছেন, নারদা অভিযানের পর ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) ও সিবিআইয়ের (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) অভিযান এবং জেলে যাওয়ার শঙ্কার মুখে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেন। এরপর মামলাগুলোও ধামাচাপা পড়ে। শুভেন্দুর ঘুষ নেওয়ার ভিডিও খোদ বিজেপি তাদের ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করেছিল। কিন্তু দল বদলের পর গেরুয়া শিবির সেটিও ডিলিট করে দেয়।
শুভেন্দুর ঘুষকাণ্ড নিয়ে মোদির ভাষণের একটি ক্লিপ ফেসবুকে শেয়ার করেছেন সুপ্রিয় সরকার নামের এক ব্যবহারকারী। ১৯ হাজার ফলোয়ারের অ্যাকাউন্টে তিনি নিজেকে লেখক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রের কী বিচিত্র পরিহাস! ২০১৬ সালে যে শুভেন্দু অধিকারীকে ক্যামেরার সামনে ঘুষ নিতে দেখে নরেন্দ্র মোদি উপহাস করেছিলেন, ঠিক ১০ বছর পর সেই মোদিই তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিলেন।’
কী হয়েছিল ২০১৬ সালেভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি ও বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নারদা নিউজ নামের একটি পোর্টালে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের অনিয়মের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। গোপন ক্যামেরায় ছবি ধারণ করে প্রতিবেদনগুলো তৈরি করেছিলেন কেরালার সাংবাদিক ম্যাথু স্যামুয়েল। তাঁর দলের সদস্যরা কল্পিত একটি কোম্পানির প্রতিনিধি সেজে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গিয়েছিলেন। যেখানে তাদের কাছে থেকে ঘুষ নেন বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা।
দীর্ঘ দুই বছর ধরে গোপনে অভিযান চালিয়ে ঘুষ নেওয়ার ওই ভিডিওগুলো ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ফুটেজগুলো প্রকাশ করা হয়। যা ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে। তবে রাজ্য ও দেশজুড়ে বড় শোরগোল সত্ত্বেও, তৃণমূল কংগ্রেস সেবারের নির্বাচনে জিতে পুনরায় ক্ষমতায় বসে।
নারদার অভিযানে যাদের দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে তাদের মধ্যে অনেকে এখনো রাজনীতিতে টিকে আছেন। শুভেন্দু ছাড়াও উল্লেখযোগ্যরা হলেন, মদন মিত্র ও ফিরহাদ হাকিম।
শুভেন্দুকে নিয়ে পাল্টা চালগত বছরের আগস্টে পশ্চিমবঙ্গ সফর করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। তখন তিনি এক জনসভায় ২০১৬ সালের দুর্নীতির কাণ্ড তুলে ধরে তৃণমূলের সমালোচনা করেন। তাঁর সেই বক্তব্যের জবাবে শুভেন্দুর ভিডিওকেই ব্যবহার করে মমতার দল।
সে সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোদির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এক সংবাদ সম্মেলন করেন মমতা প্রশাসনের মন্ত্রী শশী পাঁজা ও দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। সেখানে বড় পর্দায় মোদির ভাষণ ও শুভেন্দুর ঘুষ নেওয়ার ভিডিও পাশাপাশি দেখানো হয়।
পরে কুণাল ঘোষ বলেন, যেসব নেতাদের বিরুদ্ধে এক সময় বিজেপি তদন্ত চাইত, বর্তমানে তারাই বিজেপির আসনে বসে আছেন। তৃণমূলের এই মুখপাত্র সে সময় বলেছিলেন, বিজেপির উচিত আগে নিজের দলের দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বহিষ্কার করা, এরপর অন্যের দিকে আঙুল তোলা।
রাজনীতিতে বিরোধপূর্ণ অবস্থান স্বত্ত্বেও এক হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বলা হয় ‘প্র্যাগমেটিক পলিটিক্স’ বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাস্তববাদী রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী আসামেও এমন উদাহরণ আছে। রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা এক সময় ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। দল বদল করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বিজেপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। সবশেষ নির্বাচনেও বিজেপির হয়ে জিতেছেন। আগামী মঙ্গলবার শপথ নেবেন।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ২২:৪১:২৯ ৫০ বার পঠিত | ● ভারত ● মোদি ● শুভেন্দু