ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬


আপনার এলাকার খবর
প্রচ্ছদ » রাজশাহী » জমি বিক্রির ৩৮ বছর পর বিড়ম্বনায় শতবর্ষী রইচ উদ্দিন

জমি বিক্রির ৩৮ বছর পর বিড়ম্বনায় শতবর্ষী রইচ উদ্দিন


শামীম হাসান মিলন,চাটমোহর (পাবনা )
প্রকাশ: রবিবার, ৯ মার্চ ২০২৫


জমি বিক্রির ৩৮ বছর পর বিড়ম্বনায় শতবর্ষী রইচ উদ্দিন

পাবনা: রইচ উদ্দিন ও সন্তেষ প্রামানিক ২৭ শতক জমি বিক্রি করেছিলেন ৬৬৩ নম্বর দাগে ফসলি জমি। ক্রেতার বংশধররাও সেই দাগের জমি ভোগ দখল করছিলেন। ৩৮ বছর পর এসে সেই জমি খাজনা খারিজ করতে গিয়ে জানতে পারেন দলিলে দাগ নম্বর ভুলবশত: উঠেছে ৬৭৭ নম্বর দাগ। যা বিক্রেতা রইচ উদ্দিনের বাড়ির জমি।

এখন ক্রেতার বংশধররা জমির মুল্য বেশি হয়ে যাওয়ায় দলিলে থাকা ওই ৬৭৭ নম্বর দাগে বাড়ির জমি দাবি করছেন। এ নিয়ে জমির মালিক রইচ উদ্দিন আদালতে মামলা করে দলিলে দাগ নম্বর সংশোধন করে ডিগ্রিও পেয়েছেন। কিন্তু ক্রেতাপক্ষ না মেনে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে নানাভাবে হয়রানী করছেন। এখন বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন শতবর্ষী রইচ উদ্দিন ও তার ছেলে আশরাফুল ইসলাম।

ভুক্তভোগী রইচ উদ্দিন পাবনার চাটমোহর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের জবেরপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার ছেলে আশরাফুল ইসলাম হতদরিদ্র রঙ মিস্ত্রি। আর অভিযুক্তরা হলেন, একইগ্রামের বাসিন্দা আমির হোসেন, আব্দুল আলিম ও মনিরুল ইসলাম। তারা জমি ক্রেতা আফসার শেখের নাতী।

জমির দলিল ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, রইচ উদ্দিন ও সন্তেষ শেখ ১২/০১/১৯৭৬ তারিখে উথুলী মৌজার ৬৬৩ নম্বর দাগের ২৭ শতক ফসলি জমি বিক্রি করেন একইগ্রামের আফসার শেখ ও আছিয়া বেগমের কাছে। জমি রেজিস্ট্রির সময় তৎকালীন দলিল লেখক ভুলবশত: বিক্রি করা জমির দাগ নম্বর ৬৬৩ এর স্থলে ৬৭৭ নম্বর দাগ উল্লেখ করেন। ক্রেতা বিক্রেতা উভয়য়েই লেখাপাড়া না জানায় বিষয়টি তখন কেউই জানতে পারেননি। ৩৮ বছর ধরে ৬৬৩ নম্বর দাগের ফসলি জমি ভোগদখলের পর ২০১৪ সালে ওই জমি খাজনা খারিজ করতে গিয়ে আফসার শেখ জানতে পারেন দলিলে ৬৬৩ নম্বর দাগের স্থলে দাগ নম্বর ৬৭৭ উল্লেখ আছে। ততদিনে বাড়ির জমির দামও বেড়েছে কয়েকগুণ।

তখন চাটমোহর এসিল্যান্ডের কাছে মিসকেস করেন আফসার শেখ। মিসকেসের নোটিশ পেয়ে রইচ উদ্দিনের ছেলে আশরাফুল মিসকেসের বাদিদের দলিলে দাগ নম্বর সংশোধন করে নিতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তারা সেটি মানেননি। অথচ রইচ উদ্দিনের নামের জমি খাজনা খারিজ করা ৩০/১১/২০০৮ তারিখে। যার হিসাব নম্বর ৭৯৯। নামজারী কেস নম্বর ১৪৯০/০৮-০৯।

এরপর রইচ উদ্দিন ও সন্তেষ প্রামানিক ২০১৪ তারিখে পাবনার আদালতে দলিল সংশোধনের মামলা করেন। স্বাক্ষ্য প্রমাণ শেষে ২৮/১১/২০২৯ তারিখে মামলায় দোতোরফা সূত্রে ডিগ্রি পান তারা। সেই ডিগ্রিতে আদালত আদেশ দেন ‘বিক্রিত তফসিল বর্ণিত ১২/০১/১৯৭৬ তারিখে ১৬৪৬ নম্বর দলিলে ভুল দাগ নম্বর ৬৭৭ কর্তন করে তদস্থলে ৬৬৩ নম্বর দাগ সংশোধন করা হলো। অত্র আদেশের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিষ্টার বরাবর প্রেরণ করা হলো।’

তারপর ২১/১০/২০২৪ তারিখে সংশোধিত দলিল ও কাগজপত্র নিয়ে এসিল্যান্ড অফিসে গিয়ে মিসকেস করেন রইচ উদ্দিন ও তার ছেলে আশরাফুল ইসলাম। বিবাদী করেন আফসার শেখের নাতী আমির হোসেন, আব্দুল আলিম ও মনিরুল ইসলামকে। মিসকেস করার পর ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা মোস্তফা শামীম মিসকেসের সরেজমিন তদন্ত করে এসিল্যান্ডের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন ২৪/০২/২০২৫ তারিখে। সেই প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন ‘উভয়পক্ষের শুনানী ও দলিল যাচাই বাছাই করে ৪৯৯৬/২০১৬-১৭ নম্বর নামজারী বলে খোলা হিসাব নম্বর ১৩৭৮ হতে নালিশী আরএস ৮৬৪ দাগে (যার এসএ দাগ নম্বর ৬৭৭) ০ দশমিক ২৭ একর জমি কর্তন করে মূল খতিয়ানভুক্ত করা যেতে পারে।’

রইচ উদ্দিনের ছেলে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘গত ২৫ ফেব্রুয়ারি’২০২৫ তারিখে চাটমোহর এসিল্যান্ড অফিসে উভয়পক্ষের শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এস্যিলান্ড সাহেব আমাদের কোনো কাগজপত্র না দেখে বলেন, বিবাদীপক্ষ আদালতে আপীল করেছেন। আমার কিছু করার নেই বলে মিসকেস খারিজ করে দেন।’

রইচ উদ্দিনের ছেলে আশরাফুল ইসলাম আরো বলেন, ‘আদালত থেকে ডিগ্রি পাওয়ার ইনফরশেন স্লিপ ও ইউপি চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র এসিল্যান্ড স্যারকে দিলেও তিনি গ্রহণ করেননি। তারা আমার কাগজপত্র না দেখে আদালতের আদেশ না মেনে আদালত অবমাননা করেছেন বলে মনে করি। আমি আমার ন্যায়বিচার চাই।’

শতবর্ষী রইচ উদ্দিন বলেন, ‘আমিতো ৬৭৭ দাগে জমি বিক্রি করি নাই। বিক্রি করছি ৬৬৩ দাগে। সেখানেই তারা ৩৮ বছর ধরে ভোগদখল করে আইসে এহন আমার বাড়ির জমির দাগ দাবি করতিছে। ওই সময় সবাই মুর্খ মানুষ ছিলেম, কেউ লেহাপড়া জানতেম না। মুহুরী ভুল কইরে দলিলে ৬৭৭ নম্বর দাগ তুইলে দিছে। শিডা আবার আমরা আদালত থেকে সংশোধানও করে লিছি। তাহলি কেন তারা মানতিছে না। এতকিছুর পরও কি ন্যায়বিচার পাবো লায়।’

অভিযুক্ত আমির হোসেন বলেন, ‘তারা জাল দলিল করে নিয়ে জমি খারিজ করেছে। তারা সব দাগেই জমি কেনাবেচা করেছে। ২০১৪ সালে আমার দাদা আফসার শেখ যখন আমাদের নামে জমি লিখে দেন তখন জমি খারিজ করতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারি। তাদের ওয়ারিশান জমি নয়, কেনা সম্পত্তি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য শালিসে বসার জন্য তাদের বলা হলেও তারা বসে নাই। আমরা ডিগ্রির বিরুদ্ধে আদালতে আপীল করেছি। এখন আইনের মাধ্যমে যেটা হয় হবে। এখন এ নিয়ে বেশি কথা বলে লাভ নাই।’

এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মেহেদি হাসান শাকিল বলেন, ‘বাদি বা বিবাদি পক্ষ কেউ যদি আমার রায়ে সন্তুষ্ট না হন, তাহলে তারা আমার রায়ের কপি পাওয়ার পর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কাছে আপীল করতে পারবেন। তখন যদি এডিসি স্যার প্রয়োজনে আমার কাছে নথি তলব করেন তখন আমার রায়ের সকল নথি তার কাছে সরবরাহ করবো।’

উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) আরো বলেন, ‘আর কোনো মামলার বিরুদ্ধে যদি আপীল হয় তাহলে মুল মামলা চলমান থাকে। যদি তাদের (রইচ উদ্দিন গং) মামলার ডিগ্রীর বিরুদ্ধে আপীল করে বিবাদী পক্ষ (আমির গং) তাহলে ওই মামলা এখন চলমান বুঝতে হবে। তাই সেটার রায় না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে। কে ভুল কে সঠিক তা নির্ধারণ করবেন আদালত।’

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ২২:২০:০৯   ২১২ বার পঠিত  |            







রাজশাহী থেকে আরও...


সুজানগরে বারি-১৪ জাতের সরিষা চাষে মাঠ দিবস ও কারিগরি আলোচনা সভা
চাটমোহরে এলাকাবাসী পেলো কাঠের সেতু
রাজশাহীতে প্রতারক তমাল গ্রেপ্তার
রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাব সভাপতির ওপর সন্ত্রাসী হামলা
রুয়েটে ফাঁকা পড়ে আছে ১৫৫ আসন



আর্কাইভ