ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
শিরোনাম
![]()
রাজধানীর কাকরাইলে গতকাল শুক্রবার বিকেলে জাতীয় পার্টি (জাপা) ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের কয়েক দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষ চলতে থাকে।
এর জেরে সন্ধ্যার দিকে ঘটনাস্থলে যান সেনাবাহিনী, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য। তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এর মধ্যেও জাপা ও গণঅধিকার পরিষদের কর্মীদের থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিপেটা শুরু করে। এ সময় বেধড়ক লাঠিপেটায় মারাত্মক আহত হন ডাকসুর সাবেক ভিপি ও গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক নুরুল হক নুর। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় আহত হন অর্ধশতাধিক।
দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাপার কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে গণঅধিকার পরিষদের কর্মসূচি ঘিরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত।
এদিকে, গতকাল রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা হয়েছে। জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়।
জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদ দুই রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ই কাকরাইল এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, একদিকে নুরের কর্মীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জাপার কার্যালয়ের সামনে থেকে পল্টনের দিকে ধাওয়া দিয়েছিল। অন্যদিকে নুর ওই কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছিলেন। এ সময় গণঅধিকার পরিষদের কর্মীরা ধাওয়ার চেষ্টা করলে তারা কার্যালয়ের দিকে ছুটে যান। তখন পুলিশ ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে লাঠিপেটা করে।
গণঅধিকার পরিষদের কর্মীরা জানান, নুরকে উদ্ধার করে প্রথমে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি আইসিইউতে আছেন।
সংঘর্ষে অন্যদের মধ্যে আহত হন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, হাসান তারেক, ফারজানা কিবরিয়া, মইনুল ইসলাম, মেহবুবা ইসলাম, আবু বক্কর, তারেক আজাদ এবং পুলিশ পরিদর্শক আনিছুর রহমান।
কী ঘটেছিল
গতকাল বিকেলে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও ফ্যাসিবাদ নির্মূলের দাবিতে বিজয়নগর কার্যালয়ের সামনে একটি সমাবেশ করে গণঅধিকার পরিষদ। সমাবেশে আওয়ামী লীগের ‘দোসরদের’ রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করা, তাদের নিবন্ধন বাতিল ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। সমাবেশ শেষে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা বিজয়নগর মোড় থেকে পল্টনমুখী বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
সমাবেশে বক্তব্য দেন নুরুল হক নুর। তিনি আওয়ামী লীগের দোসরদের রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করা, তাদের নিবন্ধন বাতিল ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় পার্টিকে বন্দুক দিয়ে পাহারা দেওয়া হচ্ছে।
সমাবেশ শেষে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা বিজয়নগর মোড় থেকে পল্টনমুখী মিছিল বের করেন। মিছিলটি কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে পৌঁছালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।
জানতে চাইলে গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন সমকালকে বলেন, অন্যদিনের মতো সমাবেশ করে মিছিল নিয়ে বিজয়নগর ঘুরে পল্টনের দিকে যাচ্ছিলেন গণঅধিকারের নেতারা। জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে দিয়ে তাদের যেতে হয়। মিছিল থেকে জি এম কাদের এবং জাতীয় পার্টিকে দালাল, দোসর বলে স্লোগান দেওয়া হয়।
হাসান আল মামুনের ভাষ্য, জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে থাকা নেতাকর্মীরা মিছিলটির শেষাংশে ইটপাটকেল ছোড়েন। এতে রাশেদ খান আহত হন। এরপর গণঅধিকারের নেতাকর্মীরা রাস্তার ওপারে নিজ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন, যা জাতীয় পার্টির কার্যালয় থেকে ২০০ ফুট দূরে। সন্ধ্যার পর নূর আসেন। তখন মারামারি সংঘাত কিছুই ছিল না। নুর কার্যালয়ের সামনে ডায়াসের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসে ১০ মিনিটের মধ্যে সরে যেতে বলে। গণঅধিকারের নেতাকর্মীরা বলেন, তারা কার্যালয়ের সামনে থেকে কেন সরবেন? তারা স্লোগান দিতে থাকেন। ঠিক ১০ মিনিট পর পুলিশ ও সেনা সদস্যরা লাঠিপেটা শুরু করে।
জাতীয় পার্টির ভাষ্য
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব খন্দকার দেলোয়ার জালালী দাবি করেন, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হয়েছে। তিনি জানান, রাত সাড়ে ৮টায় কাকরাইলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। তবে ২টা পর্যন্ত তা হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গণঅধিকার পরিষদের মিছিল কাকরাইলে জাপা কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় জাপা কার্যালয় থেকে নেতাকর্মীরা বেরিয়ে আসেন। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। আধঘণ্টা ধরে এ অবস্থা চলার পর সেনাবাহিনী ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রমনা থানার পরিদর্শক (অভিযান) আতিকুল আলম খন্দকার জানান, সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। রাত ৯টা পর্যন্ত ধাপে ধাপে ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলেছে।
প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবরুদ্ধ জি এম কাদের
সংঘর্ষের সময় জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলীয় কার্যালয়ে সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন। পরে তাঁকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় বের করা হয়।
আইন উপদেষ্টার প্রতিবাদ, সমালোচনা হাসনাতের
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গতকাল রাত ১১টার দিকে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ সেখানে মন্তব্যের ঘরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ লেখেন, ‘প্রতিবাদের কাজ আপনার? ভণ্ডামি বাদ দেন স্যার। যে জন্য বসানো হইছে সেটা না করে কী কী করছেন, এসবের হিসাব দিতে হবে।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজে নুরুল হক নুরকে দেখতে যান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। আসিফ নজরুল জরুরি বিভাগের গেট দিয়ে বের হতে চাইলে নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে তিনি অন্য গেট দিয়ে বের হন।
শাস্তির আওতায় আনতে হবে: রাশেদ
গতকাল কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের নিচে সাংবাদিকদের রাশেদ খান বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ এসে অতর্কিতভাবে আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। যারা এ হামলা করেছে, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তিনি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং খোদাবক্স চৌধুরীর (প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী) দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিবাদ
জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দরকার ছিল। সেভাবে না করে ফ্যাসিস্ট অপশক্তির দোসরদের সুরক্ষা দিতে গিয়ে হামলা করেছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারেনি।
গতকাল কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে গণঅধিকার পরিষদের আহত নেতাকর্মীদের দেখতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
এনসিপির বিক্ষোভ
রাজধানীতে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ভিপি নুরসহ নেতাকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে এনসিপির নেতাকর্মীরা। রাত ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলামটরে এনসিপি কার্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ করে তারা শাহবাগে যায়। সেখানে বিক্ষোভ সমাবেশ করে তারা।
নিন্দা জানালেন মজিবুর রহমান মঞ্জু
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এ ঘটনার আমরা নিন্দা, প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানাই। ২৪ ঘণ্টার যে সময়সীমা গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, এর সঙ্গে সংহতি জানাই। আমরা সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার উদ্যোগ নেব, যাতে সবাই মিলে এ নিয়ে কথা বলতে পারি।
হামলার নিন্দা জানালেন মির্জা ফখরুল
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতিতে বলেন, সুস্থ ধারার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলার নিন্দা জানাই। নুরসহ অনেক নেতাকর্মীর ওপর হামলার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।
মানতে পারছেন না ববি হাজ্জাজ
কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নুরকে দেখতে গিয়ে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বলেছেন, এ হামলা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। এটা কোনোভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
মবের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা: আইএসপিআর
গতকাল রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বিবৃতিতে বলা হয়, রাত ৮টায় কাকরাইলে দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। এতে কয়েক সদস্য আহত হন।
ঘটনার শুরুতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগ করার অনুরোধ জানায়। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কয়েকজন নেতাকর্মী তা উপেক্ষা করে। মব ভায়োলেন্সের (বিশৃঙ্খল জনতার সহিংসতা) মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে। তারা সংগঠিতভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। আনুমানিক রাত ৯টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করে। এ সময় তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।
বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ার চেষ্টা চালায়। এ ছাড়া বিজয়নগর, নয়াপল্টন, তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মক ব্যাহত হয়। জনদুর্ভোগ বাড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব চেষ্টা তারা অগ্রাহ্য করে। জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়। উদ্ভূত ঘটনায় সেনাবাহিনীর পাঁচ সদস্য আহত হয়।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৭:০৭:২৮ ১৩৪৬ বার পঠিত | ● গণঅধিকার ● নুরুল হক নুর ● পরিষদ