ঢাকা বুধবার, ২০ মে ২০২৬
শিরোনাম
![]()
বরিশাল: পনের বছর আগে চাকুরী ছেড়ে মায়ের দেওয়া একলক্ষ টাকা দিয়ে ৫০ শতক পুকুরে মাছের চাষ শুরু করে আজ একটি মৎস্য হ্যাচারী, মৎস্য ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও শতাধীক পুকুর ও ঘেরে মাছের চাষ করে সফল উদ্যোক্তার স্বীকৃতি পেয়েছেন আগৈলঝাড়া উপজেলার বারপাইকা গ্রামের রাসেল সরদার। তার দেশী মাছের রেনু-পোনা উৎপাদনকারী যমুনা হ্যাচারী, মাছের খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা ফিড ও শতাধীক পুকুর-ঘেরে কর্মসংস্থানের সৃস্টি হয়েছে প্রায় দেরশতাধীক বেকার যুবকের। ইতিমধ্যেই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দেশী মাছের রেনু-পোনা উৎপাদন করে সেরা মৎস্য চাষী সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
তার যমুনা ফিস মৎস্য হ্যাচারীতে দেশী পাবদা, সরপুটি, টেংরা, শিং, কৈ, গুলশা, পাঙ্গাস, ভিয়েতনাম কৈ, মনোসেক্স তেলাপিয়াসহ কার্প জাতীয় মাছের উন্নত মানের রেনু-পোনা এলাকার চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী জেলা গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মৎস্য চাষীরা এসে চাহিদা মত নিচ্ছে। রাসেল সরদার তার নিজস্ব শতাধীক পুকুর ও ঘেরে নিজের উৎপাদিত রেনু-পোনা চাষ করে এলাকায় ব্যাপক সারা ফেলেছে। মৎস চাষে রাসেল সরদারের সাফলে দেখে এলাকার অনেকেই মাছ চাষে আগ্রহী হচ্ছে।
তার হ্যাচারীতে বছরে দুই কোটি রেনু-পোনা উৎপাদন হয়, মাছের নিরাপদ ও পুস্টিগুন সম্পন্ন সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে নিজ উদ্যোগে গৌরনদী-গোপালগঞ্জ মহাসড়কের পাসে (বড়মগড়া নামক স্থানে) পদ্মা ফিড নামে মাছের খাবার তৈরির একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এখানে প্রতিদিন ১০ টন উন্নত মানের মাছের খাবার উৎপাদন হয়, নিজের শতাধীক পুকুরের মাছের খাবারের চাহিদা মিটিয়ে অন্যন্য মৎস্য চাষীসহ মাছের খাদ্যের ডিলারের কাছে সরবরাহ করে আসছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে উপজেলার বরপাইকা গ্রামে রাসেল সরদারের যমুনা ফিস এর পাশ্ববর্তি নিজস্ব একাধীক পুকুরে দেশী সরপুটি, পাবদা, টেংরা, শিং, কৈ, গুলসা, মনোসেক্স তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মা মাছ (ডিম ওয়ালা মাছ) পুকুর থেকে ধরে হ্যাচারীর হাউজে রেখে ৫-৬ ঘন্টা ঝর্না দিয়ে পানি দিচ্ছে, এর পরে হরমোন ডোজ (ইনজেকশন) দিয়ে পুরুষ মাছের সাথে একই হাউজে রাখা হচ্ছে, এর ১২ ঘন্টার মধ্যে মা মাছ ডিম দেওয়ার ২-৩ দিনের মধ্যে ডিম থেকে রেনু উৎপাদন হয়, এ সময় দেশের বিভিন্নস্থান থেকে মৎস্য চাষীরা কেজি দরে মাছের রেনু ক্রয় করে নিয়ে যায়। এখানে প্রকার ভেদে দুই হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা কেজি দরে মাছের রেনু বিক্রি হয়ে আসছে।
আর যে সকল মৎস্য চাষীরা রেনু বড় করে পোনা নিতে চায় তারা পিচ হিসেবে (হাজার) প্রকার ভেদে বিভিন্ন দামে ক্রয় করে নেন। বিভিন্ন প্রকার দেশী মাছের পোনা সাইজের উপর দাম নির্ধানর করা হয়। এখানে দুর থেকে আসা মৎস্য চাষীদের অক্সিজেন দিয়ে প্যাকেট করে দেশী মাছের রেনু-পোনা সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এই হ্যাচারীতে বছরে প্রায় দুই কোটি রেনু-পোনা উৎপাদন হয়।
গত মঙ্গলবার ঝালকাঠি জেলা মৎস্য অফিসের উদ্যোগে মৎস্য চাষের উপর অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে একটি দল রাসেল সরদারের মৎস্য রেনু-পোনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা ফিস ও পদ্দা ফিড ও পুকুরে মাছের চাষ সরেজমিনে দেখতে আসলে জাল দিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে দেখানো হয়।
এ সময় সফল মৎস্য চাষী রাসেল সরদার দেশী মাছের ভাল প্রজাতির রেনু-পোনা ও নিরাপদ সুষম খাদ্যের পরামর্শ দিয়ে মৎস্য চাষের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
আগৈলঝাড়া উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে রাসেল সরদারের দেশী রেনু-পোনা উৎপাদনকারী মৎস্য হ্যাচারী নিয়মিত দেখা-শুনার পাশাপাশি পরামর্শ দিয়ে আসছে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন দেশীয় প্রজাতীয় মাছ এবং শামুক সংরক্ষন ও উন্নয়ন প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক মোঃ মনিরুল ইসলাম, ঝালকাঠি মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোঃ ফকরুল ইসলাম, আগৈলঝাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মানিক মল্লিকসহ ২৫ জন মৎস্য চাষে উদ্ভুদকারী।
বাগেরহাট জেলার মৎস চাষী খান আবুল হোসেন বলেন আমি আগৈলঝাড়ার রাসেল সরদারের হ্যাচারী থেকে দেশী মাছের রেনু-পোনা নিয়মিত সংগ্রহ করে মাছ চাষ করে আসছি।
স্থানীয় মৎস চাষী কাঠিরা গ্রামের পরেশ বিশ্বাস জানান আমার পুকুরে চাছ চাষের জন্য রাসেল সরদারের হ্যাচারী থেকে দেশী মাছসহ বিভিন্ন জাতের রেনু-পোনা ও মাছের খাবার ক্রয় করে আসছি।
সফল মৎস্য চাষী রাসেল সরদার বলেন ২০১০ সালে নিজের প্রতিষ্ঠিত ইকরা ইসলামীক ক্যাডেট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের চাকুরি ছেরে দিয়ে মায়ের দেওয়া লক্ষাধীক টাকা নিয়ে একটি পুকুরে প্রথম মাছ চাষ শুরু করি তখন এলাকার লোকজন আমাকে পাগল বলে উপহাস করতো। এখন যমুনা ফিস, পদ্মা ফিড ও শতাধীক পুকুরে মাছ রয়েছে, এখন আমার দ্বারা শতাধীক বেকার লোকের কর্মসংস্থানের সৃস্টি করতে আল্লাহ আমাকে তৌফিক দিয়েছে।
এ বিষয়ে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আগৈলঝাড়া মানিক মল্লিক বলেন দেশীয় প্রজাতির মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে, রাসেল সরদার দেশী মাছের প্রজনন বৃদ্ধির মাধ্যমে রেনু-পোনা উৎপাদন করে দক্ষিনাঞ্চলে মৎস্য চাষী ও ক্রেতাদের মাঝে দেশী মাছের চাহিদা মিটাতে বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি তার প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সৃস্টি হয়েছে।
এ ব্যাপারে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ বলেন আগৈলঝাড়ার সফল মৎস্য উদ্যোক্তা রাসেল সরদারের মাছের হ্যাচারী (যমুনা ফিস) একাধীকবার পরিদর্শন করেছি। দেশী প্রজাতির মাছের রেনু-পোনা ও খাবার উৎপাদনে জেলার মধ্যে তার ভুমিকা অন্যতম। তিনি ২০২৪ সালে জেলা ও উপজেলায় দেশী মাছের রেনু-পোনা উৎপাদনে সম্মাননা সনদ অর্জন করেছিলেন।
এন/আর
বাংলাদেশ সময়: ২২:৫৮:০০ ৩৭৫ বার পঠিত | ● আগৈলঝাড়া ● পোনা ● রেনু