ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
শিরোনাম
![]()
খুলনা: কয়েক শতাব্দী আগে, হযরত জাফর আউলিয়া (রহঃ) ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনিতে আগমন করেন। সে সময় এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা, প্রায়ই সুন্দরবনের অংশ বলে ধরা হতো। এই নির্জন পরিবেশেই তিনি একটি সাধনা আশ্রম স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাধক হযরত খাজা খানজাহান আলী (রহঃ)-এর একজন শিষ্য। যদিও তিনি ঠিক কোন সময় কপিলমুনিতে আসেন, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না, তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশ্রমের কিছু স্মৃতিচিহ্ন এখনো বিদ্যমান।
পীর জাফর আউলিয়ার বহু শিষ্য ও ভক্ত ছিলেন, এবং জানা যায় তিনি তাঁর সাধনাস্থলেই ইন্তেকাল করেন ও সেখানেই সমাধিস্থ হন।
মাজারটি বর্তমানে কপিলমুনির গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। উত্তরে হাসপাতাল, পশ্চিমে কপিলমুনি বাজার, পূর্বে জাফর আউলিয়া মাদ্রাসা এবং দক্ষিণে কপিলেশ্বরী কালী বাড়ির মধ্যবর্তী এলাকায় মাজারটি অবস্থিত। খুলনা জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে এই মাজারটি অবস্থিত হলেও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম এই পীরের মাজারটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ছিল।
১৯৬৯ সালে জাতীয় সংসদের প্রাক্তন স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী প্রায় ৮শ টাকা ব্যয়ে তাঁর নাতিজামাতা শেখ নেছার আলীর তত্ত্বাবধানে মাজারটির প্রাথমিক সংস্কার করেন। পরে তিনি সরকারি ও ব্যক্তিগত অর্থায়নে তিন ধাপে মাজারটি পরিপূর্ণ একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৫৮ সালে ‘জাফর আউলিয়া ডিগ্রি মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে নিজস্ব অর্থ থেকে ১০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে মাজার চত্বরে জাফর আউলিয়া জামে মসজিদ নির্মাণ করেন।
প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত মাজারে আসেন। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল ধর্মাবলম্বীর মানুষ এখানে মানত করেন ও শিরনি নিয়ে আসেন। চৈত্র মাসে বারুণী স্নান উপলক্ষে মাসব্যাপী মেলার আয়োজনও হতো মাজার এলাকা ঘিরে। কপিলমুনি-কাঠামারী সড়কটি তাঁর নামানুসারে ‘জাফর আউলিয়া সড়ক’ নামে পরিচিত।
পীর জাফর আউলিয়াকে ঘিরে বহু অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে। জানা যায়, একবার তিনি তাঁর শিষ্য ছালাওয়ালা ফকিরসহ একটি দুর্গম অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। সেসময় এক বৃদ্ধা প্রতিদিন তাঁকে দুধ দিতেন। হঠাৎ ওই বৃদ্ধার গাভী মারা গেলে ছালাওয়ালা ফকির দুধ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর তিনি মৃত গাভীটিকে লেজ ধরে টেনে বলেন, “ওঠ” এবং গাভীটি অলৌকিকভাবে জীবিত হয়ে ওঠে। দুধ এনে পীরকে খাওয়ালে তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, “তুই আমাকে মৃত গরুর দুধ খাওয়াবি?” এরপর অন্যান্য শিষ্যরা ছালাওয়ালাকে বস্তাবন্দি করে নদীতে ফেলে দেয়। ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে পীর কেবলা সেই স্থান ত্যাগ করে পুনরায় কপিলমুনিতে ফিরে আসেন এবং শিষ্যদের নিয়ে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন।
তিনি কেবল ধর্ম প্রচারেই নয়, আধ্যাত্মিক শক্তির মাধ্যমেও মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। নদীভাঙন, খালের বাঁধ রক্ষা কিংবা বন থেকে বাঘের আক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে মানুষ তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করতেন। এই পীরকে ঘিরে বহু অলৌকিক ঘটনার গল্প এখনও লোকমুখে প্রচলিত।
মাজারে আগত এক ভক্ত জানান, আমি বহুদিন ধরে এখানে আসি, এখানকার ধূলিমাটি নিয়ে প্রার্থনা করি। অনেক মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়েছে।
মাজারের বর্তমান খাদেম ইউনুস ফকির বলেন, আমরা বংশ পরম্পরায় এই মাজারের সেবা করে আসছি। ভক্তদের দেয়া দান সামগ্রী আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করি। প্রতিবছর পৌষ ও বৈশাখ মাসে আশপাশের এলাকাগুলো থেকে খাদ্যশস্য, ফলমূল, সবজি ও নগদ অর্থ উপহার হিসেবে পেয়ে থাকি। মাজারের দেখভাল করেন পাঁচটি ফকির পরিবার।
স্থানীয়দের মতে, নিঃসন্দেহে পীর জাফর আউলিয়ার মাজার খুলনা জেলার একটি ঐতিহাসিক এবং সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। এর যথাযথ উন্নয়ন হলে, এটি দক্ষিণাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।
আফ/আর
বাংলাদেশ সময়: ১৭:৪৫:১২ ২২০ বার পঠিত | ● দক্ষিণাঞ্চল ● ধর্ম প্রচারক ● হযরত জাফর আউলিয়া (রহঃ)