ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
শিরোনাম
![]()
খুলনা: পাইকগাছা উপজেলার প্রাণকেন্দ্র কপিলমুনি বাজার যা এক সময় দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ছিল, আজ তা অব্যবস্থাপনা, দখলদারিত্ব ও অবহেলার নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর এই বাজার থেকে সরকারীভাবে প্রায় অর্ধকোটি টাকার রাজস্ব আদায় হলেও বাস্তবে এর বিনিময়ে উন্নয়ন দেখা যায় না।
বাংলা ১৩৩৯ সালে রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত কপিলমুনি বাজার একসময় এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, এখানকার পণ্যের মূল্য বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার হতো। লাখো মানুষের বাণিজ্যিক নির্ভরতা ছিল এই মোকামকে কেন্দ্র করে। সময়ের পরিক্রমায় এ উপশহরকে পৌরসভায় রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
প্রায় দুই যুগ আগে খুলনা ও সাতক্ষীরার মানুষের যাতায়াত সহজ করতে কপোতাক্ষ নদের ওপর একটি সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও নির্মাণ হয়নি আজও। পড়ে আছে কেবল ১৮টি পিলার—যা এখন কপিলমুনির উন্নয়ন না, বরং প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি বিজড়িত কপোতাক্ষ নদের তীরে গড়ে ওঠা কপিলমুনি বাজার এখন অচিন্তনীয় অব্যবস্থাপনার শিকার। অপরিকল্পিত দোকান, দখলদারদের দৌরাত্ম্য, ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধে বাজারে চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে বাজারের গলি কাদামাটিতে ভরে যায়, যেন ধান রোপণের ক্ষেত।
সরেজমিনে দেখা যায়, একসময়ের বৃহৎ মোকাম কপিলমুনি বাজার এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। টিনের ছাউনি দেয়া প্রাচীন চাঁদনী ঘরগুলো আজ অবৈধ ব্যবসায়ীদের কবলে। যে উদ্দেশ্যে এগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল, সে লক্ষ্য বহু আগেই হারিয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে আসা ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা পড়ছেন নানান সমস্যায়।
এই বাজারের গোড়াপত্তন হয়েছিল এক ঐতিহ্যবাহী গল্প ঘিরে। ঋষি কপিলের তপস্যাস্থল হিসেবে পরিচিত স্থান ‘কপিল’ থেকে নাম হয় ‘কপিলমুনি’। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বার্ষিক মহাবারুণী স্নান উৎসব এখানেই পালিত হয়, যা যুক্ত করে এক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। এই বাজারের আধুনিক রূপকার ছিলেন রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু, যার অক্লান্ত পরিশ্রমে জন্ম নেয় ‘বিনোদগঞ্জ’ নামক বর্তমান কপিলমুনি বাজার।
দীর্ঘদিন অভিভাবকহীন এই বাজারে ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, নেই সুশৃঙ্খল পরিবেশ, নেই কোন নির্দিষ্ট বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি। অথচ প্রতিবছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব আদায় করে স্থানীয় প্রশাসন।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, কপিলমুনি ইউনিয়ন শুধু একটি বাজার নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। শিক্ষা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, সংস্কৃতিসহ সবকিছুতেই ছিল স্বকীয়তা।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন—অবিলম্বে কপিলমুনি বাজারকে পরিকল্পিত পৌরসভায় উন্নীত করে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হোক। একইসাথে কপোতাক্ষ নদের সেতু নির্মাণ, বাজার উন্নয়ন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানান তারা।
একসময়ের ঐতিহ্যের প্রতীক কপিলমুনি আজ অবহেলার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে—এখনই সময় ইতিহাস আর সম্ভাবনাময় এই বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৯:২৮:৩৯ ৯৮ বার পঠিত | ● উপশহর ● পাইকগাছা