ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
শিরোনাম
![]()
পটুয়াখালী: ট্রলিং ট্রলারে ধ্বংস হচ্ছে সমুদ্র সম্পদ, কমছে মাছের প্রজনন মহিপুর বন্দরে সাগরে যাওয়ার অপেক্ষায় একটি ট্রলিং ট্রলার। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পটুয়াখালীর আলীপুর-মহিপুর বন্দর। বন্দরের আশপাশের এলাকায় বছরের পর বছর ইলিশ শিকার করে আসছেন জেলেরা। তবে বেশ কয়েক বছর ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের সংকট তেরি হয়েছে। এর জন্য জেলেরা দায়ী করছেন অবৈধ ট্রলিং বোটকে। আর এ ট্রলিং বোট সরাসরি প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ জেলেদের।
কাঠের তৈরি ছোট ট্রলারকে অবৈধভাবে যান্ত্রিক ‘ট্রলিং ট্রলারে’ রূপান্তর করা হয়। যুক্ত করা হয় ছোট ফাঁসের ‘বেহুন্দি জাল’। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বুকে চলছে নীরব এক ধ্বংসযজ্ঞ। আধা ইঞ্চি ফাঁসের জালে ধরা পড়ছে গভীর ও অগভীর সাগরের রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ ও মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য। এ চর্চার ফলে গত চার থেকে পাঁচ বছরে আশঙ্কাজনক ভাবে কমেছে মাছের প্রজনন। ভেঙে পড়ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য। তাই প্রান্তিক জেলেরা মৎস্য সম্পদ রক্ষায় এ অবৈধ ট্রলিং বোট এবং নিষিদ্ধ জাল বন্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার জেলেরা।
গত রোববার (৩ আগষ্ট ) সকালে কুয়াকাটা চৌরাস্তায় কলাপাড়া উপজেলার সাধারণ জেলেদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে কক্সবাজার, ভোলা, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রায় হাজার জেলেরা সাধারণ জেলেদের ব্যানারে এ মানববন্ধনে অংশ নেয়।
কাঠের তৈরি ছোট ট্রলারকে অবৈধভাবে যান্ত্রিক ‘ট্রলিং ট্রলারে’ রূপান্তর করা হয়। যুক্ত করা হয় ছোট ফাঁসের ‘বেহুন্দি জাল’। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বুকে চলছে নীরব এক ধ্বংসযজ্ঞ। আধা ইঞ্চি ফাঁসের জালে ধরা পড়ছে গভীর ও অগভীর সাগরের রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ ও মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য। এ চর্চার ফলে গত চার থেকে পাঁচ বছরে আশঙ্কাজনক ভাবে কমেছে মাছের প্রজনন।’
জেলেরা অভিযোগ করে করেন, স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রলার মালিকরা কাঠের ট্রলারে প্রথমে যান্ত্রিক জাল টানার ব্যবস্থা বসানো হয়। এরপর একে একে আরও অনেক ট্রলার মালিক এ পথে হেঁটেছেন। বর্তমানে শুধু আলীপুর মহিপুরে রয়েছে ৪০-৫০টি এছাড়াও বর্তমানে পাশের জেলা বরগুনার পাথরঘাটার অন্তত ২০-৩০টি অবৈধ ট্রলিং ট্রলার মৎস্য বন্দরে এসে মাছ শিকার করে থাকেন। তারা জানান, পাথরঘাটায় প্রশাসন এ ট্রলিং বন্ধ করলেও আমাদের প্রশাসন ব্যর্থ। যার প্রবণতা ভোলার বিভিন্ন উপজেলা ও চট্রগ্রামের বাশখালী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
আলীপুরের জেলে মো. সেলিম ফরাজী বলেন, জেলেরা মাছের সংকটকে ভুগছি আর এ সমুদ্রের মাছ নষ্ট করছে অবৈধ ট্রলিং বোট। বোট মালিকরা কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ আর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলামকে প্রতিমাসে লাখ টাকা দিয়ে কিনে রাখেন। তাই তারা সবকিছু দেখেও ট্রলিং বন্ধ করার ব্যাপারে উদাসীন। তারা চাইলে এগুলো বন্ধ করা একদিনের বিষয়।
আমরা সরকারের কাছে আবেদন করছি যাতে দ্রুত এ অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে নেন। ট্রলিং বন্ধে সরকার ব্যবস্থা নিবে নয়তো আমরা আরও বড় আন্দোলনের ঘোষণা দিবো। ‘জেলেরা মাছের সংকটকে ভুগছি আর এ সমুদ্রের মাছ নষ্ট করছে অবৈধ ট্রলিং বোট। বোট মালিকরা কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ আর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল ইসলামকে প্রতিমাসে লাখ টাকা দিয়ে কিনে রাখেন। তাই তারা সবকিছু দেখেও ট্রলিং বন্ধ করার ব্যাপারে উদাসীন। তারা চাইলে এগুলো বন্ধ করা একদিনের বিষয়।’
কুয়াকাটা আশার আলো মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি মো. নিজাম শেখ বলেন, ‘একটি সাধারণ কাঠের ট্রলারকে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এসব ট্রলারে যে ধরনের বেহুন্দি জাল ব্যবহার করা হয়, তাতে পানি ছাড়া আর কিছুই বের হতে পারে না। এতে মাছের পোনা, ডিম, এমনকি মাছের খাবার পর্যন্ত ধ্বংস হয়। এ ট্রলার বন্ধ না হলে নদনদী ও সাগর মাছশূন্য হয়ে পড়বে। আমরা এ সব অসাধু ব্যবসায়ী নামক দেশের শত্রুদের হাত থেকে আমরা বাঁচতে চাই।
নোয়াখালীর জেলে আলম গাজী বলেন, ‘সাগরে যে ছোট ছোট মাছগুলো ট্রলিং বোটের মাধ্যমে ধ্বংস করার কারণে কোনো মাছ বড় হচ্ছে না। কোনো মাছ উৎপাদন হচ্ছে না। হাজার হাজার মাছের রেনু ধ্বংস করছে তারা তাহলে সাগরে মাছ বাড়বে কোথা থেকে? বাড়ার তো কোনো সুযোগ নাই। আর গুঁড়ি যে মাছগুলো ওরা মারে তা নিয়ে আসতে পারে না, ফেলে দিয়ে আসে। বর্তমানে মহিপুরে ৫০টি, ভোলায় ৯০টি ও চট্টগ্রামের কাঠখালী এলাকায় ২০০টির মতো এ ধরনের রূপান্তরিত অবৈধ ট্রলার আছে।’‘মহিপুরে ৫০টি, ভোলায় ৯০টি ও চট্টগ্রামের কাঠখালী এলাকায় ২০০টির মতো এ ধরনের রূপান্তরিত অবৈধ ট্রলার আছে।’
এ বিষয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার জানান, ‘সমুদ্রে জেলেদের ইলিশ শিকার এবং জীবনমান বর্তমানে অনেকটা পরিবর্তন হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের ধারাবাহিকতা পরিবর্তন। অতিরিক্ত প্লাস্টিক পলিথিন সমুদ্রের তলদেশ ধ্বংস করছে পাশাপাশি অবৈধ জালের ব্যবহারে ইলিশ কমেছে আর এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গরীব জেলেরা। সরকার অবৈধ জাল উৎপাদন বন্ধ এবং প্লাস্টিকের যত্রতত্র ব্যবহার এবং নিবন্ধনহীন এসব ট্রলিং বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করি।’
অভিযোগের ভিত্তিতে কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিকাশ মণ্ডল জানান, ‘আমরা সার্বক্ষণিক অবৈধ জেলেদের বিষয়ে সচেতন। তবে এ ট্রলিংয়ের বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান সেটা নিষ্পত্তি হবে দ্রুত। এছাড়া আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বকে আমাদের লজিস্টিক মালামালের ঘাটতি থাকায় অনেক সময় গভীর সমুদ্রের অভিযান চালানো অসম্ভব হয়ে পরে।’ ইতোমধ্যে কোস্টগার্ডের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি দ্রুত সব অবৈধ ট্রলিং বন্ধে অভিযান শুরু হবে। আর আমার বিরুদ্ধে যে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট, সমুদ্র ট্রলার মাছ ধরতে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করেন কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ।’
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা কমরুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘রূপান্তরিত এসব ট্রলিং ট্রলার
মালিকেরা অবৈধ ট্রলারের বৈধতা দাবি করে আদালতে রিট করে। শিগগির সেটি সমাধান হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোস্টগার্ডের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি দ্রুত সব অবৈধ ট্রলিং বন্ধে অভিযান শুরু হবে। আর আমার বিরুদ্ধে যে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট, সমুদ্র ট্রলার মাছ ধরতে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করেন কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশ।’ তিনি আরও বলেন, ‘মৎস্য বিভাগে টাকা দেওয়ারতো কোনো সুযোগ নেই। একটি মহল প্রশাসনকে ছোট করার জন্য এমন বানোয়াট মিথ্যা বলছে। এমনকি কোনো ট্রলারকে সমুদ্রে মাছ ধরারও অনুমতি দেয়নি মৎস্য বিভাগ।’
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৩:০২:২৪ ১০৮ বার পঠিত | ● ট্রলারে ধ্বংস ● ট্রলিং ● পটুয়াখালী ● সমুদ্র ● সম্পদ