ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
শিরোনাম
![]()
বিএনপি, নাকি জামায়াতে ইসলামী– কোন দলের নেতৃত্বাধীন জোটে যাবে এনসিপি, তা নিয়ে নবগঠিত দলটিতে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে জোট না হলে দুই ছাত্র উপদেষ্টা এনসিপিতে যোগ দেবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে তারা সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিতে পারেন। তবে এখনও তারা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেননি।
সম্প্রতি এ বিষয়ের আলোচনায় অংশ নেওয়া ১০ জন নেতার সঙ্গে কথা বলে অভ্যন্তরীণ এ পরিস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। নেতারা জানান, এনসিপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে যারা বিএনপির কাছ থেকে সংসদীয় আসনের বিষয়ে আশ্বাস পেয়েছেন, তারাই শুধু দলটির সঙ্গে জোটে রাজি। বিএনপি পাঁচ থেকে আটটি আসন ছাড়তে পারে। ফলে বাকি নেতাদের অধিকাংশ জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় আগ্রহী। কারণ, তারা মনে করেন, জামায়াত ৪০-৫০টি আসন ছাড়তে পারে। কিন্তু দুই উপদেষ্টার সমর্থক নেতারা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধী।
জানতে চাইলে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব গণমাধ্যমকে বলেন, এনসিপি নিজের সামর্থ্য যাচাইয়ের জন্য প্রার্থী বাছাই করছে। কোন আসনে কে প্রার্থী হবে, শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কারা রয়েছেন– এগুলো যাচাইয়ের পর এনসিপি সিদ্ধান্ত নেবে এককভাবে, নাকি কারও সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করা হবে। তখন ঠিক হবে, কোন দলের সঙ্গে জোট হতে পারে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গত মঙ্গলবার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘মুজিববাদ ও মওদুদীবাদের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কোনো দল একা পারবে না। বিএনপি ও এনসিপি– গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী ধারার দুই শক্তির মধ্যে দায়িত্বশীল ঐক্য প্রয়োজন। তবে এ ঐক্যের শর্ত রয়েছে– বিএনপিকে তার পুরোনো সীমাবদ্ধতা ও পরিবারতন্ত্রের ছায়া থেকে বের হতে হবে। বাংলাদেশ বিনির্মাণে সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে। আর যারা ভারতের প্রভাব-রাজনীতির দিকে ঝুঁকে আছে, তাদেরও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূলধারায় ফিরে আসতে হবে।’
এ লেখার বিষয়ে নাসীরুদ্দীনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এনসিপির সদস্য সচিব আকতার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, কোনো জোটের বিষয়ে বলা হয়নি। সিদ্ধান্তও হয়নি।
এনসিপির একাধিক নেতা গণমাধ্যমকে বলেন, ছাত্র উপদেষ্টাদের অবস্থান ফুটে উঠেছে নাসীরের লেখায়।
অন্যদিকে, দলটির একাধিক নেতা এ পোস্টের বিরোধিতা করে ফেসবুকে পাল্টা লেখা লিখেছেন। যাদের ভাষ্য, উপদেষ্টাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে এনসিপিকে বিএনপির সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উপদেষ্টা এবং শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা বিএনপির কাছ থেকে আসন ছাড় পেলেও এনসিপির ভবিষ্যৎ শেষ করে দিচ্ছে।
দুই উপদেষ্টার ভাবনাজুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বে প্রতিনিধি হিসেবে মাহফুজ আলম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদে রয়েছেন। গত ১৩ নভেম্বর এক উপদেষ্টার বাসায় এনসিপির নির্বাহী পরিষদের ৩০-৩২ জন নেতার বৈঠক হয়। গত বুধবার রাতেও কয়েকটি দলের নেতাদের বৈঠক হয়েছে এক উপদেষ্টার বাসায়।
বৈঠকে দুই উপদেষ্টাকেই পদত্যাগ করতে গত সেপ্টেম্বরে বলা হয় প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে। তখন তারা নির্বাচনী তপশিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের কথা জানান।বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অংশ নেওয়া একটি সূত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিএনপির সঙ্গে জোট না হলে ছাত্র উপদেষ্টারা এনসিপিতে যোগ দিতে রাজি নন। একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, যদি জুলাই অভ্যুত্থানে অংশীদার দলগুলো জোট করতে পারে অথবা বিএনপি-এনসিপি জোট হয়, তবে দলে যোগ দেবেন। জামায়াত-এনসিপির নির্বাচনী সমঝোতা হলে তিনি সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হবেন। কিংবা রাজনীতিতে যোগ না দিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত সরকারে থাকবেন।
আরেক উপদেষ্টার অবস্থানও অভিন্ন বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে। এনসিপি যে জোট গঠনের চেষ্টা করছে, সেই জোট যদি বিএনপির সঙ্গে যোগ দেয়, তবে তিনিও এনসিপিতে যোগ দেবেন। অন্যথায় ঢাকা থেকে বিএনপির মনোনয়নে বা স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন।
তবে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এই উপদেষ্টার স্বতন্ত্র প্রার্থী দিলে সমর্থন দেবে না বিএনপি। বরং তাঁকে সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিতে বলা হয়েছে। বিএনপির দুই জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে এনসিপি প্রতিনিধিদের সাম্প্রতিক বৈঠকে এ বার্তা দেওয়া হয়েছে।
নিজের জোটও হচ্ছে নাএনসিপি, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন এবং আপ বাংলাদেশ মিলে জোট করতে সপ্তাহ দুই আগে আলোচনা শুরু হয়। তবে গত ২৬ নভেম্বর এনসিপির নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে অধিকাংশ সদস্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের সংগঠন আপ বাংলাদেশের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানান।
তারা বলছেন, শিবিরের সাবেক এই নেতারা এনসিপি গঠনের প্রাক্কালে জাতীয় নাগরিক কমিটি ছেড়ে গিয়ে আপ বাংলাদেশ গঠন করেছিলেন। তাই তাদের সঙ্গে জোট হতে পারে না। যদিও এনসিপির তরফে প্রকাশ্যে বলা হয়েছে, আপ বাংলাদেশ রাজনৈতিক দল না হওয়ায় জোটে আগ্রহী নন দলের নেতারা।
গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নুর এনসিপির সঙ্গে জোটে আগ্রহী হলেও দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বিএনপির সঙ্গেই থাকতে চান। এ বিরোধের কারণে ২৬ নভেম্বর ভোর রাত পর্যন্ত বৈঠক করেও সমাধান আসেনি।
গণঅধিকার পরিষদের একটি সূত্র জানিয়েছে, এনসিপির সঙ্গে জোট করলে দল ভাঙতে পারে। রাশেদ খান উপদেষ্টা আসিফকে গণঅধিকারের সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। দলের সেই অংশ বিএনপির জোটে চলে যাবে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু গণমাধ্যমকে বলেন, জোট গঠনের আলোচনা এবং প্রচেষ্টা দুই-ই রয়েছে। দেখা যাক কী হয়।
বিএনপির জোটে আসন না পাওয়া রাষ্ট্র সংস্কার এবং জেএসডিরও এনসিপির সঙ্গে জোটে আসার সম্ভাবনা ছিল। তবে এই সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেছে। কারণ এনসিপি ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নিয়েছে।
আপ বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত বলেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনা আর না হলেও অনানুষ্ঠানিক কথা চলছে।
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় বাধা বেশিএনসিপির নির্বাহী পরিষদের ছয়জন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি কয়টি আসন ছাড়বে তা নিশ্চিত নয়। তবে তারা নানা সূত্র থকে জানতে পেরেছেন, সর্বোচ্চ আটটি আসন দিতে পারে। কিন্তু দরকষাকষির দায়িত্বে থাকা নেতারা আশ্বাস দিচ্ছেন ২০টির বেশি আসন পাওয়া যাবে। কিন্তু তারা স্পষ্ট করছেন না বিএনপির ‘প্রতিশ্রুত’ ২০ আসনের কোনটি কোনটি রয়েছে।
নির্বাহী পরিষদের এই নেতারা জানান, এনসিপির শীর্ষ ১০ নেতার মধ্যে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১, সদস্য সচিব আকতার হোসেন রংপুর-৪, মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা-৪, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা ঢাকা-৯, নাসীরুদ্দীন ঢাকা বা চাঁদপুরের কোনো একটি আসন এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সমন্বয়ক হান্নান মাসউদকে নোয়াখালী-৬ আসনে ছাড় দিতে পারে বিএনপি। উপদেষ্টা মাহফুজ আলম লক্ষ্মীপুর-১ এবং আসিফ মাহমুদকে ঢাকা-১০ আসন ছাড়তে পারে।
বিএনপির সঙ্গে জোট করলে বাকি কারও আসন নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন এনসিপির নেতারা। এ কারণেই নির্বাহী পরিষদের সঙ্গে অধিকাংশ নেতা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় যেতে আগ্রহী, যাতে প্রায় সবাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।
এনসিপির নিজস্ব জোট তৈরির চেষ্টা এরই অংশ বলে জানান নেতারা। একাধিক নেতা বলেছেন, নিজে জোট গড়ে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করলে ‘ইসলামপন্থি ট্যাগের’ শঙ্কা কম। নয়তো আন্তর্জাতিক এবং দেশি নানা পরিমণ্ডলের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হবে। কিন্তু বাম এবং মধ্যপন্থি দলগুলোকে নিয়ে জোট গড়ে জামায়াতের জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা করলে ঝুঁকি কম। জামায়াত ৪০-৫০ আসন ছাড়লে দলের গুরুত্বপূর্ণ সব নেতাকে প্রার্থী করা যাবে। এতে দলে ক্ষোভ এবং ভাঙন এড়ানো যাবে। ৮-১০টি আসনে নির্বাচন করলে বঞ্চিতরা বিক্ষুব্ধ হয়ে দলে ভাঙন তৈরি করতে পারে।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১৮:৩৮:৩১ ৬৭ বার পঠিত | ● এনসিপি ● জোট ● টানাপোড়েন ● নির্বাচন