ঢাকা বুধবার, ২০ মে ২০২৬
শিরোনাম
![]()
কুষ্টিয়া: এক সময় ভেড়ামারা রেল স্টেশন থেকে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছুটতো রায়টা অভিমুখে। যাত্রীদের কোলাহল আর ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় মুখরিত থাকত ৯ কিলোমিটারের এই শাখা রেলপথটি। কিন্তু কালের বিবর্তনে আর অযত্ন-অবহেলায় আজ সেই রেলপথটি ইতিহাসের পাতায় স্থান নিয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি এখন কেবলই এক রূপকথার গল্প।
একটি ট্রেন ভেড়ামারা জংশন থেকে ভেড়ামারা-রায়টা সেকশনে চলাচল করতো। ভেড়ামারার পর স্টেশন ছিলো তিনটি- দামুকদিয়া, দামুকদিয়া ঘাট ও রায়টা। পদ্মা নদীর উপর পাকশী-ভেড়ামারা সংযুক্তকারী হার্ডডিঞ্জব্রিজ চালু হওয়ার আগে পদ্মা পারাপারের জন্য এই রুটটি ব্যবহৃত হতো। পদ্মার এক পাড়ে ছিলো সাড়াঘাট ও অন্যপারে দামুকদিয়া ঘাট। সাড়াঘাট পর্যন্ত ট্রেন আসতো। তারপর রেলওয়ের ফেরি ও স্টিমার যোগে নদী পেরিয়ে দামুকদিয়া ঘাট স্টেশনে এসে রায়টা/রায়টা ট্রেনে করে ভেড়ামারা এসে কলকাতা ও গোয়ালন্দের দিকে যেতো মানুষ।
১৯১৫ সালে হার্ডিঞ্জব্রিজ চালু হওয়ার পর রায়টা ট্রেন ঈশ্বরদি জংশন পর্যন্ত আসতো। ট্রেনটি সম্ভবত ১৯৮৪ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ভেড়ামারা-রায়টা সেকশনটা অব্যবহৃত/ পরিত্যাক্ত হয়ে যায়। তদারকির অভাবে রেললাইনের ক্লিপ, স্লিপার চুরি হতে থাকে। অবশেষে ১৯৯০ সালের ১৫ জুলাই সেকশনটি দাপ্তরিক ভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
ভেড়ামারা-রায়টা রেলপথটি কেবল যাত্রী পরিবহনেই নয়, ভেড়ামারা পাওয়ার হাউস এবং গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের মালামাল ও কয়লা পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এই পথে নিয়মিত ট্রেন চলায় এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি অর্থনীতিতেও ছিল প্রাণের জোয়ার। এই রুটে ভেড়ামারা ও রায়টার মাঝে ‘দামুকদিয়া’ নামে একটি মধ্যবর্তী স্টেশন ছিল।
দেশভাগের পর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মাধ্যমে সরাসরি ট্রেন চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় রায়টা ঘাটের গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একপর্যায়ে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে এই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া এবং রেললাইনের মালামাল লোপাট হওয়ার ফলে এক সময় পুরো পথটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক সময়ের ব্যস্ত সেই রেলপথের এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। লাইনের স্লিপার ও রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে অনেক আগেই। রেললাইনের সেই জায়গায় এখন কোথাও পিচঢালা সড়ক হয়েছে, আবার কোথাও গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি বা চাষাবাদ। রেলের পরিত্যক্ত জমি দখল করে নিয়েছেন অনেকে। স্টেশনের সেই পুরনো ভবনগুলোও এখন জীর্ণদশা বা বিলুপ্তির পথে।
ভেড়ামারা স্টেশন মাষ্টার মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ভেড়ামারা-রায়টা শাখা লাইন বন্ধ হওয়ায় এবং লোকসানের কারণে ১৯৯০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জংশন স্ট্যাটাস হারায় ভেড়ামারা রেলওয়ে স্টেশন। বর্তমানে স্টেশন মাস্টার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শুধু ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীগামী আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং অব্যবহৃত রেললাইনগুলো স্থানীয়দের দখলে চলে গেছে।
এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, ট্রেনটি চালু থাকলে আজ এই অঞ্চলের দৃশ্যপট অন্যরকম হতো। এলাকার মানুষের দাবি, ঐতিহ্যের স্বার্থে এই রেলপথটি পুনরায় সংস্কার বা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে পর্যটন ও স্থানীয় যাতায়াতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতো।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ১২:৫৫:২৭ ৬১ বার পঠিত | ● ভেড়ামারা ● রায়টা ● রেলপথ