ঢাকা    রবিবার, ২১ জুন ২০২৬


আপনার এলাকার খবর
প্রচ্ছদ » বরিশাল » পটুয়াখালীতে ঠিকাদার লাপাত্তা থাকায় বন্ধ ৫৫ সেতু ও ৭ সড়কের কাজ

পটুয়াখালীতে ঠিকাদার লাপাত্তা থাকায় বন্ধ ৫৫ সেতু ও ৭ সড়কের কাজ


আঃ মজিদ খান, (পটুয়াখালী )
প্রকাশ: রবিবার, ২১ জুন ২০২৬


পটুয়াখালীতে ঠিকাদার লাপাত্তা থাকায় বন্ধ ৫৫ সেতু ও ৭ সড়কের কাজ
পটুয়াখালী: ২২ মাস ধরে থমকে আছে সাড়ে ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ৫৫টি সেতু ও সাতটি সড়কের নির্মাণকাজ। কোথাও সেতুর কাজ শেষ হলেও তৈরি হয়নি সংযোগ সড়ক, কোথাও সড়কে সুরকি-বালু রেখে কাজ ফেলে রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পালিয়ে যাওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বিপাকে পড়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
এলজিইডির তথ্যমতে, ২২টি প্যাকেজের অধীনে এসব কাজের মূল ঠিকাদার ছিল পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজের মালিকানাধীন ইফতি-ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেড। আওয়ামী লীগের পতনের পর মহিউদ্দিন মহারাজ দেশত্যাগ করলে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। লেনদেন–জটিলতায় কাজ বন্ধ করে দেন স্থানীয় সাব-ঠিকাদারেরা।
পটুয়াখালীর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হোসেন আলী মীর জানান, স্থানীয় সাব-ঠিকাদারেরা বিল উত্তোলনসহ নানা জটিলতায় পড়ার পর কাজ বন্ধ করে দেন। পরে সাব-ঠিকাদারেরা আদালতে মামলা করেন। এ জন্য ইফতি-ইটিসিএলের সঙ্গে হওয়া চুক্তি বাতিল করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আদালত ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এলে ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রকল্পগুলো শেষ করা হবে।
কোন প্রকল্পে কত কাজঃ এলজিইডির পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ (বিডিআইআরডব্লিউএসপি), দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প (আইবিআরপি), উপজেলা শহর (পৌরসভা ছাড়া) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (ইউটিএমআইডিপি) এবং উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম্য সড়কে অনূর্ধ্ব–১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের (ইউএইচবিপি) অধীনে মহিউদ্দিন মহারাজের ইফতি-ইটিসিএল লিমিটেডের নামে ২২টি প্যাকেজে মোট ৭৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেয় এলজিইডি।
এলজিইডির নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পৃথক দরপত্রের মাধ্যমে সদর উপজেলায় ১৯টি গার্ডার ও আয়রন সেতু, বক্স কালভার্ট এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১৬ কোটি ২৫ লাখ ৪ হাজার টাকা। পাশাপাশি ২১ কোটি ৩৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকায় ৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গলাচিপায় ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭টি গার্ডার ও আয়রন সেতু এবং ৬ কোটি ৯৩ লাখ ৭০ হাজার টাকায় ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন; কলাপাড়ায় ৭ কোটি ২৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা ব্যয়ে পাঁচটি সেতু; মির্জাগঞ্জে ১০ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০টি সেতু; রাঙ্গাবালীতে ৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে চারটি সেতু এবং দুমকি উপজেলায় ১ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে ৫৫টি সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ এবং সাতটি সড়কের উন্নয়নকাজ করার কথা ছিল। প্রতি অর্থবছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। সবশেষ সড়ক উন্নয়নের কাজ ২০২৪ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মহিউদ্দিন মহারাজ পালিয়ে গেলে কাজ থমকে যায়। এরপর ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট মহিউদ্দিন ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে। আর্থিক লেনদেনে জটিলতা তৈরি হলে সাব-ঠিকাদারেরা কাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। পরে এলজিইডি থেকে কয়েক দফা চিঠি চালাচালি করলেও কোনো সমাধান হয়নি। এ ছাড়া কয়েকজন সাব-ঠিকাদার রাজনৈতিক কারণে এলাকায় আসতে না পারায় তাঁদের কাজও বন্ধ আছে।
কাজের অগ্রগতি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশঃ এলজিইডির নথি অনুযায়ী, ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ার আগে সাতটি সড়ক উন্নয়নকাজের ভৌত অগ্রগতি গড়ে ৫৬ শতাংশ। সাতটি কাজের মধ্যে একটিতে সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ এবং একটিতে সর্বনিম্ন ২৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। বাকিগুলোর কাজের অগ্রগতি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে সেতু নির্মাণকাজের গড় অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে কোথাও সেতু নির্মাণের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। সর্বনিম্ন কাজ হয়েছে গলাচিপায় ৬০ শতাংশ। বাকি কাজগুলোর অগ্রগতি ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে।

তবে কলাপাড়া, গলাচিপা, সদর ও রাঙ্গাবালী উপজেলার বেশ কয়েকটি প্যাকেজের মূল সেতুর কাঠামো পুরোপুরি নির্মাণ হয়ে যাওয়ার পরও সংযোগ সড়কের কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। এ জন্য প্রায় শেষ হওয়া সেতুগুলোও এখন অব্যবহৃত পড়ে আছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ হোসেন আলী মীর বলেন, তিনি পটুয়াখালীতে যোগদানের আগে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়। মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রকল্পগুলোর সময় বাড়ানো হয়েছিল। পরে বিগত সরকারের পতনের পর ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
কি বলছে ঠিকাদারি কর্তৃপক্ষঃ এ বিষয়ে কথা বলতে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইফতি-ইটিসিএল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মাসুমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে মূল ঠিকাদারের থেকে কাজ নেওয়া সাব-ঠিকাদার আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি ছয় থেকে সাতটি কাজ করছেন। বাকিগুলো অন্য ঠিকাদারেরা করছিলেন। মূল ঠিকাদার মহিউদ্দিন মহারাজ দেশত্যাগ করলে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়। এতে কাজের বিপরীতে এলজিইডির সঙ্গে তাঁদের লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়।
আবুল কালাম আজাদের দাবি, ইফতি-ইটিসিএলের কারও সঙ্গে বর্তমানে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। তিনি বলেন, অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করতে তিনিসহ কয়েকজন সাব-ঠিকাদার আদালতে মামলা করেছেন। কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাননি। তাঁরা এলজিইডির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। জটিলতা কাটলে আবার কাজ শুরু করা হবে।
মানুষের হাঁটাচলাও বিপজ্জনকঃ গত ১০ ও ১৫ মে সদর উপজেলার মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের সিপাইবাড়ি-সংলগ্ন খালে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের আয়রন সেতুর উপরিভাগের কাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু সংযোগ সড়কসহ আনুষঙ্গিক কাজ এখনো বাকি। সদর ও মির্জাগঞ্জে কয়েকটি সেতুর কাজ পুরোপুরি শেষ হলেও সংযোগ সড়ক হয়নি।
অন্যদিকে সড়ক উন্নয়নের কাজের ক্ষেত্রে কোথাও শুধু ইটের খোয়া ফেলে রাখা হয়েছে। কোথাও মাটি কাটা হয়েছে। আবার কোনো কোনো সড়ক প্রশস্ত করতে দুই পাশের মাটি তুলে গর্ত করা হয়েছে। গত এপ্রিলের শেষ দিকে হওয়া এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে এসব সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। গর্ত ও খানাখন্দে ভরপুর এসব সড়কে যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা; মানুষের হাঁটাচলাও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মরিচবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল জব্বার মৃধা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে কাজ বন্ধ। ঠিকাদারের লোকজন সেতুটি দেখতেও আসেননি। তিনি বলেন, সংযোগ সড়ক না থাকায় তাঁরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন না। যানবাহন চলাচলও বন্ধ আছে।

এন/ আর

বাংলাদেশ সময়: ১৮:৪৪:০৬   ৫ বার পঠিত  |            

----





বরিশাল থেকে আরও...


নাজিরপুরে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে শিশুকে ধর্ষণ
লালমোহনে সেতু সংস্কারের দাবিতে মানববন্ধন
পটুয়াখালীতে ঠিকাদার লাপাত্তা থাকায় বন্ধ ৫৫ সেতু ও ৭ সড়কের কাজ
কলাপাড়ায় মাছ ধরতে গিয়ে ডোবায় ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু
কাউখালীতে কিশোরীদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ



আর্কাইভ