ঢাকা সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম
![]()
‘বাবা’ ছোট্ট একটি শব্দ, কিন্তু এর গভীরতা অসীম। অতিসাধারণ উচ্চারণ। কিন্তু এর ব্যপকতাও ব্যপক। বাবাদের জীবনযাপনও খুব সহজ সরল, কিন্তু তাঁর ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক বিশাল নীরব ছায়াবৃক্ষ। তিনি সন্তানের জন্য ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা, পাহাড়সম উদারতা, সমুদ্রের মতো বিশালতা, চীনের প্রাচীরের মতো নিরাপত্তার দেয়াল এবং অনিঃশেষ মমতার এক অনন্য উৎস। সন্তানের কাছে বাবা শুধু একজন জন্মদাতাই নন; তিনি জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম অভিভাবক, প্রথম আদর্শ এবং সবচেয়ে নির্ভরতার আশ্রয়স্থল।
বাবার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকে সন্তানের জন্য এক অনন্ত ভালোবাসার মহাকাব্য, যা হয়তো মুখে সবসময় প্রকাশ পায় না, কিন্তু তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে অনুভূত হয়। আজ যে স্নেহ, মমতা আর আশীর্বাদকে এত সহজলভ্য বলে মনে হচ্ছে, কাল হয়তো সেটিই জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতায় পরিণত হবে।
ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, ঋতু বদলায়, জীবনও সামনে এগোয়; কিন্তু বাবার অভাব কি কখনো পূরণ হয়, হয় না। বাবা নেই, দুই বছর হতে চলল। সময়ের হিসাবে দুই বছর হয়তো খুব বেশি নয়—কিন্তু বাবা হারানো মানুষের কাছে প্রতিটি দিনই যেন দীর্ঘ শূন্যতা। অনেকেই বলেন, সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়। কিন্তু বাবা হারানোর ক্ষত কি কখনো সারে? মানুষ হয়তো বেঁচে থাকার তাগিদে মানিয়ে নিতে শেখে, কিন্তু বাবা নেই—সেই শূন্যতার সঙ্গে সত্যিকার অর্থে কেউই মানিয়ে নিতে পারে না।
আজও কোনো কারণে মন খারাপ হলে অজান্তেই মনে হয়, বাবাকে একটা ফোন দিই। তারপর বুকের ভেতর হাহাকার—যে নম্বরে ফোন করলে একসময় ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসত, সেটি আজ নীরব। যে মানুষটা সবসময় বলতেন, চিন্তা করিস না, আমি আছি, সেই মানুষটা আজ নেই। অথচ পৃথিবী চলছে তার নিয়মে, সবকিছু আছে আগের মতোই। শুধু জীবনের নির্ভরতার বড় অংশটা নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে।
ছেলেবেলার কথা খুব মনে পড়ে। বাবার আঙুলটাই ছিল যেন দুনিয়ার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। রাস্তা পার হতে গিয়ে, মেলায় ঘুরে বেড়ানো কিংবা সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে হাঁটতে যাওয়া—এসবই ছিল শৈশবের বড় আনন্দময় সময়। মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয় যখন বুকে কাঁপন ধরাত, তখন শক্ত করে ধরা বাবার সে আঙুলটাই যেন সাহস হয়ে থাকত। কতবার যে বাবার কাঁধে চড়ে পৃথিবীকে দেখতে শিখেছি, কত আবদার করেছি! কখনো খেলনা, কখনো নতুন জামা, কখনো কারণ ছাড়াই শুধু বাবার পাশে বসে তার শরীরের উত্তাপ নেওয়া।
বাবা হয়তো সব ইচ্ছে পূরণ করতে পারেননি, কিন্তু কখনো বুঝতেও দেননি তার সীমাবদ্ধতার কথা। নিজের অপূর্ণতাকে আড়াল করে সন্তানের মুখের হাসিতেই খুঁজে নিতেন নিজের পূর্ণতা। সময় মানুষকে বড় করে তোলে। একসময় নির্ভরতার সেই আঙুল ছেড়ে আমরা নিজেরাই চলতে শিখি। ব্যস্ততা বাড়ে, দায়িত্ব বাড়ে, বাড়তে থাকে দূরত্বও। অথচ বাবারা কখনো অভিযোগ করেন না। নিঃশব্দে সন্তানের জন্য চিন্তা করেন, প্রার্থনা করেন; নিজের ইচ্ছেগুলো বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন বড় করে তোলেন।
বাবারা বড় অদ্ভূতও। তাঁরা ভালোবাসেন সবচেয়ে বেশি, অথচ প্রকাশ করেন কম। মায়েদের ভালোবাসা অনেকটাই স্পষ্ট, আর বাবারা দেখান দায়িত্বে, ত্যাগে আর পরিশ্রমে। অনেক সময় রাগ, শাসন কিংবা নীরবতার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে তাদের গভীর মমতা। আমরা বড় হতে হতে অনেক দূরে চলে যাই। আমাদের অনেক কাজ আর অনেক বন্ধুর ভিড়ে বাবার সঙ্গে গল্প করার সময় হারিয়ে যায়।
মনের ভেতর জমতে থাকা অনেক কথাও তখন বলতে চেয়েও বলা হয় না। মনে হয়, সময় তো আছেই—আরেকদিন না হয় বলব। কিন্তু নির্মম সত্য হলো—জীবন সব কথা বলার সুযোগ সব সময় দেয় না। কতবার ভেবেছি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলব—‘তোমাকে ভালোবাসি।’ কিন্তু বলা হয়নি কখনো। কতবার তার চিন্তাক্লিষ্ট ক্লান্ত মুখটা দেখেও জিজ্ঞেস করা হয়নি, ‘কেমন আছো, বাবা?’ এসব কিছু করতে গিয়ে, বলতে গিয়ে—কতশত বার ব্যস্ততার কাছে হার মেনেছি, কতশত দায়িত্বে জড়িয়েছি নিজেকে, কিন্তু বাবার সঙ্গে গল্প করার, তাকে সময়টুকু দেওয়ার সময়টাই শুধু হয়নি।
আমরা পাঁচ ভাই ও সাত বোনের এক বিশাল পরিবার। একটিমাত্র মানুষের সীমিত আয়ে এত বড় সংসার সামলানো আজকের দিনে রীতিমতো অকল্পনীয়। কিন্তু অসীম ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম আর অসংখ্য প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমাদের বাবা কখনোই দায়িত্বের ভারে নুয়ে পড়েননি। বরং পরম যত্নে আমাদের সবাইকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলেছেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া ছোট ভাইয়ের সন্তানদেরও নিজের সন্তানের মতোই বুকে টেনে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁরাও আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত।
তাঁর দায়িত্ববোধ কেবল নিজের পরিবারের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজের সন্তানদের জন্য যতটুকু করেছেন, তার চেয়েও ঢেড় বেশি করেছেন সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে। বাবার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—সম্পদ বা বিশাল অট্টালিকায় মানুষের প্রকৃত পরিচয় নয়, বরং পরিচয় লুকিয়ে থাকে আর্তমানবতার সেবায়।
শুনেছি ছোট বেলা থেকেই আমাদের বাবা মোস্তফা আলম ছিলেন কর্মনিষ্ঠ, বুদ্ধিমান, রাজনৈতিকভাবে সচেতন, সাংগঠনিক মনা, বিদ্যানুরাগী এবং সাংস্কৃতিবান মানুষ। কর্ম রাজনীতি এবং সমাজ সেবাই ছিল তার জীবনাদর্শ। তিনি ১৯৪৯ সালে মাইনর পাশের পর মেট্রিক পরীক্ষার্থী থাকাকালে ১৯৫৩ সালে সেতাবগঞ্জ চিনিকলের অধীনে অর্গানাইজার পদে চাকুরীতে যোগদান করেন এবং ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছর সুনামের সাথে চাকুরী করেন। পরবর্তীতে ঠাকুরগাও চিনিকলের সেন্টার ইনচাজ হিসেবে পীরগঞ্জ ইক্ষু কেন্দ্রে ১৯৬৭ সালে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ জনযুদ্ধে পরিণত হলে তিনি বিভিন্ন ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করেন। তারই অনুপ্রেরণায় তার ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী মর্তুজা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক বাহিনীর হাতে তাঁর পিতা খাদেম মতিউর রহমান ও ছোটভাই মুরাদ হোসেন মারা যান। মোস্তফা আলম ১৯৭৩ সালে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ৬নং পীরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান থাকাকালে বাবার মানুষ পটে ধরা পরে যে, পীরগঞ্জ ইউনিয়ন ও দৌলতপুর ইউনিয়নের অংশ বিশেষ নিয়ে গড়ে উঠেছে পীরগঞ্জ শহর। তিনি দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় উপলদ্ধি করেন যে, পীরগঞ্জে বড়হাট তথা কলেজ বাজারটি দৌলতপুর ইউনিয়নে এবং প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদালত পীরগঞ্জ ইউনিয়নে অবস্থিত। পীরগঞ্জ উপজেলা শহরটি ৬নং পীরগঞ্জ ও ৮নং দৌলতপুর এই দুইটি ইউনিয়নে বিভক্ত হওয়ায়, এই শহরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রতি নিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। তার উপলদ্ধি পীরগঞ্জ শহরটিকে একক কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা সম্ভব হলে, পীরগঞ্জ শহরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন সহজতরভাবে সম্ভব। তাই তিনি ভাবতে শুরু করলেন কিভাবে এই দুইটি ইউনিয়নকে এক করা যায়।
অবশেষে বাবা (দুরদর্শী মোস্তফা আলম) খুজে পেলেন পীরগঞ্জ কে যদি পৌরসভায় উন্নিত করা যায় তাহলেই কেবল মাত্র সম্ভব এ সমস্যা সমাধানের। পীরগঞ্জকে পৌরসভায় কিভাবে উন্নিত করা যায় তার পরিকল্পনা করলেন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্র প্রধান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পীরগঞ্জে রাজনৈতিক সফরে এলে পীরগঞ্জ কে পৌরসভায় উন্নিত করার জন্য বাবা (মোস্তফা আলম) প্রস্তাব করেন এবং তিনি (প্রেসিডেন্ট জিয়া) সেদিন কৃষি ব্যাংক মাঠে (পাইলট স্কুলে সংলগ্ন) পীরগঞ্জ কে পৌরসভায় উন্নিত করা হবে বলে আশ্বাস প্রদান করেন এবং সেই দিনই পীরগঞ্জ, পৌরসভা গঠনের প্রাথমিক অনুমোদন লাভ করে। ফলে পীরগঞ্জ পৌরসভা উন্নীত করার বীজ রোপিত হয়।
তার দীর্ঘ আন্তরিক প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সালের ১০ আগষ্ট বৃহস্পতিবার ৬নং পীরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ অফিসটিকে (দৌলতপুর ইউনিয়ন ও পীরগঞ্জ ইউনিয়নের কিছু অংশ নিয়ে) পীরগঞ্জ পৌরসভার অফিস হিসেবে উদ্বোধন করা হয়। ফলে পীরগঞ্জ কলেজ হাটটি ও অফিস আদালত তথা দুটি ইউনিয়নের কিছু অংশ নিয়ে পীরগঞ্জ পৌরসভা গঠিত হয়ে পীরগঞ্জ শহরের উন্নয়ন একক কর্তৃক পক্ষের হাতে আসে।
সমাজ সেবক ও সংগঠক হিসেবে আমাদের বাবা: ১৯৬৮ সাল থেকে পীরগঞ্জ বণিক সমিতির সম্পাদকের দায়িত্ব ২০১০ সাল পর্যন্ত পালন করেন। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন পীরগঞ্জ উপজেলা (থানা) কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদের নির্বাহী কমিটির রাজশাহী বিভাগের একমাত্র সদস্য ছিলেন (১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজশাহী বিভাগীয় সদস্য হিসেবে সরকারী ভাবে হংকং যাত্রার সকল প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হলেও সরকার পরিবর্তনের কারণে তা বাতিল হয়)। ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও জেলা পরিষদের সদস্য। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সদস্য। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৮৯ সালে সরকারী রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত ভেলাতৈড় ভদ্রপাড়া মতিউর রহমান মেমোরিয়াল ক্লাব এন্ড লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ১৯৯৪ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত পীরগঞ্জ ঠিকাদার কল্যান সমিতির সদস্য। ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৭সাল পর্যন্ত হাসকিং মিল মালিক সমিতির সহ সভাপতি ও জেলা কমিটি সদস্য ছিলেন এবং ২০০২ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত পীরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমিটির সদস্য।
বিদ্যোৎসাহী ও শিক্ষানুরাগী হিসেবে আমাদের বাবা: পীরগঞ্জ পৌরশহরে ১৯৭৯ সালে স্থাপিত সবুজ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্য এবং সভাপতি ছিলেন। পীরগঞ্জ উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বণিক সরকারী বালিকা বিদ্যালয়টি ১৯৭৩ সালে স্থাপনের সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৮৯ সালে সরকারের কাছে হস্তান্তরের সময় ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি (মোস্তফা আলম) স্বাক্ষর প্রদান করেন। অনুরূপভাবে পীরগঞ্জের একমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ পীরগঞ্জ সরকারী কলেজ স্থাপন ও উন্নয়নে সক্রিয় অংশ গ্রহণ এবং বেসরকারী পর্যায় থেকে সরকারী পর্যায়ে হস্তান্তরের সময় গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে স্বাক্ষর প্রদান করেন।
পীরগঞ্জ পৌরসভার অন্তর্গত ভেলাতৈড় আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং ২০০০ সাল পর্যন্ত সভাপতি এবং পরবর্তীতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পীরগঞ্জ মহিলা কলেজটি প্রতিষ্ঠার সময় সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা, প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৯৪ সাল (স্থাপিতকাল) থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত গভর্নিং বডির সদস্য। পীরডাঙ্গী এসআই সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ভেলতৈড় মহিলা টেকনিকাল কলেজের সদস্য হিসেবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
যার ফল আজও মানুষ ভোগ করছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, দান মানে কেবল অর্থ দেওয়া নয়। মানুষকে সম্মান দেয়া, বিপদগ্রস্থ মানুষকে পথ দেখানো, মানুষের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়াই ছিল প্রকৃত কাজ। আমি দেখেছি, আইনি বেড়াজালে পড়ে তাঁর সাহায্য কেউ কামনা করলে, তিনি তড়িঘড়ি করে গার্জিয়ান গেঞ্জি পড়েই থানায় যেতেন; বিপদগ্রস্থ মানুষকে সাহায্য করতে। তিনি শুধু দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই-খাতা কিনে দিতেন তা নয়; মেধাবী ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যয়ভারও বহন করতেন। তিনি যেমন অসংখ্য অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তেমনী করে দিয়েছেন অসংখ্য কর্মহীন মানুষের কর্মের (চাকুরির) ব্যবস্থা ।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবন জনকল্যাণে উৎসর্গ করার এমন বিরল দৃষ্টান্ত সে সময়ে যেমন ছিল অনন্য ও বিরল, আজও তেমনি অনুকরণীয়।
আমার যখন থেকে বুঝবার বয়স হয়েছে, তখন থেকেই বাবা তাঁকে দেখেছি, তাঁর কাছে সম্মান বা প্রাপ্তীর প্রকৃত মূল্য ছিল তখনই, যখন তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়ে; সমাজকে আলোকিত করতো।
তাঁর নিকট সান্নিধ্যে থাকার সুবাদে তিনি আমাকে শিখিয়েছেন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, আর্ত-পীড়িতের সেবা করতে, বড়দের শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে এবং ছোটদের স্নেহ দিতে। তিনি প্রায়শঃ বলতেন, মানুষের পরিচয় তার পোশাকে নয়, ব্যবহারে। তার অর্থ ও সম্পদ বা অট্টালিকায় নয়, পরিচয় তার সততায়। তার কথায় নয়, তার কর্মে। এখন যার মর্ম আমি তাঁর প্রতিটি কর্মে উপলদ্ধি করছি।
আজ ধনীরা যখন কৃপন, গরীবেরা যখন অসহায়, সমাজ যখন আজ আত্মকেন্দ্রিক। মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং মানবিকতাবোধ যখন সংকটে তখন আমরাও উদ্বিগ্ন। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে বাবার জীবন যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেছে আমার কাছে। তিনি আমাদের বলতেন-একজন মানুষ তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের জন্য নয়, তাঁর রেখে যাওয়া কর্মযজ্ঞ ও আদর্শের জন্য যুগের পর যুগ বেঁচে থাকেন। আমার বাবা ৮৮ বছর বয়সে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই রোববার রাত ৮ টায় আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর মূল্যবোধ, তাঁর সততা, তাঁর মানবিকতা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আজও আমাদের পথ দেখায়। তাঁর প্রতিটি উপদেশ আজও আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে।তিনি নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ এখনো আমাদের জীবনের বাতিঘর।
আমাদের বাবার প্রয়াণ দিবসে পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, আসুন-আমরা আমাদের বাবাকে নিঃশর্তে ভালোবাসি। তাঁকে জীবনের কিছুটা অবসর সময় দিন, তাঁর জীবনের সংগ্রামের গল্পগুলো শুনুন, তাঁর ত্যাগকে উপলব্ধি করুন এবং তাঁর অভিজ্ঞতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রাখুন। কারণ, একজন বাবা চলে গেলে কেবল একজন মানুষ হারিয়ে যান না; বরং পরিবারের সবচেয়ে শক্তিশালী ছায়া, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এবং সবচেয়ে বড় প্রেরণার উৎস হারিয়ে যায়।
আমি বিশ্বাস করি বাস্তবে হারালেও বাবারা কখনো চিরতরে হারিয়ে যান না। তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের রেখে যাওয়া আদর্শে, সন্তানদের চরিত্রের সুমহান চর্চায়, তাঁদের প্রতিষ্ঠিত কর্মে এবং প্রিয়জনদের অন্তরের গভীর শ্রদ্ধায়।
আজকের এই দিনে মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা, তিনি যেন পৃথিবীর সকল জীবিত বাবাকে সুস্থ, দীর্ঘ ও শান্তিময় জীবন দান করেন। আর যেসব বাবা আমাদের ছেড়ে অনন্তের পথে পাড়ি জমিয়েছেন তাঁদের সকলকে যেন জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।
আমাদের বাবা মোস্তফা আলমের প্রতিও রইল অফুরন্ত গভীর শ্রদ্ধা, সীমাহীন কৃতজ্ঞতা এবং অশ্রুসিক্ত হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। তিনি শুধু আমাদের বাবা ছিলেন না-তিনি ছিলেন একটি সমাজ সংস্কারক, রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কারিগর। তিনি ছিলেন অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পথ প্রদর্শক। তিনি ছিলেন একটি আলোকিত প্রদীপ। বাস্তবে তিনি না থাকলেও তার রেখে যাওয়া আলোয় আলোকিত হবে পরবর্তী প্রজন্ম। এ আলো পথ দেখাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে।
আমাদের বাবার প্রয়ান দিবসে আজকে আমাদের সকলের প্রতিটি সকাল শুরু হোক বাবাদের হাসিমাখা মুখ দেখে, আর প্রতিটি সন্ধ্যা কাটুক তাঁদের পাশে বসে জীবনের গল্প শোনার অমূল্য সময় হিসেবে। আর যেসব বাবা আজ আমাদের মাঝে নেই, তাঁদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁদের যেন বেহেশতের সর্বোচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করেন।
যাঁদের বাবা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁরা যেন এই অমূল্য আশীর্বাদের সঠিক মূল্য উপলব্ধি করেন। ব্যস্ততার মত খরা অজুহাতে বাবাকে ভুলেও অবহেলা করবেন না। কিছুটা সময় বের করে তাঁর পাশে বসুন, প্রাণভরে কথা বলুন, তাঁর হাতটি শক্ত করে ধরে রাখুন অথবা পরম যত্নে তাঁকে জড়িয়ে ধরুন।
মোকাদ্দেস হায়াত মিলন
লেখক ও শিক্ষক,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, রংপুর।
বাংলাদেশ সময়: ১৬:০৪:০৬ ৫ বার পঠিত | ● . কিছু কথা ● ফিচার ● বাবাকে নিয়ে