ঢাকা রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
![]()
হবিগঞ্জ: নবীগঞ্জ উপজেলার আলোচিত একটি সড়ক দুর্ঘটনা।নেপথ্যে যে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড সেই রহস্য উম্মোচন হয়েছে। আপন শালা সিরাজুল ইসলাম তাকে ট্রাক চাপা দেন। এখন নবীগঞ্জে এই আলোচিত হত্যাকান্ডটি টক অব দ্যা টাউন। একটি পারিবারিক বিরোধের জের ধরে দুই বন্ধুকে হত্যা করলো শিক্ষক মাসুম পারভেজের সাবেক স্ত্রী আমিনা বেগমের পরিবার। শোকে মুহুমান নবীগঞ্জ উপজেলার ঘোলডুবা আব্দুল মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী ও অভিভাবকবৃন্দ। মৃত্যুর ৪ মাস আগেই এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করা হয়।
শিক্ষক মাসুম পারভেজের স্ত্রী আমিনা বেগম হচ্ছেন এই দুটি হত্যার মাস্টার মাইন্ড। তিনিই চক্রান্ত করে পরিকল্পনা মাফিক চক করেন কিভাবে সাবেক স্বামীকে হত্যা করা যায়। এর নেপথ্যে কারন হলো যৌতুক মামলার রায় কেন মাসুমের পক্ষে গেলো।
ঘটনার দিন ২৯ আগষ্ট শনিবার সকালে তিনি মাসুম পারভেজের বড় মেয়ে মিতি বেগম(১৪) কে বলেন তুমি তোমার বাবাকে ফোন করেন, বলো তোমার জন্য নতুন কাপড়, জুতা ও একটি ছাতা নিয়ে আসতে। মেয়ে সরল মনে বলেন বাবা আমার জন্য নতুন কাপড়, জুতা ও একটি ছাতা নিয়ে আসেন। বাবা মাসুম পারভেজ যখন তার বাড়িতে যান তখন তার সাবেক স্ত্রী বলেন, আপনি আজকে মেয়ের সাথে বেশি কথা বলতে পারবেন না। আমরা অন্য জায়গায় যাবো, এই কথা শোনে মাসুম পারভেজ চলে আসলে তিনি পিছনে তার আপন ভাই সিরাজুৃল কে লেলিয়ে দেন।
পানিউমদা থেকে পিছু নিয়ে ৪ কিলোমিটার দুরে সদরঘাট নতুন বাজার এলাকায় ট্রাক চাপা দেয়। মৃত্যূ নিশ্চিত করার জন্য চাপা দিয়ে প্রায় ৫/৬ শ গজ দুরে নিয়ে যান।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে নানা আলোচনার পর পুৃলিশের কাছে মুল রহস্য উদঘাটন হয়েছে। এব্যাপারে মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন শেরপুর হাইয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান।
জানা গেছে গত ২৯ আগষ্ট শনিবার দুপুর ২ ঘটিকার সময় ঢাকা- সিলেট হাইওয়ে রোডের দেবপাড়া ইউনিয়ন এর সদরঘাট নতুন বাজার নলসুজা এলাকায় ডিআই পিকআপ ট্রাক নাম্বারবিহীন একটি গাড়ি পিছন থেকে একটি চলন্ত মোটর সাইকেলকে চাপা দেয়। চাপা দেওয়ার সাথে সাথে মোটর সাইকেলটি ছিটকে ট্রাকের উপরে উঠে যায়। মোটর সাইকেল আরোহী মাসুম পারভেজ সড়কে ছিটকে পড়েন। তার সঙ্গী শামীম ইসলাম এক পাশে ছিটকে পড়েন। তখন ঐ চালক মাসুম পারভেজ কে আবারও ট্রাক দিয়ে চাপা দেন এবং ৫/৬ গজ দুরে নিয়ে একটি মাটির ডিবির সাথে ধাক্কা দেন।
নবীগঞ্জ উপজেলার ঘোলডুবা মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কম্পিউটার কাম অপারেটর শিক্ষক মাসুম পারভেজ ও অফিস সহায়ক পিয়ন শামীম ইসলাম মোটরসাইকেল যোগে মাসুম পারভেজ এর ঔরষজাত অবুঝ দুটি সন্তানকে দেখতে তাহার শশুর বাড়ি পানিউমদা গ্রামে সন্তানদের দেখা করা খায়রুল ইসলামের বাড়িতে যান। তিনি হলেন মাসুম পারভেজের সাবেক শ^শুর। সেখানে তার মেয়ের সাথে দেখা করে আউশকান্দি ফেরার পথে পেছন থেকে একটি ঘাতক পিকাপ ভ্যান (ডিআই)এসে মোটরসাইকেল আরোহী দুইজনকেই চাপা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সহায়তায় মাসুম পারভেজ নবীগঞ্জ হাসপাতাল এবং শামীম ইসলাম সিলেট উসমানি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ মরদেহকে উভয় পক্ষের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন। মাসুম পারভেজ এর বাড়ি নেত্রকোনা জেলায়,আর শামীম ইসলাম এর বাড়ি নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের বেতাপুর গ্রামে।
সরজমিনে জানা যায়, মাসুম পারভেজ এর পারিবারিক সূত্রে জানা যায় বিগত ১২ বছর পূর্বে পানিউমদা গ্রামের খায়রুল ইসলাম এর মেয়ে আমিনা বেগম ওরফে হেপি বেগমের সাথে মাসুম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মাসুম পারভেজ এর দুটি ঔরষজাত কন্যা সন্তানও রয়েছে। বড় মেয়ে মিথি পড়েন ৭ম শ্রেনীতে ও ছোট মেয়ে নিতি পড়েন ২য় শ্রেনীতে।
বিবাহের পর সে তার কর্মস্থল নবীগঞ্জের ঘোলডুবা এলাকায় থাকতো। বিগত ৫ বছর ধরে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা থাকায় স্ত্রী আমিনা বেগম দুই সন্তান কে নিয়ে তার পিত্রালয়েই থাকতেন। উভয় পক্ষের মধ্যে বিগত ৪ বছর ধরে মামলা মোকদ্দমার বিরোধ চলিয়া আসিতেছে। ৪টি মামলা চলমান রয়েছে। যৌতুক মামলা নিয়ে তাদের বিরোধ চরম আকার ধারন করে। এক বছর আগে মাসুমকে তার শ^াশুর ও শালা মিলে বেঁেধ তালা দিয়ে রাখে। এর পরে ৬মাস ঐ যৌতুক মামলাটি আদালতে রায় মাসুম পারভেজের পক্ষে চলে আসে। আদালত নির্দেশনা দেন মাসে একবার দুই মেয়ের তাদের মায়ের বাবার বাড়িতে গিয়ে দেখাশোনা করতে পারবেন মাসুম পারভেজ।
এনিয়ে তার শ^শুর পক্ষের লোক জন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। গত ২৯ আগষ্ট মাসুম পারভেজের বড় মেয়ে মিতি ফোন করে বলে বাবা আমার জন্য নতুন জুতা ও ছাতা নিয়ে আসবেন। ফোন পেয়ে তিনি নতুন জুতা ও ছাতা কিনে তার বন্ধু শামীম ইসলাম কে নিয়ে একটি মোটর সাইকেল যোগে সাওেবক শ^শুর বাড়িতে যান। সেখানে মেয়েকে নতুন জুতা ও ছাতা দিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হন। এরপরই পিছু নেন তার শালা সিরাজুল ইসলাম। তিনি দুই মাস আগে একই গ্রামের সাবেক মনসুর মেম্বারের কাছে থেকে একটি রেজিষ্ট্রেশন বিহীন ডিআই পিকআপ ট্রাক কিনেন। পানিউমদা বাজারে গিয়ে ঐ গাড়ির চালক নাইম মিয়াকে বলেন আমাকে চাবি দাও জরুরি কাজ আছে। এরপরই তিনি পিছু নেন তার বোনের জামাই মাসুম পারভেজের মোটর সাইকেলটির।প্রায় ৪ কিলোমিটার পিছন দিয়ে আসেন।
ঢাকা- সিলেট হাইওয়ে রোডের দেবপাড়া ইউনিয়ন এর সদরঘাট নতুন বাজার নলসুজা এলাকায় ডিআই পিকআপ ট্রাক নাম্বারবিহীন একটি গাড়ি পিছন থেকে একটি চলন্ত মোটর সাইকেলকে চাপা দেয়। চাপা দেওয়ার সাথে সাথে মোটর সাইকেলটি ছিটকে ট্রাকের উপরে উঠে যায়। মোটর সাইকেল আরোহী মাসুম পারভেজ সড়কে ছিটকে পড়েন। তার সঙ্গী শামীশ ইসলাম এক পাশে ছিঠকে পড়েন। তখন ঐ চালক মাসুম পারভেজ কে আবারও ট্রাক দিয়ে চাপা দেন এবং ৫/৬ গজ দুরে নিয়ে একটি মাটির ডিবির সাথে ধাক্কা দেন। তার পর চালক সিরাজুল বোনের জামাই মাসুম পারভেজের মৃত্যূ নিশ্চিত হলে গাড়ি থেকে নেমে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। এর পর এলাকাবাসী তাকে পানিউমদা গ্রামের কিছু মুরব্বিয়ানের কাছে তুলে দেন।
নিহত শামীম ইসলামের বাবা ইসমত মিয়া বলেন, আমার ছেলে সম্পূর্ন নির্দোষ, সে তার বন্ধু মাসুম পারভেজের সাথে তারা শ^শুর বাড়িতে যান, সেখান থেকে ফেরার পথে তার শালা সিরাজুল ইসলাম তাকে ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করেছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই। আমি আগামীকাল এই বিষয়ে উকিল পরামর্শ নিয়ে আদালতে মামলা করবো।
নিহত শামীম ইসলামের মা করুনা বেগম বলেন, আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। আমার ছেলের কি অপরাধ ছিলো তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি সরকারে কাছে বিচার চাই একজন লাইসেন্স ছাড়া কিভাবে গাড়িগ চালায় পুলিশ এখন তাদেরকে গ্রেফতার করেনি । আমার ছেলে বললো বাড়ি এসে ভাত খাবে এখনও কেন আসে নাই। মাসুমের দোষ থাকলেও আমার ছেলে তো কোন অপরাধি নয়।
নবীগঞ্জ ঘোলডুবা আব্দুল মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য আব্দুর রকিব বলেন, আমরা জানি আমাদের দুই শিক্ষক অত্যান্ত ভালো মানুষ ছিলেন। মাসুমের সাথে আমার খুবই আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো। সে তার শ^শুর বাড়ি থেকে আমাকে ফোন করে বলে, তার মেয়ের জন্য নতুন জামা কাপড়,জুতা ও ছাতা নিয়ে গেছে। তার বউ আমিনা বেগম নাকি তাকে মেয়ের সাথে কথা বলতে দেয়নি। এর ৩০/৪০ মিনিট পরেই শুনি সে মারা গেছে। তার সাথে মুল আক্রোষ হলে আমিনা বেগম হেপি যৌতুক মামলায় হেরে গিয়ে সেই প্রতিশোধ নেন।
নবীগঞ্জ ঘোলডুবা আব্দুল মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন বলেন, আমার বিদ্যালয় নবীগঞ্জ উপজেলার ঘোলডুবা মান্নান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কম্পিউটার কাম অপারেটর শিক্ষক মাসুম পারভেজ ও অফিস সহায়ক পিয়ন শামীম ইসলাম মোটরসাইকেল যোগে আসার পথে তার শ্যালক সিরাজুল ইসলাম ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করেছে। আমি তাদের দুইজনের পরিবারের সাথে কথা বলেছি তারা এই বিষয়ে আদালতে মামলা করবেন। হাইয়ে পুলিশ সব কিছু জানার পরেও এখনও তারা মামলা নিতে গড়িমসি করছে।
এব্যাপারে বাউল শামীম নামে একজন পত্যক্ষদর্শী বলেন, ট্রাকটি যখন চাপা দেয় আমরা দাড়িয়ে ছিলাম। দেখলাম প্রথমে চাপা দিয়ে মোটর সাইকেলের লোকজন ছিটকে পড়লেন, এরপর গাড়ির চালক একজনের উপরে দিয়ে আবারও গাড়ি তুলে দিলেন। ৫শ গজ দুরে গিয়ে গাড়িটি একটি মাটির ডিবির সাথে ধাক্কা লাগে। তারপর গাড়ির চালক দৌড়ে পাশর্^বর্তী বাড়িতে আশ্রয় নেন।
প্রত্যক্ষদর্শী যুবক আরিয়ান হাসান বলেন, প্রথমেই ট্রাকটি চাপা দিয়ে যেভাবে দিয়েছে আমরা অবাক হয়েছি। প্রথমেই মোটর সাইকেল ছিটকে গেলেও কেন যেন চালক ইচ্ছে করে টেলাইয়া চাকার থলে ডুকালেন জানিনা। পরে জানছি চালক পানিউমদা গ্রামের। যিিন মারা গেছে তাকে আমরা চিনি না, মনে হয়েছে চালক ইচ্ছে করে চাপা দিয়েছেন।
শেরপুর হাইয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান জানান, ঘটনাটি নিয়ে আমরা পাঁচদিন যাবৎ অনুসন্ধান করছি। এখন কিছু ক্লু পেয়েছি। গাড়ির চালক সিরাজুল ইসলাম তার আপন বোনের জামাইকে চাপা দিয়েছে। কেন গাড়ি চাপা দিলো, সে লাইসেন্সধারী গাড়ি চালক নয় এটা সত্য। আমরা তদন্ত করে মুল রহস্য বাহির করতে বিলম্ভ হয়েছে তাই মামলা নিতে একটু লেইট হয়েছে। হত্যা মামলা করতে হলে তাদেরকে আলাদা পদক্ষেপ নিতে হবে।
এন/ আর
বাংলাদেশ সময়: ২৩:১৯:৫৩ ১৫ বার পঠিত | ● দুই শিক্ষক ● নবীগঞ্জ ● হত্যার ক্লু